কৃষক থেকে ঢাকার খুচরা বাজার

১০ টাকায় কেনা পেঁয়াজ ১৩২ টাকা বিক্রি

মঞ্জুর মোল্লা গত মৌসুমে (নভেম্বর-ফেব্রম্নয়ারি) আবাদ করেছিলেন ৫০০ মণের বেশি পেঁয়াজ। এর অর্ধেকই গেছে ঋণ ও সংসারের খরচ মেটাতে। আগাম উঠিয়েও অনেক পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়েছে। মানভেদে দাম পেয়েছেন ৩-১০ টাকা। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার কাদিরদী গ্রামের এই কৃষকের মতো দেশের প্রায় সব কৃষকের একই দশা। ওইসব কৃষকের রক্ত পানি করে আবাদ করা পেঁয়াজই হাত ঘুরছে আর ঘুরছে সারা দেশে। এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩২ টাকায়।

দেশি পেঁয়াজের সরবরাহ নেই, ভারত থেকে আমদানি বন্ধ, মিয়ানমারের মাল পচে যাচ্ছে– এমন নানা অজুহাত আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতাদের। তবে গত মৌসুমে দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজ এখনো বিক্রি হচ্ছে। বাজারে সরবরাহও কম নয়। প্রশাসনের অভিযানের কথা বলা হচ্ছে তবে বাজারের চিত্র একই। বরং বাজার ভেদে দামের ঊর্ধ্বগামী সীমা এগিয়ে রাখতে পাল্লা দিচ্ছে খুচরা বিক্রেতারাও। ঢাকার কয়েকটি বাজারের দেশি পেঁয়াজের সপ্তাহিক দাম পর্যালোচনায় সেই তথ্যই মেলে। আর সরকারের বাজার নজরদারি প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গত রবিবারের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশি পেঁয়াজের দাম বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৩৯ শতাংশ এবং এক মাসের ব্যবধানে বেড়েছে ৪৮ শতাংশ। তবে বাস্তবতা ভিন্ন।

ফরিদপুরের কানাইপুরের আড়তদার দুলাল মাতব্বর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাই রে, আমরা ফড়িয়ার (কৃষকের কাছ থেকে যারা কেনেন) থেকে পেঁয়াজ কিনি। কেনার পর পরই ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে বেচে দিই। কৃষককে যা দাম দিই, তার থেকে ৫-৬ টাকা বেশি নিয়ে বেচি। এর মধ্যে থেকেই পচে যাওয়ার ঘাটতি, শ্রমিক খরচ, পরিবহন খরচ মিটায়ে লাভ করতে হয়। গুদামে মজুদের তো কোনো সুযোগ নেই। তা পারে বড় আড়তদার ও ঢাকার ব্যবসায়ীরা।’ 

ঢাকার শ্যামবাজারের আড়তদার আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা কমিশন ব্যবসায়ী। আমাদের বড় মজুদদাররা পেঁয়াজ দেয়। আমরা বিক্রি করে কমিশন নিই।’ 

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের পাইকারদের দাবি, তারাও পচে যাওয়ার ভয়ে দু-তিন দিনের বেশি পেঁয়াজ রাখতে পারেন না। তাই যে দামে কেনেন, তার চেয়ে চার-পাঁচ টাকা লাভেই বেচে দেন।

এ বিষয়ে কৃষি সরেজমিন বিভাগের পরিচালক চণ্ডি দাস কুণ্ডz দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম বাড়ার একমাত্র কারণ সিন্ডিকেট (মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের জোট)। তারা কৃষকের কাছ থেকে ১০-১২ টাকায় কিনে ১০ গুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। এই সংকট দূর করতে হলে আগে কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু নীতিমালা থাকলেও ব্যাংক গড়িমসি করে কৃষককে ঋণ দিতে চায় না। ফলে কৃষক লোকসান দেয় আর মধ্যস্বত্বভোগীরা ফুলে কলাগাছ হয়।’

সিন্ডিকেটের কারণেই খুচরা বাজারে কয়েকগুণ বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম ভারত বাড়িয়ে দেওয়ার পর সুযোগ বুঝে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়িয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম নিয়ন্ত্রণের। দুই শতাধিক মামলাও করেছি। তবে যেহেতু দেশেও মৌসুমের প্রায় শেষ সময় আবার ভারতের পেঁয়াজও আসছে না, তাই ব্যবসায়ীদের বাড়তি চাপ দিচ্ছি না। তাহলে সিন্ডিকেট আরও দাম বাড়াতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করি, আগামী মাসেই ওরা আমাদের পেঁয়াজ দেবে। তখন বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। আর আগামীতে যাতে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে আমরা আগে থেকেই সতর্ক থাকব।’ 

