দলে নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা, বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাদের উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে বিএনপি। বিশেষ করে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মামলার সংখ্যা ও কর্মসূচিতে উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। তারেক রহমানের এমন নির্দেশনায় উদ্দীপ্ত পোড় খাওয়া নেতাকর্মীরা। গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
তারেক রহমানের এমন নির্দেশনার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির এমন কোনো নেতাকর্মী খুঁজে পাওয়া যাবে না যার বিরুদ্ধে মামলা নেই। লাখ লাখ মামলা সারা দেশের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। তাই দলের পুনর্গঠনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, বিভিন্ন কর্মসূচিতে যারা সবসময় থাকেন তাদের সবসময়ই চেষ্টা করা হয় দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার। তবে সবসময় সবকিছু সম্ভব হয় না। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা এমনই হওয়া উচিত। এতে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিশেষ করে ত্যাগী নেতাকর্মীরা উৎসাহিত হবেন। দল শক্তিশালী হবে।
বিএনপির যুব সংগঠন যুবদল। সংগঠনটির নেতৃত্ব নির্বাচনে নেতাকর্মীদের কার বিরুদ্ধে কয়টি মামলা আছে, কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনে নেতাকর্মীদের উপস্থিতির বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়েছেন তারেক রহমান। সম্পতি যুবদলের নেতারা নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে স্কাইপের মাধ্যমে বৈঠক করেন তারেক রহমানের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের সময় পালিয়ে বেড়াবেন, বিশ্রামে থাকবেন, বিদেশ ভ্রমণ করবেন, অনেক ব্যস্ত আছি, হাতে অনেক কাজ, সময় নাই, পরে এসে দলের বড় বড় পদ লাগবে, পদ আগলে রাখবেন, এমপি হবেন, মন্ত্রী হবেন, এটা আর হবে না। যারা বর্তমানে কঠিন সময়ে মাঠে থেকে রাজনীতি করছে, রাজপথে থাকছে তাদের ভবিষ্যতে মূল্যায়ন করা হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যুবদলের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২৪ অক্টোবর যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। পরে স্কাইপে বৈঠক তারেক রহমান কমিটি গঠনে বেশকিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী কমিটি গঠনের জন্য সময় বাড়িয়ে দিয়েছেন। সে হিসাবে আগামী ১০ নভেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দিতে বলা হয়েছে।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এমন নির্দেশনায় উদ্দীপ্ত নেতাকর্মীরা। নতুন নির্দেশনাগুলোকে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে ফরিদপুর জেলা বিএনপির নেতা মাহমুদুল হাসান পিংকু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করলে দল শক্তিশালী হবে। ত্যাগী নেতাকর্মীরা আরও বেশি ত্যাগ স্বীকার করার জন্য তৈরি থাকবেন। কোন নেতার বিরুদ্ধে কতগুলো মামলা আছে, তা সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের কাছে রয়েছে। দলের আইনজীবীদের কাছেও রয়েছে।
তিনি বলেন, মামলা, কর্মসূচিতে উপস্থিতির পাশাপাশি ক্যারিশম্যাটিক নেতাকর্মীদেরও মূল্যায়ন করা উচিত। সার্বক্ষণিক যারা সময় দেন তাদের বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত।
যুবদলের আরেক নেতা আবদুল খালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এতদিন ত্যাগীদের মূল্যায়ন করা হয়নি যথাযথভাবে। তাই সংগঠন শক্তিশালী হয়নি। এখন ত্যাগীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে আগামী দিনে সংগঠন শক্তিশালী হবে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে গতকাল ২৭ সেপ্টেম্বর স্বেচ্ছাসেবক দলের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ২০১৬ সালের ২৮ অক্টোবর শফিউল বারী বাবুকে সভাপতি আর আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েলকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণার পর তিন বছর কেটে গেছে। কিন্তু পাঁচ সদস্য স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেননি। এ অবস্থায় স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে নতুন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরা। স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাবু-জুয়েল কমিটি ব্যর্থ হয়েছে। তারা বিগত তিন বছরে স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেননি। এখন বর্তমান নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা উচিত।
