পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক ও সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদের জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলায়, ১৯৫৬ সালের ১৮ নভেম্বর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ছাত্রাবস্থায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (জাসদ) রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ১৯৭৯-৮০ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সহ-সভাপতি ছিলেন। নূর মোহাম্মদ ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) পরীক্ষা দিয়ে পুলিশ বিভাগে যোগদান করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালের ৮ এপ্রিল তিনি মরক্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান। এছাড়া তিনি যুব ও ক্রীড়া সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি জাতীয় সংসদের সংসদ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য। সাইবার ক্রাইম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চলমান শুদ্ধি অভিযানসহ নানা বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের অনিন্দ্য আরিফ
দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি ভোলার বোরহানউদ্দীন উপজেলায় ফেইসবুকের একটি লেখাকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা এবং সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে চারজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। যে যুবকের আইডি হ্যাক করে ঘটনাটি ঘটানো হয়, সে যুবক নিজেই পুলিশের কাছে হাজির হয়ে তার আইডি হ্যাক হওয়ার কথা জানায়। আমরা আগেও দেখেছি, সামাজিক মাধ্যমে নানা ভুয়া সংবাদ প্রচার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টসহ নানাভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমের এই অপচর্চা কি প্রচলিত আইন দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব?
নূর মোহাম্মদ : বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি ছাড়া কোনো কাজ করা অসম্ভব। প্রযুক্তি আমাদের দেশে এত দ্রুত চলে আসছে যে কোনো ধরনের মানসিক, শারীরিক এবং শিক্ষাগত প্রস্তুতি ছাড়াই তা আমাদের গ্রহণ করতে হচ্ছে। প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক যেমন আছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও আছে। প্রযুক্তিকে যদি আমরা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করি, তাহলে এই সমস্যাগুলো ঘটে না। সাম্প্রতিক সময়ে ভোলায় যে ঘটনা ঘটেছে, এরকম ঘটনা এই কয়েক বছরে আরও ঘটেছে। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে দেখেছি, ফেইসবুক ব্যবহারে ঢাকা এখন নাকি দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। তাই এখানে ফেইসবুকের ব্যবহার অতিরিক্ত হারে দেখা যাচ্ছে। দেশে একজন অশিক্ষিত ব্যক্তিও ফেইসবুক ব্যবহার করছে। সবকিছুতে তো নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকার কথা। এখানে কিন্তু নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই। আমরা কী খাচ্ছি, কার সঙ্গে দেখা করছি সব ধরনের ঘটনাই আমরা ফেইসবুকে পোস্ট করছি। আমাদের ওই ন্যূনতম শিক্ষা নেই যে, কোনটি আমি পোস্ট করব আর কোনটি করব না। আমি ভাত খাচ্ছি, এই বিষয়টি ফেইসবুকে পোস্ট দেব না কি শিক্ষণীয় কিছু ফেইসবুকে পোস্ট দেব এই বিবেচনাবোধটা আমাদের অনেকের মধ্যে কাজ করে না। তাই আমি মনে করি, এই বিষয়টি শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানবিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষা খুবই জরুরি বিষয়।
অপরাধীরা যেভাবে ফেইসবুক ব্যবহার করে, তেমনি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও এর ব্যবহার করে থাকে। অনেক সময় দেখা যায় যে, মোবাইল ট্র্যাকিং করে কিংবা ফেইসবুকের সূত্র ধরে অপরাধী শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ভোলার যে ঘটনাটি ঘটল তার পেছনে শিক্ষার বিষয়টি সম্পৃক্ত। আর ষড়যন্ত্রের বিষয়টি তো আছেই। আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সবাই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে, এক ধরনের সুযোগসন্ধানী মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রী দেশকে যেভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, সেখানে একটি মহল তো একে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে। ভোলার ঘটনায় এ ধরনের ইন্ধন কাজ করছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইনের পরিবর্তন ঘটে। একটা কথা আমরা প্রায়শই বলে থাকি- ‘ল ইজ মোর টু বি ওবে দ্যান ইমপ্লিমেন্টেড’। অর্থাৎ আইন প্রয়োগের চাইতে মেনে চলার প্রবণতা মানুষের মধ্যে থাকলে ভালো হয়। এখন আমাদের যে বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে তা প্রচলিত আইনি কাঠামোর মধ্যেই হচ্ছে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীদের খুঁজে বের করছে। এক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা নেই।
দেশ রূপান্তর : এক্ষেত্রে সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধের জন্য আমাদের প্রচলিত আইন পর্যাপ্ত কি না?
