সিঙ্গাপুরজুড়েই বাংলাদেশি হুন্ডি কারবারিরা ব্যাপক তৎপর। বাংলাদেশের ক্যাসিনোকান্ডে সবচেয়ে আলোচিত ঢাকা মহানগর যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার ঘনিষ্ঠরাই মূলত এ অবৈধ লেনদেনে জড়িত। সম্রাট ও তার কয়েকজন সহযোগী বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হলেও থেমে নেই তাদের হুন্ডি কারবার। নানা কৌশলে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুর থেকে তারা নিয়মিত অর্থ আদান-প্রদান করছেন। চক্রটি সক্রিয় আছে সিঙ্গাপুরের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চাঙ্গিতেও।
গত ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, হুন্ডি কারবারিরা সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই মুদ্রার পাশাপাশি সোনাও পাচার করছে। ভিওআইপির মাধ্যমে বিকাশেও হুন্ডির অর্থ লেনদেন হচ্ছে অহরহ। দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় দুই জুয়ার আসর বেফ্রন্ট মেরিনা বে স্যান্ডেইজ ও সেন্তুসা রেস্টওয়াল ক্যাসিনোতে সবসময় আসা-যাওয়া করে চক্রটির সদস্যরা। তাদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি ‘বাংলাদেশি পাড়া’ হিসেবে পরিচিত মোস্তফা সেন্টারের আশপাশে। সেখানে প্রায় প্রতিটি দোকানেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট রয়েছে। তারা বাংলাদেশ থেকে টাকা পাঠালে দেয় সিঙ্গাপুরের ডলার। সিঙ্গাপুরে বসে সে দেশের ডলার দিলে বাংলাদেশে তাদের এজেন্টরা টাকা দিয়ে দেয়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হুন্ডি কারবারিদের সঙ্গে চোরাকারবারিদের ব্যাপক যোগাযোগ আছে। ওই চোরাকারবারি নিয়মিত ক্যাসিনোতে যায়। তাদের অনেকে সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। কেউ কেউ চাকরি করেন দোকানের সেলসম্যান হিসেবেও। এভাবে চাকরির পাশাপাশি হুন্ডি কারবারি করে অনেকে মোটা অঙ্কের অর্থ কামাচ্ছেন। আবার সেই অর্থ ক্যাসিনোতে গিয়ে বিলিয়ে আসছেন। পুরো সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের পাঁচ শতাধিক হুন্ডি কারবারি আছেন। বাংলাদেশ থেকে যারা সিঙ্গাপুরে গিয়ে ক্যাসিনোতে জুয়া খেলেন, দেশে ফেরার সময় তাদের অনেকে সোনার বার নিয়ে আসেন।
সিঙ্গাপুরের মোস্তফা সেন্টারসংলগ্ন একটি ছোট দোকানে ১০ বছর ধরে মোবাইল ফোন রিচার্জ ও সিম বিক্রি করেন এক বাংলাদেশি। নিজেকে কুমিল্লার খোরশেদ আলম পরিচয় দিয়ে দেশ রূপান্তরকে তিনি জানান, মেরিনা ও রেস্টওয়ালে জুয়া খেলে অনেকে নিঃস্ব হয়ে যান। লোভে পড়ে পুনরায় খেলতে তারা ডলার খুঁজতে থাকেন। আর এ সুযোগে তারা হুন্ডির মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেন। বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বা কোনো ব্যক্তির কাছে টাকা জমা দিলেই সিঙ্গাপুরে ডলার দিয়ে দেওয়া হয়। খোরশেদ আলম বলেন, ‘আমিও এই কারবার চালাচ্ছি। হুন্ডির জন্য বাংলাদেশে কেউ ২ লাখ টাকা জমা দিলে সিঙ্গাপুরে অন্তত ১ হাজার ডলার লাভ করছি। সম্রাট, খালেদ, জি কে শামীম, মমিনুল হক সাঈদসহ অন্তত পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি যারা সিঙ্গাপুরে ক্যাসিনোতে যাতায়াত করেন তারাই মূলত হুন্ডি কারবারিতে জড়িত। তবে সম্রাট মোটা অঙ্কের লেনদেন করেন ধীরস্থিরভাবে। তিনি খুব কৌশলী মানুষ।’ তিনি আরও বলেন, জুয়া খেলে যখন টাকা শেষ হয়ে যায় তখন বাংলাদেশ থেকে টাকার ব্যবস্থা করেন তারা। আর এই সুযোগটিই আমরা কাজে লাগাই।’ খোরশেদ আলম জানান, বরখাস্ত হওয়া ঢাকার কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ এখন সিঙ্গাপুরে রয়েছেন। স্ত্রী ও দুই পুত্র নিয়ে বসবাস করছেন। কিছুদিন আগে সাঈদের এক সন্তানের রাফায়েল হসপিটালে অপারেশনও হয়েছে। সে সময় তার টাকা শেষ হয়ে গেলে বাংলাদেশ থেকে হুন্ডির মাধমে ২ লাখ ডলার আনা হয়। যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ হোসেন ভূঁইয়া এবং বহিষ্কৃত সহসভাপতি এনামুল হক আরমানও দেদার হুন্ডি কারবার চালিয়েছেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম সেন্টু সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোপাড়ার বড় মাপের সদস্য। চট্টগ্রামের শাহীন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি কয়েকশ কোটি টাকা হুন্ডির মাধ্যমে ক্যাসিনোতে লগ্নি করেছেন। হক নামে এক বাংলাদেশি হুন্ডির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে গড়েছেন ‘টাকার পাহাড়’। শাহেদ শফিক নামে আরেক ব্যক্তি একই কারণে এখানে বেশ আলোচিত। চাঁদপুরের মুভি ও মোমিন পাটোয়ারী নামে দুই ব্যক্তির নাম সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি জুয়াড়িদের মুখে মুখে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই হুন্ডি কারবারিতেও জড়িত। সিঙ্গাপুরে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট যুবলীগের কমিটি গঠন করা হয় প্রায় সাত বছর আগে। কমিটির বেশিরভাগ সদস্যই অব্যাহতি পাওয়া যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও সম্রাটের অনুসারী। কমিটির সভাপতি পিরোজপুরের আল-আমিন ও সাধারণ সম্পাদক গোপালগঞ্জের নাসিরউদ্দিন। কমিটির বেশিরভাগ সদস্যই হুন্ডি কারবারে জড়িত।
সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশিদের ভাষ্যমতে, সিঙ্গাপুর থেকে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসার কথা তার পাঁচ ভাগও আসছে না। সেখানকার বাংলাদেশিদের বেশিরভাগ টাকা লেনদেন হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। সেখানকার পুলিশ এবং প্রশাসন হুন্ডি কারবারিদের সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হলেও তাদের কখনো সমস্যা করে না। বরং নানাভাবে সহায়তা করে থাকে। এমনকি সেখানকার অনেক ব্যাংকেও তাদের বড় ধরনের লেনদেন হয়। এজন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের বিশেষ সুযোগও দিয়ে আসছে।
সিঙ্গাপুরে কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে জানান, চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও হুন্ডি কারবারিরা বেশ সক্রিয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনেই অর্থ লেনদেন করে থাকে তারা। তবে মাঝেমধ্যে অভিযান হয়। সম্প্রতি ৪২ বাংলাদেশিকে আটক করে সিঙ্গাপুরের পুলিশ। তখন ১২ জনকে মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর ৩০ জনকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়। ওই শ্রমিকরা আরও জানান, চাঙ্গি বিমানবন্দরের ৪ নাম্বার টার্মিনালে হুন্ডি কারবারিদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। সেখানে অর্থ লেনদেনের পাশাপাশি সোনার চালানও আদানপ্রদান হয়। এ কাজে বিভিন্ন ধরনের ‘এজেন্ট’ যুক্ত।
বাদশা নামে এক হুন্ডি কারবারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতি শনি ও রবিবার মোস্তফা সেন্টারসংলগ্ন আশপাশ এলাকায় হুন্ডি কারবারিদের ‘হাট বসে’ বললেই চলে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় টাকা পাঠানো হয়। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশ থেকে টাকা পাঠায়। পরে তাদের ডলার দেওয়া হয়। হুন্ডি কারবারিরা জেলাভিত্তিক বিভিন্ন সাংকেতিক নামে পরিচিত। যেমন তেঁতুলতলা, ম্যাশ ক্যাফ, শাপলা হোটেল ও আমতলা। যে কেউ এসে এর কোনো নাম বললেই হুন্ডি কারবারিরা এগিয়ে আসে। বুঝে ফেলে কে কোন জেলার লোক। বাদশা আরও বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট রয়েছে। ভিওআইপির মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। আমিও একজন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট। কেউ ডলার দিলে বাংলাদেশে টাকা পাঠিয়ে দিই। গত সপ্তাহে দুই ব্যবসায়ী ক্যাসিনো খেলে টাকা শেষ হয়ে গেলে বাংলাদেশ থেকে তাদের জন্য মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠানো হয়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে আসার পর ওই দুই ব্যবসায়ীকে ১ হাজার ডলার দিয়ে দিই। এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে।’