রাজধানীর ধানমন্ডিতে গৃহকর্মীসহ বৃদ্ধাকে খুনের প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে এক তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ। গত শুক্রবারের ওই জোড়া খুনের ঘটনার আগে যে কাজের বুয়ার বেশে বাসায় ঢুকেছিল। তার পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট। প্রায় দুই ঘণ্টা বাসায় থেকে কৌশলে পালিয়ে যায় সে। তারপরই ধানম-ির ২৮ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলার ফ্ল্যাটটি থেকে গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম (৬৫) ও তার কাজের মেয়ে দিতির (১৮) গলা কাটা লাশ উদ্ধার করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পালিয়ে যাওয়া কাজের বুয়াকে গ্রেপ্তার করতে পারলেই এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে। চাঞ্চল্যকর এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও হত্যাকারীদের শনাক্ত করতে ধানমন্ডি থানা পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি মাঠে নেমেছে। ধারণা করা হচ্ছে, পেশাদার খুনিরা এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।
ধানম-ি থানার ওসি (তদন্ত) আশফাক রাজীব হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হত্যাকান্ডের সম্ভাব্য সব কারণ সামনে রেখে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। প্রাথমিকভাবে পলাতক কাজের বুয়াকে প্রধান সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এখন তাকে গ্রেপ্তার করতে পারলে খুনের সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে জানা যাবে। হত্যার উদ্দেশ্যও পরিষ্কার হবে।’ তিনি জানান, ভবনের পঞ্চম তলায় আফরোজার মেয়ে দিলরুবা সুলতানা ও তার স্বামী ব্যবসায়ী মনির হোসেন তারিম থাকেন। তার ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চুসহ ৬ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে বাসার মালামাল লুট, ব্যক্তিগত বিরোধ বা তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকার জমিসংক্রান্ত বিরোধও থাকতে পারে।
গতকাল শনিবার দুপুরে ধানমন্ডি২৮ নম্বর রোডের ২১ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখা যায়, ফ্ল্যাটের যে কক্ষ থেকে কাজের বুয়া দিতির লাশ উদ্ধার করা হয় সেখানকার রক্ত পরিষ্কার করা হয়নি। রুমের দরজা খুলতেই দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কালচে রক্তে মাছি ভন ভন করছিল। সেই কক্ষ দেখিয়ে নিহত আফরোজার মেয়ে দিলরুবার স্বামী মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখেন রক্তের মধ্যেই ঝাড়ু পড়ে আছে। এখানেই তাকে প্রথম হত্যা করা হয়। তার মানে খুন হওয়ার আগে হয়তো মেয়েটি ঝাড়ু দিচ্ছিল, ওই সময়ই তাকে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। দিতিকে হত্যার পর আমার শাশুড়ির রুমে যায় ঘাতক।’ মনির হোসেন সেই রুম দেখিয়ে বলেন, ‘দেখেন ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত কত দূরে গিয়ে পড়েছে। তার মানে আম্মা (আফরোজা বেগম) হয়তো খাটের ওপর শোয়া বা বসা ছিলেন। ওই অবস্থায় তাকে ছুরি দিয়ে গলায় আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো রক্ত দ্রুতবেগে বের হয়েছিল, যা দুই-তিন ফিট দূরে দিয়ে পড়েছে। এরপর তাকে আরও আঘাত করে হত্যা নিশ্চিতের পর লাশ টেনেহিঁচড়ে ড্রয়িংরুমে নিয়ে রাখে।’ তিনি বলেন, ‘বেডরুমে মেরে তাকে টেনেহিঁচড়ে কেন ড্রয়িংরুমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সে বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না। তবে তাকে হত্যার পর তার হাত থেকে সোনার বালা, কানের দুল ও হাতের আংটি খুলে নিয়ে গেছে। হত্যার এক/দুইদিন আগে ব্যাংক থেকে নগদ দেড় লাখ টাকা তুলে রেখেছিলেন আলমারিতে। সেই টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া আগে থেকেই তার কাছে আরও টাকা ছিল। তবে কত ছিল তা এখনই বলতে পারছি না। কিছু স্বর্ণালংকারও ছিল আলমারিতে। সবকিছু তছনছ অবস্থায় পাওয়া গেছে।’