নূর মোহাম্মদ : সাইবার ক্রাইমের ইনভেস্টিগেশন, ইনকোয়ারির জন্য যে আমাদের যে ইউনিটগুলো কাজ করছে, সেগুলো যথেষ্ট অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দেশে-বিদেশে অনেক প্রশিক্ষণ নিয়েছে। আমরা যদি হলি আর্টিজান থেকে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পরিসংখ্যান নেই, তাহলে দেখব এসব ক্ষেত্রে অপরাধীরা ফেইসবুক, ইন্টারনেট ইত্যাদি আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েছে। আর আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও এক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে এগুলো উদঘাটন করেছে। এখানে তাদের একটা সাফল্যের কাহিনী আছে। তারা দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পেরেছে। আচ্ছা, কেন মানুষ জঙ্গিতে পরিণত হচ্ছে? ইরাকে, সিরিয়ায় বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসব কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, ইস্তাম্বুল থেকেও যাচ্ছে। এদের যাওয়ার নেপথ্যে সাইবার ক্রাইম ভূমিকা রাখছে। এই যে ইরাকে বাগদাদি মারা গেলেন, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র তার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।
এখন দেখতে হবে, আইসিস এ ধরনের কাজ কেন সংঘটিত করতে পারছে। ওদের চাইতে তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশিক্ষণ অনেক বেশি রয়েছে। তারা এটা পারছে কেননা তারা গল্প তৈরি করতে পারছে। ওরা মানুষকে প্ররোচিত করতে পারছে, কেননা ওদের ভালো গল্প বলার ক্ষমতা রয়েছে। ওরা কি গল্প তৈরি করছে? ওরা বলছে লক্ষ লক্ষ মুসলিম নির্যাতিত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে, নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে, গজব নাজিল হচ্ছে এসবের পেছনে ওরা দায়ী। এসব কাহিনী ফেঁদে ওরা ছেলেমেয়েদের সংগ্রহ করতে পারছে। আমাদের এর পাল্টা গল্প সৃষ্টি করতে হবে। আমাদের বোঝাতে হবে যে ওরা যেটা করছে তা অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় কোনো দিক থেকেই ভালো নয়। পাল্টা গল্প আপনাকে তৈরি করতেই হবে।
দেশ রূপান্তর : প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ না কি আইনের আধুনিকায়ন? সমাধান কী?
নূর মোহাম্মদ : সবই তো প্রযুক্তিনির্ভর। আমরা ফোনে কথা বলছি, ইন্টারনেট ব্যবহার করছি, ফেইসবুক ব্যবহৃত হচ্ছে সবই তো প্রযুক্তি। তবে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, নেটওয়ার্কিং। সবক্ষেত্রেই নেটওয়ার্কিং ছাড়া আপনি কোনো দিকে যেতে পারবেন না। নেটওয়ার্কিং ছাড়া আজকের দুনিয়ায় কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। দুনিয়াটা একটা গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। এই সত্যিটা স্বীকার না করে উপায় নেই। এমনকি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মামলার তদন্ত এবং তথ্য অনুসন্ধানে প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে সাফল্য লাভ করেছে। তাই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এক্ষেত্রে আইনের আধুনিকায়ন ঘটাতে হবে।
দেশ রূপান্তর : চলমান ‘শুদ্ধি অভিযান’ সম্পর্কে অনেকে মন্তব্য করছেন যে এটা লোক দেখানো। আপনার অভিমত কী?
