পুকুরপাড়ে সবজি ও ফল চাষ

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার অধিকাংশ জমিই নিচু ও মাঝারি ধরনের নিচু। এসব জমিতে ধান ছাড়া অন্য ফসলের চাষ তেমন হয় না বললেই চলে। গত কয়েক বছর ধরে ধানের দাম কম থাকায় কৃষক ঝুঁকছেন মাছ চাষের দিকে। এখানে মাছ চাষের অনেক সুবিধা আছে। সুবিধাগুলো হলো– এখানকার মাটি ও আবহাওয়া মাছ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নিচু জমির চারদিকে সামান্য উঁচু আল তৈরি করে এবং মাঝখানে অল্প মাটি কেটে ও কম খরচে পুকুর তৈরি করে মাছ চাষ করা যায়। রাজধানী ঢাকা ও বিভাগীয় শহর ময়মনসিংহের সঙ্গে এ উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব উন্নত। উৎপাদিত মাছ বিক্রির জন্য সহজেই ঢাকা ও ময়মনসিংহে নিয়ে যাওয়া যায়। এসব সুবিধার জন্য ত্রিশালে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে মাছ চাষের এলাকা ও মাছ উৎপাদনকারী চাষির সংখ্যা।

ত্রিশাল উপজেলায় এখন ২ হাজার ৯৯৮ হেক্টর এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হচ্ছে । এ কাজের সঙ্গে প্রায় ৪ হাজার ৫৫০ জন মাছচাষি ও তাদের পরিবার-পরিজন যুক্ত। ত্রিশাল উপজেলায় বছরে মাছ উৎপাদিত হয় ৮২ হাজার ২৮৩ মেট্রিক টন। চাহিদা ৭ হাজার ৩৭৬ মেট্রিক টন। চাহিদার চেয়ে এই উপজেলায় ৭৪ হাজার ৯০৭ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদিত হয়। চাহিদার অতিরিক্ত মাছ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বগুড়া, রাজশাহী, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি করা হয়। এই উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌর এলাকায় মাছের চাষ হয়। তবে ত্রিশাল, রামপুর, বীররামপুর, ধলা, ছলিমপুর, পোড়াবাড়ি, মোক্ষপুর, কান্দানিয়া, ধানীখোলা, কাঁঠালিয়া, বালিপাড়া, বৈলর, হদ্দের ভিটা, কোনাবাড়ি, শাখুয়া, দরিল্লা প্রভৃতি গ্রামে বেশি পরিমাণে মাছের চাষ হয়। এখানে সবচেয়ে বেশি চাষ করা হয় পাঙ্গাশ মাছের। পাঙ্গাশ ছাড়াও তেলাপিয়া, সিলভার কার্প, মিনার কার্প, বিগহেড, গ্রাস কার্প, থাই সরপুঁটি, থাই কই এবং রুই, কাতল, মৃগেল, পাবদা, গুলশা, শিং ও মাগুর মাছও চাষ করা হয়।

আজ থেকে ৮ থেকে ১০ বছর আগেও মাছচাষিরা পুকুরপাড়ে কোনো শাকসবজি ও ফলমূলের চাষ করতেন না। পতিত পুকুরপাড়ে উৎপাদিত ঘাস ব্যবহার করা হতো গবাদি পশুর খাবার হিসেবে। এখন সেই অবস্থা নেই। প্রতিটি মাছচাষিই পুকুর পাড়ের জমিতে শুরু করছেন শাকসবজি ও নানা রকম ফলের চাষ। উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল মাছচাষিদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করছে। অতিরিক্ত শাকসবজি ও ফলমূল বিক্রি করে মাছচাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

পুকুরপাড়ের সবজি ও ফল বাগানের একটি ভালো দৃষ্টান্ত ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সাংসদ হাফেজ রুহুল আমীন মাদানির পুকুর ও বাগান। তিনি তার নিজ বাড়ি পাঁচ পাড়াতে মাছ চাষের পুকুরপাড়ে গড়ে তুলেছেন পরিকল্পিত সবজি ও ফলের বাগান। তার প্রায় এক একরের পুকুর পাড়ে ৬৫টি ঝাড়ে রয়েছে ১৯৫টি ড্রাগন ফলের গাছ। প্রতিটি গাছে এখন ফুল ফুটছে। কোনো গাছে ঝুলে আছে লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন ড্রাগন ফল। এ ছাড়া পুকুরপাড়ের ওই বাগানে আছে লিচুর মতো বিদেশি রামবুথান ফলের গাছ। দেশি ফলের মধ্যে আছে বারোমাসি আম, আম্রপালি জাতের আম, গন্ধ লেবু, নারকেল, সুপারি, পেঁপের গাছ। বাগানের সঙ্গেই আছে ৮ থেকে ১০টি গরু ও ৭ থেকে ৮টি টার্কির ক্ষুদ্র খামার। নতুন জাতের ফল গাছ সংগ্রহ তার নেশা। তার ইচ্ছা তিনি পুকুরপাড়ে কিউ জাই ও ব্রম্ননাইকিং জাতের আমগাছ লাগাবেন। ব্রম্ননাই কিং জাতের গাছে চার কেজি ওজনের আম ধরে। দেখলে মনে হয় আম নয়; বড় পাকা পেঁপে। ত্রিশালের এই সংসদ সদস্যও পুকুর ও বাগান এলাকার আরও অনেককেই উৎসাহিত করছে।

