রাজধানীর রূপনগরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর স্কুলছাত্র মো. মিজানের সাদা পোশাক রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। তার নারী-ভুঁড়ি বেরিয়ে পড়েছিল। পাশেই পড়েছিল স্কুলব্যাগ। এমন অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকা ছয় বছরের এই শিশুকে মৃত ভেবে কেউ উদ্ধারও করছিল না। বেশ কিছু সময় পর মো. রাসেল নামে এক রিকশাচালক তার কাছে গিয়ে বুঝতে পারেন, মিজান মরেনি। সে শ্বাস নিচ্ছে। তখনই রাসেল তার কাছে থাকা গামছা দিয়ে মিজানের নারী-ভুঁড়ি পেটের সঙ্গে বেঁধে রিকশায় তাকে প্রথমে একটি স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা না দেওয়ায় মিজানকে নিয়ে তিনি যান মিরপুর ২ নম্বরের শিশু হাসপাতালে। অবস্থা গুরুতর দেখে ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠায় তাদের অ্যাম্বুলেন্সে। গতকাল বুধবার রাত ৯টায় এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত ঢামেক হাসপাতালে মিজানের অস্ত্রোপচার চলছিল। এ সময় অস্ত্রোপচার কক্ষের বাইরে স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা যায়। চিকিৎসকের বরাত দিয়ে স্বজনেরা জানিয়েছেন, মিজানের অবস্থা সংকটাপন্ন।
রাজধানীর মিরপুর রূপনগরের শিয়ালবাড়ি এলাকায় গতকাল বুধবার বিকেলে বেলুন ফোলানোর ওই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে গুরুতর আহত মিজান স্থানীয় প্রতিভা স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। তার বাবার নাম মো. রোকন। পেশায় ভ্যানচালক। পরিবার নিয়ে শিয়ালবাড়ি ১২ নম্বর রোডের মজিবরের বস্তিতে থাকেন। দুই ভাইয়ের মধ্যে মিজান বড়। ছোট ভাই মেহেদির বয়স আড়াই বছর।
গতকাল রাতে ঢামেকে কথা হয় মিজানের উদ্ধারকারী রাসেলের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনাস্থলের পাশেই আমার বাসা। বিকেলে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে রাস্তায় বের হয়ে দেখি বীভৎস অবস্থা। রাস্তা রক্তে ভেসে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে আহত মানুষ। যারা কাতরাচ্ছে তাদেরই উদ্ধার করছে স্থানীয়রা। হঠাৎ দেখি একটি বাচ্চা স্কুল পোশাকে অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তার সমস্ত শরীরে জখম। সাদা স্কুল পোশাক রক্তে লাল হয়ে গেছে। পেটের নারী-ভুঁড়ি রাস্তায় পড়ে আছে। মৃত ভেবে কেউ তাকে উদ্ধার করছে না। আমি কাছে গিয়ে নাকের কাছে কান পেতে দেখি নিঃশ্বাস নিচ্ছে। দ্রুত তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। তার পরিচয় তখন জানতে পারিনি। পরে মিজানের বাবা হাসপাতালে এসে ছবি দেখে চিনতে পেরেছে।’
ঢামেক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে বিমর্ষ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায় মিজানের বাবা রোকনকে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, মিজান কোচিং শেষ করে বাড়িতে ফিরছিল। দুর্ঘটনার সময় রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। ছেলে কীভাবে আহত হয় জানতে চাইলে রোকন বলেন, ‘বাসায় ফেরার সময় পার হয়ে সন্ধ্যা হলেও মিজান বাড়ি ফিরছিল না। আমি খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে বেলুন বিস্ফোরণের ঘটনা জানতে পারি। পরে ঢাকা মেডিকেলে এসে ছবি দেখে চিনতে পেরেছি। ওর অপারেশন চলছে। চিকিৎসকেরা বলেছেন, অবস্থা ভালো না। আল্লাহকে ডাকেন।’
বিস্ফোরণের প্রত্যক্ষদর্শী জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, রাস্তার মাঝখানে ভ্যানে বেলুন বিক্রি করছিলেন একজন। প্রতিদিনই তিনি ওখানে বেলুন বিক্রি করেন। আশপাশের ছেলেমেয়েরা সেখানে ভিড় করত। এ ছাড়া জনবহুল এলাকা হওয়ায় সেখানে সব সময় মানুষের ভিড় থাকত।
পোড়া মুখেই বাবার কাছে ছুটে যায় জুবায়ের : রূপনগরে মণিপুরী স্কুলের সামনের এই বিস্ফোরণে গুরুতর আহত জুবায়ের ইসলাম সিয়াম পোড়া মুখ নিয়েই ছুটে যায় বাবার কাছে। তখন তার মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। স্থানীয় এড্যাফ স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম। বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দগ্ধ হয় সে। তাকে উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যান বাবা তোফাজ্জল হোসেন। বর্তমানে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে সে। তাদের বাসা শিয়ালবাড়ি আবাসিক এলাকার ১৩ নম্বর সড়কে। গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের জয়পুরে। চার ভাইবোনের মধ্যে সে তৃতীয়।
ঢামেকের বার্ন ইউনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক আনহুরা গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিয়ামের মুখের উপরিভাগ, গলার কিছু অংশ ও বুকের সামনের অংশ পুড়ে গেছে। বার্নের পরিমাণ কম হলেও তার অবস্থা ভালো বলা যাবে না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কিছু বলা যাচ্ছে না। পরে তার মুখ ফুলে যেতে পারে। এ জন্য ভর্তি থাকতে হবে।’
বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, সমস্ত শরীরে ব্যান্ডেজ মোড়ানো সিয়াম বেডে শুয়ে আছে। পাশেই বসে আছেন বাবা তোফায়েল, মা সোলেখা বেগম ও বড় বোন তন্বী আক্তার।
বোন তন্বী দেশ রূপান্তরকে জানান, বিস্ফেরেণের সময় রাস্তা দিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল সিয়াম। সে পড়ালেখায় বেশ ভালো।
সিয়ামের বাবা তোফায়েল বলেন, ‘ঘটনাস্থলের পাশেই আমার সবজির দোকান। বিকেলে হঠাৎ সিয়াম দৌড়ে এসে দোকান থেকে পানি নিয়ে মুখে ঢালছিল। আমি দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সিয়ামের শরীরের ৫ ভাগ পুড়ে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি রাখতে হবে।’