গত ছয় মাস ধরে দেশে পেঁয়াজের বাজার অস্থির। গত জুনেও রাজধানীতে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ ২৮-৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। জুলাইয়ে এর দাম বেড়ে ৩৫-৪০ টাকা হয়। আগস্টে তা বেড়ে ৪৫-৫০ টাকায় পৌঁছায়। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য প্রতিটন ৮৫২ ডলার নির্ধারণ করে। এর পরই প্রতি কেজি দেশি ও আমদানি পেঁয়াজের দাম ৭০ টাকার ওপরে ওঠে। তবে তখনই ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি মূল্য ছিল ২৮-৩০ টাকা। এরপর গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তখন দেশের খুচরা বাজারে পণ্যটি কেজিপ্রতি ১২০ টাকায় বিক্রি হয়। কয়েক দিনের মজুদবিরোধী অভিযানে দাম তরতর করে নামার তৃপ্তিতে অভিযান বন্ধ করে প্রশাসন। সঙ্গে সঙ্গেই দাম বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজের পাইকারি মূল্য মানভেদে ১০০-১১০ আর খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১৩২ টাকা পর্যন্ত।

কৃষি অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৫ লাখ টন। গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) দেশে ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৫০ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে উৎপাদিত হয়েছে ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। এই হিসাবে দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে ভারত, মিয়ানমার, মিসর, তুরস্ক ও চীন থেকে মোট ১০ লাখ ৭ হাজার ২১৭ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। গত জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪৮৬ টন আমদানি হয়েছে। চলতি মাসে (অক্টোবর) এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে প্রায় দুই লাখ টন পেঁয়াজ। এর মধ্যে ভারত থেকেই এসেছে প্রায় ৬০ হাজার টন। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত পাঁচ মাসে তিন লাখ টনের বেশি পেঁয়াজ উল্লিখিত দেশগুলো থেকে আমদানি হয়েছে। এ ছাড়া গত অর্থবছরে আমদানি করা পেঁয়াজের বড় অংশ এখনো দেশে মজুদ রয়েছে বলে জানান কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, খুচরা বাজারে এক বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। অথচ উৎপাদন কমেনি। বরং আগের থেকে পচে যাওয়া পেঁয়াজের হার কমেছে। গতকাল রাজধানীতে দেশি পেঁয়াজের খুচরা মূল্য ছিল প্রতি কেজি ১৩২ টাকা। অথচ এর আগের বছর একই সময়ে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৪৫ টাকা। ২০১৭ সালের এই দিনে পণ্যটি বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৭০ টাকা।

রাজধানীসহ সারা দেশে আমদানি পেঁয়াজের দামও অস্বাভাবিক। মিয়ানমার থেকে এক কেজি পেঁয়াজ ৪২ টাকায় কিনছেন আমদানিকারকরা। এর সঙ্গে বিভিন্ন খরচসহ প্রতি কেজিতে খরচ পড়ছে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। অথচ পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকায়। ভারত রপ্তানির ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণের আগে প্রতি কেজি পেঁয়াজের আমদানিতে দাম পড়েছে ২৮-৩০ টাকা। অথচ সেই পেঁয়াজ এখন পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকা। মিসর থেকে ৫৫ টাকায় আমদানি করে পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৮৫ টাকা। চীন থেকে ৪৫ টাকায় আমদানি করে পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা এবং তুরস্ক থেকে ৪৫ টাকার পেঁয়াজ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তর পেঁয়াজের যৌক্তিক একটি মূল্য নির্ধারণ করে। যদিও গত মৌসুমের জন্য তারা কোনো মূল্য নির্ধারণ করেনি। অজুহাত হিসেবে জনবল সংকটকে দেখানো হয়েছে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এর আগের বছর একটি যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। যেহেতু বছরান্তে উৎপাদন খরচ প্রায় সমান, তাই চলতি বছরও আগের মূল্য প্রযোজ্য। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রতি কেজি পেঁয়াজে উৎপাদন ব্যয় ছিল ১৫ টাকা। কৃষক পর্যায়ে যৌক্তিক বিক্রয় মূল্য ছিল ১৭-১৮, পাইকারিতে ১৯ ও খুচরা পর্যায়ে ২১ টাকা। তবে সরকার নির্ধারিত কোনো দাম কার্যকর হয় না। ফলে ভোক্তাদেরও জিম্মি দশা থেকে মুক্তি মিলছে না।