ত্রিশাল উপজেলার ১ নম্বর ধানীখোলা ইউনিয়নের ধানীখোলা দক্ষিন ভাটিপাড়া দ্বীপচর গ্রামের মাছচাষি মো. রুহুল আমীন তার নিজস্ব বুদ্ধি ও প্রযুক্তি দিয়ে ০ দশমিক ২৫ একর আকারের পুকুরের চার পাড়ে গড়ে তুলেছেন একটি সবজি ও ফলের বাগান। এ বাগান থেকে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফল দিয়ে তার পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত শাকসবজি ও ফল বিক্রি করে তিনি বছরে আরও প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করেন। দ্বীপচরের রুহুল আমীনের পুকুরপাড়ের বাগানে রয়েছে– ২শটি পেঁপেগাছ, ৫টি নারকেলগাছ, ৫০টি সুপারিগাছ, ৬টি আমগাছ, কয়েকটি জাম্বুরা ও কামরাঙাগাছ। সবজির মধ্যে রয়েছে– ঢেঁড়স, ডাঁটা, পুঁই শাক ও কাঁচা মরিচ। পুকুরের পাড়ঘেঁষা মাচায় লাউ, শিম ও চালকুমড়ার মতো লতা জাতীয় সবজিও চাষ করেন তিনি। গরু-ছাগলের উপদ্রব থেকে বাগান রক্ষার জন্য তিনি তার পুকুরপাড়ের চারদিকে দিয়েছেন সবুজ প্লাস্টিক নেটের বেড়া। ত্রিশাল নামাপাড়ার আর একজন মাছচাষি আব্দুর রহমান তার পুকুরপাড়ের চারদিক সাজিয়েছেন বারোমাসি আম ও চিবিয়ে খাওয়া জাতের আখ চাষ করে। সারা বছরই তার পুকুরপাড়ের গাছে আম ধরে। অমৌসুমে প্রতি কেজি আম বিক্রি হয় ৩০০ টাকা দরে। দুই একর জমির পুকুরপাড়ের আম ও আখ বিক্রি করে তিনি গত বছর খরচ বাদে আয় করেন প্রায় দুই লাখ টাকা। পুকুর পাড়ের একটি অংশে বারোমাসি আমের একটি মিনি নার্সারিও গড়ে তুলেছেন তিনি। ওই নার্সারিতে উৎপাদিত প্রতিটি আমের চারা তিনি ১০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে সারা দেশে পুকুর রয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ৭৫২ হেক্টর, চিংড়ি খামার ৫ হাজার ৪৮৮ হেক্টর, কাঁকড়া খামার ২ লাখ ৭২ হাজার ৭১৭ হেক্টর। অর্থাৎ মোট ১১ লাখ ১১ হাজার ৯৫৭ হেক্টর জমিতে বদ্ধ পুকুর রয়েছে দেশে। এসব পুকুরপাড়ের উঁচু জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শাকসবজি ও ফল চাষের পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। পুকুরপাড়ে কী কী ফল ও সবজি চাষ করা যায়, এসব ফল ও সবজি উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে মাছচাষিদের তেমন কোনো ধারণা নেই। তাদের উৎসাহিত করতে এবং পুকুরপাড়ে সবজি ও ফল চাষ ফলপ্রসূ করতে প্রয়োজন টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি, পরামর্শ, ঋণ সহায়তা ও গবেষণা।

বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে দেখেছি– পুকুরপাড়ে সাধারণত ছোট আকৃতির, কম পাতা ঝরা ও কম ছায়াযুক্ত গাছ লাগানো উচিত। পুকুরপাড়ে আম্রপালি জাতের আম, বারি মাল্টা-১, রেড লেডি, টপ লেডি, কাশেমপুরী ও শাহী জাতের পেঁপে, থাই পেয়ারা, লেবু, কলা, সৌদি খেজুর, ভিয়েতনামি খাটো জাতের নারকেল ও সুপারিগাছ লাগানো যেতে পারে। আর শাকসবজির মধ্যে ঢেঁড়স, পুঁই শাক, বেগুন, আমঝুড়ি বেগুন, লাল শাক, ডাঁটা, পাট শাক, টমেটো, কাঁচা মরিচ এবং লতা জাতীয় সবজির মধ্যে লাউ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, করলা, ঝিঙ্গা, বরবটি, শিম, বাঙ্গি প্রভৃতি ফসলের চাষ করা যেতে পারে। এছাড়া পুকুরপাড়ের উঁচু জমিতে রংবিলাস জাতের চিবিয়ে খাওয়া জাতের আখের চাষও করা যেতে পারে।

এ কাজে কৃষি সম্পªসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ সুগার ক্রপ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। কৃষি সম্পªসারণ অধিদপ্তরের উদ্যানতত্ত্ব উইংও রাখতে পারে উল্লেখযোগ্য অবদান।

বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, ফল ও সবজি চাষেও বাংলাদেশে ঘটেছে এক নীরব বিপ্লব। এ বিপ্লবকে টেকসই করতে হলে পুকুরপাড়ে ফল ও সবজি চাষে গুরুত্ব প্রদান করে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে শুধু পুষ্টি চাহিদাই পূরণ হবে না, পাশাপাশি সৃষ্টি হবে গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থানের সুবর্ণ সুযোগ।
লেখক

সাবেক মহাব্যবস্থাপক, কৃষি, নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস্‌ লি., নাটোর

netairoy18@yahoo.com