মুক্তিযোদ্ধার ছেলে মাদকাসক্ত: প্রত্যয়নপত্রে ‘জোর করে স্বাক্ষর নেন’ এসিল্যান্ড

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রত্যাখ্যান করা দিনাজপুরের সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের যোগীবাড়ি গ্রামের প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলে নুর ইসলাম মাদকাসক্ত, এমন একটি প্রত্যয়নপত্র এসিল্যান্ড জোর করে লিখিয়ে নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নুর ইসলাম এ বিষয়ে অভিযোগ আনলে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারের (রাজস্ব) গাড়িচালক আব্দুর রহমান তা স্বীকার করেন।

বৃহস্পতিবার দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন মুক্তিযোদ্ধা ইসমাইল হোসেন। মৃত্যুর আগে ইসমাইল হোসেন তার ছেলে নুর ইসলামের চাকরিচ্যুতি ও বাস্তুচ্যুতির বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম বরাবর একটি চিঠি লিখেন।

এসিল্যান্ড, এডিসি, ডিসি ও এসিল্যান্ডের স্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করা চিঠিটি আসে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে।

ছেলেকে চাকরিচ্যুতির কারণে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন না করতে লিখে যান চিঠিতে। দেশব্যাপী যা আলোচিত হয়।

রবিবার প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার কুলখানিতে মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার পাশাপাশি কবর জিয়ারত করেন স্বজনসহ এলাকাবাসী।

এ মুক্তিযোদ্ধার ছেলে নুর ইসলাম দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে সদর উপজেলার সহকারি কমিশনারের (ভূমি) গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির প্রত্যায়নপত্রে দৈনিক হাজিরার ভিত্তিতে কাজ করতেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম তার সন্তান নুর ইসলামকে কার্যালয়ে ডেকে চাকরি এবং সরকারি বাড়িতে থাকার প্রস্তাব দেন।

পরদিন শুক্রবার জেলা প্রশাসক সদর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লোকমান হাকিমকে নিয়ে ইসমাইল হোসেনের বাড়ি গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।

তবে শনিবার দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন নুর ইসলাম।

চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া বিষয়ে তিনি রোববার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাকে ডিসি স্যার চাকরি করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি চাকরি করব না বলে জানিয়েছি’।

বিষয়টি হুইপ মহোদয় দেখবেন বলেও জানান তিনি।

রবিবার বাবার কুলখানি ও দোয়া মাহফিল শেষে নুর ইসলাম দেশ রূপান্তরকে আরো বলেন, ‘আমার বাবা তো চিঠি দিয়ে গেছে হুইপ সাহেব বরাবর। ঐ চিঠি হুইপ সাহেবের কাছেও গেছে। আমি এখন হুইপ সাহেবের অপেক্ষায় আছি। তিনি এ বিষয়ে কী করেন সেটার অপেক্ষায় আছি’।

এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘আমি তিনটা জিনিস চেয়ে বিচার চেয়েছি। এর মধ্যে আমার চাকরি, বাড়ি এবং এসিল্যান্ড, ইউএনও, এডিসি রেভিনিউ ও এসিকনের বিচার চেয়েছি’।

জেলা প্রশাসকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু ডিসি স্যারের সঙ্গে এসিকন আমাকে দেখা করতে দেয়নি এ জন্য আমি ডিসি স্যার বাদে বাকি চারজনের বিচার দাবি করছি’।

নুর ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘এডিসি রেভিনিউর গাড়িচালককে এসিল্যান্ড জোরপূর্বক ডেকে নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মাদক সেবনের একটি লিখিত প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করান। বিষয়টি তদন্ত কমিটির এডিসি রেভিনিউর কাছে গাড়িচালক আব্দুর রহমান শিকারও করেছেন’।

এ বিষয়ে এডিসি রেভিনিউর গাড়িচালক আব্দুর রহমান বিষয়টি শিকার করে বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১০টার সময় এসিল্যান্ড আামাকে তার অফিসে ডেকে নেন। এসময় এসি-ল্যান্ড আমাকে বলেন, নুর ইসলাম মাদকাসক্ত এ মর্মে আমার কাছে একটা লিখিত নেয়। আমি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি বলেন, কোনো সমস্যা নেই, এটা আমার নিরাপত্তার জন্য। পরে আমি বিষয়টি এডিসি রেভিনিউ স্যারকে জানাই। তিনিও একই কথা বলেন, সমস্যা নেই তিনি হয়ত তার নিরাপত্তার জন্য নিচ্ছেন।’

তবে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি আব্দুর রহমানকে কয়েকটি কাজের জন্য ডেকেছিলাম। কিন্তু কোনো কাগজে স্বাক্ষর নেয়া হয়নি।’

এ ঘটনায় গঠিত এক সদস্যের তদন্ত কমিটির সদস্য এডিসি (রেভিনিউ) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘আমাকে আমার গাড়িচালক স্বাক্ষর করার বিষয়টি মোবাইল ফোনে জানিয়েছিল।  এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না’।

এ ঘটনায় ১ সদস্যেল তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এর সদস্য জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে আরো বলেন, ‘শনিবার এসিল্যান্ড অফিস থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার এ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেছি। দু’একদিনের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হবে।’