পুলিশের সঙ্গে যুবদলের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া : জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গতকাল রবিবার বিএনপির কারাদণ্ডপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করে মিছিল করায় নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া ও নগরীর মণ্ডলপাড়া এলাকায় প্রেস ক্লাবের সামনে পুলিশ বাধা দিয়েছে। এসময় যুবদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। অন্যদিকে, নীলফামারীতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও পুলিশের বাধায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে যুবদলের বিবদমান দুই গ্রুপ। চুয়াডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়েছে পুলিশি বেষ্টনীর মধ্যে। পঞ্চগড়ে যুবদলের মিছিল পণ্ড হয়েছে পুলিশের বাধায়। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর যুবদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ধস্তাধস্তি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের লাঠিচার্জে কমপক্ষে ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দলটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। সকাল ১০টায় নগরীর মণ্ডলপাড়া ও চাষাঢ়া এলাকায় প্রেস ক্লাবের সামনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে মণ্ডলপাড়া এলাকায় মহানগর বিএনপির সহসভাপতি শাখাওয়াৎ হোসেন খানের নেতৃত্বে জেলা ও মহানগর যুবদলের একাংশের নেতাকর্মীরা একটি র্যালি বের করে। র্যালিটি বঙ্গবন্ধু সড়কের ডিআইটি এলাকায় এলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। তবে পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে র্যালিটি চাষাঢ়ার দিকে এগুতে থাকলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এসময় যুবদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশ লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
একই সময়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার ও মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের নেতৃত্বে নগরীর চাষাঢ়ায় নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মহানগর যুবদলের আরেকটি র্যালি বের করতে চাইলে পুলিশ সেখানেও বাধা দিয়ে তাদের ব্যানার ছিনিয়ে নেয়। এসময় নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তিও হয়। পরে পুলিশের ব্যারিকেডের ভেতরে মহানগর যুবদলের নেতাকর্মীরা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে পুলিশের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার বলেন, পুলিশ আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করার অধিকার হরণ করেছে। আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে চেয়েছিলাম। পুলিশ আমাদের বাধা দিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার এসআই আমিনুল ইসলাম বলেন, যুবদলের নেতাকর্মীরা কর্মসূচি পালনের কোনো অনুমতি নেয়নি। জনগণের চলাচলে বাধা কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি যাতে না করতে পারে সে জন্য ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।
নীলফামারীতে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও পুলিশের বাধায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে যুবদলের দুই গ্রুপ। সকালে পৌরসভা সুপার মার্কেটস্থ অস্থায়ী দলীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ও সাংগঠনিক পতাকা উত্তোলন করে বেলা ১১টার দিকে জেলা যুবদলের উদ্যোগে একটি আনন্দ মিছিল বের হয়। জেলা যুবদলের সভাপতি এ.এইচ.এম সাইফুল্লাহ রুবেলের নেতৃত্বে আনন্দ মিছিলটি দলীয় কার্যালয় থেকে একশ গজ দূরে বাটার মোড়ে গেলে বাধা দেয় পুলিশ। পরে তারা দলীয় কার্যালয়ের সামনে গিয়ে সমাবেশ করে।
এদিকে একই সময় পৌর যুবদলের সাবেক সভাপতি নূর আলমের নেতৃত্বে আলোচনা সভা ও কেক কেটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেন যুবদলের একাংশের নেতাকর্মীরা। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পৌর বিএনপির সভাপতি মাহবুব-উর-রহমান।
পুলিশি বেষ্টনীর মধ্যে নানা আয়োজনে চুয়াডাঙ্গায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়েছে। সকালে শহরের শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে র্যালি, গণরক্তদান ও আলোচনাসভার মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করা হয়। তবে শিল্পকলা চত্বর থেকে র্যালি বের করতে গেলে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে নেতাকর্মীরা। পুলিশি বাধায় র্যালিটি মূল সড়কে উঠতে না পারলেও সেখান থেকে সরকারবিরোধী নানা সেস্নাগান দেওয়া হয়।
পঞ্চগড়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল পুলিশের বাধায় পণ্ড হয়েছে। দুপুরে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয় যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে সেখান থেকে ব্যানার নিয়ে মিছিল বের করতে চেষ্টা করলে কার্যালয়ে প্রধান ফটকের সামনেই তাদের গতিরোধ করে পুলিশ। সেখানেই তাদের মিছিল থামিয়ে দেয় তারা। পরে সেখানেই পথসভা করে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কার্যক্রম শেষ করে দেন তারা।