নূর মোহাম্মদ : শুদ্ধি অভিযান তো শুদ্ধি অভিযানই। এ অভিযান সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে। এই অভিযানে যারা ধরা পড়েছে, তারা তো সবাই ক্ষমতাসীন দল এবং এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী। এমনকি তালিকায় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরাও রয়েছেন। সুতরাং এটাকে লোক দেখানো বা আইওয়াশ বলার সুযোগ নেই। উনারা না থাকলে বুঝতাম, আইওয়াশ হচ্ছে। কিংবা যদি দেখতাম বিএনপি ও জামাত-শিবিরের লোকজন এই অভিযানে ধরা পড়ছে, তাহলে বুঝতাম আইওয়াশ হচ্ছে। কিন্তু সবাই তো ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইতিমধ্যে ওদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, রিমান্ডে নিয়েছে। পত্রিকায় দেখলাম, ৫০ জনকে দুদক নোটিস দিয়েছে। এটাকে হাল্কাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই অভিযান সমাজ ও অপরাধীদের জন্য একটা বার্তা। অন্য সেক্টরের যারা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, তাদের জন্যও এটা একটা বার্তা। এক সময় তারাও এই অভিযানের আওতায় আসবে বলে আমার বিশ্বাস রয়েছে। বিএনপি সরকারের সময় আমরা এরকম একটা অভিযান দেখেছিলাম। কিন্তু সেটা এভাবে ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি। আমরা যদি সবকিছুকে নেতিবাচকভাবে দেখি তাহলে হাজারো ভালোর মধ্যে আমরা খালি সমস্যাই দেখব। আর যদি নেতিবাচক হই, তাহলে হাজারো সমস্যার মধ্যে সমাধান খুঁজে পাব। তাই শুদ্ধি অভিযানকে নেতিবাচকভাবে না দেখে, ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত।
দেশ রূপান্তর : আপনি যখন পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন, তখনকার চেয়ে এখনকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কি অবনতি ঘটেছে না কি উন্নতি হয়েছে?
নূর মোহাম্মদ : আমরা ১০ বছর আগে পুলিশে ছিলাম। আমাদের সময়ের চাইতে এখনকার পুলিশের সক্ষমতার অনেক পার্থক্য রয়েছে। পুলিশের সক্ষমতা এখন অনেক বেড়েছে। এখন মেধাবীরা পুলিশের চাকরিতে আসছে। বিদেশ থেকে অনেক প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। আমি যে পুলিশের আইজিপি ছিলাম, জীবনে দুই-একটি ছাড়া তেমন কোনো প্রশিক্ষণ পাইনি। আর এখন দেখেন, শুরু থেকেই প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। দেশে তো পাচ্ছেই, এমনকি বিদেশেও প্রশিক্ষিত হচ্ছে। যে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে প্রশিক্ষিত হচ্ছে, তার তো ওখানকার লোকজনের সঙ্গে সংযোগ হচ্ছে। সে প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা নিতে পারছে। তাই পুলিশের সক্ষমতা এখন অনেক বেড়েছে। পেশাদারিত্বের জায়গা থেকে ওদের অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। আমাদের সময় তো ‘ট্র্যাডিশনাল পুলিশিং’ ছিল। মানে চুরি, ডাকাতি, খুনখারাবি ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আর এখন তো প্রযুক্তির কল্যাণে অপরাধের ধরন পাল্টে গিয়েছে। তাই এখন চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি। এখন পুলিশের অনেক ইউনিট হয়েছে। যেমন আগে তদন্তের জন্য শুধু সিআইডি ছিল। এখন এর পাশাপাশি পিবিআই, কাউন্টার টেরোরিজম হয়েছে। পুলিশের প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।