মনির হোসেন বলেন, ‘যে বাচ্চুর মাধ্যমে কাজের বুয়া এসেছিল, সেই বাচ্চু দীর্ঘদিন ধরেই তাদের সঙ্গে। বাচ্চু প্রথমে আমার শ্বশুরের কাছে ছিল, শ্বশুর মারা যাওয়ার পর বাচ্চু আমার সঙ্গেই থাকতেন। হত্যাকন্ডের দুদিন আগে বাচ্চুকে ধমক দিয়েছিলেন শাশুড়ি। তার মনে কোনো কিছু ছিল কি না বলতে পারছি না। তার মাধ্যমেই কাজের মেয়েটি বাসায় ঢুকেছিল। তার পরনে জিন্সের প্যান্ট ছিল।’
খুন হওয়ার ৫ মিনিট আগেও মেয়ের সঙ্গে কথা হয় : আফরোজার একাধিক স্বজন দেশ রূপান্তরকে জানান, শুক্রবার বিকাল ৪টার দিকে আফরোজা বেগম, তার মেয়ে দিলরুবা সুলতানা ও মনির হোসেন তারিম তাদের পাঁচতলার ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওইসময় বাচ্চু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়। কাজ করবে বলে জানায়। মনির হোসেন বলেন, ‘দরজা খোলা অবস্থায় বাইরে দাঁড়িয়েই তার সঙ্গে কিছু কথা বলি। তারপর বাচ্চুকে বলি, ওকে নিচের রুমগুলো দেখিয়ে দিতে। কীভাবে কাজ করবে- সে বিষয়ে ধারণা দিতে তাদের দুজনকে চতুর্থ তলায় পাঠিয়ে দিই। তখন আমাদের বাসার কাজের ছোট ছেলেটি রিয়াজকেও পাঠাই। কিছুক্ষণ পর রিয়াজ চলে আসে, আম্মা চার তলায় যান। কিছুক্ষণ পর আমার স্ত্রী (দিলরুবা সুলতানা) ফোনে কথা বলে আম্মার সঙ্গে।’ মনির বলেন, ‘আমার স্ত্রী তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাই দুজনে প্রায় সবসময়ই কথা বলেন। কাজের মেয়েকে দেখার জন্য আম্মা নিচে যাওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় আবারও তাকে ফোন করে দিলরুবা। কিন্তু তখন ফোন বন্ধ পায়। তারপর আবার রিয়াজকে পাঠানো হয়। রিয়াজ গিয়েই লাশ পাওয়ার খবর জানায়।’
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বুয়াবেশী ওই তরুণী ৫টা ৩২ মিনিটে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরবর্তী তদন্তে আরও জানা গেছে, মেয়েটি বাইরে বের হওয়ার সময় তার পায়ে রক্তের দাগ ছিল। রক্তমাখা একটি জুতা রাস্তায়ই ফেলে রেখে গেছে সে। গোয়েন্দা পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ধারণা করছি, উদ্ধার হওয়া রক্তমাখা জুতাটি সন্দেহভাজন কাজের বুয়ার।’ তার সহযোগী হিসেবে কয়েকজন থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আফরোজার স্বজনরা। মনির বলেন, ‘মেয়েটি একা ছিল না। তার আশপাশে আরও অনেকেই ছিল। কারণ আমি যখন ৩টার দিকে বাসায় ঢুকি, তখন বাসার সামনে রাস্তার বিদ্যুতের খুঁটিতে হেলান দিয়ে একাধিক তরুণীকে দেখেছি। চক্রের সদস্যরা কোনো গাড়িও ব্যবহার করতে পারে। কারণ ওই তরুণী খুব দ্রুতই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে পেরেছে।’
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মনিরের ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চু দাবি করেছেন, তিনি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এক পান দোকানদারের মাধ্যমে ওই তরুণীকে কাজের বুয়া হিসেবে বাসায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনিও তার পরিচয় ঠিকমতো জানেন না। ধানমন্ডি থানার তদন্তকারী এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুয়াবেশী নারীর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা তার স্থায়ী ঠিকানা জানতে পেরেছেন। সেই অনুযায়ী অভিযান চালানো হয়েছে। তবে সেখানে তাকে পাওয়া যায়নি। গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। রাজধানীর কোথাও ওই নারী আত্মগোপন করে আছে।
আটক ৬ : জোড়া হত্যাকাণ্ডের তদন্তের স্বার্থে ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যবসায়ী মনিরের ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চু, বাড়ির তিন নিরাপত্তারক্ষী নুরুজ্জামান, শাফিন, রুমান, ক্লিনার মনু ও ইলেক্ট্রিশিয়ান বেলায়েতকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারী একাধিক কর্মকতা। তারা জানান, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পালিয়ে যাওয়ার নারীর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তার সঙ্গে আরও কেউ ছিল কি না জানার চেষ্টা চলছে। হত্যার পর সে কীভাবে পালিয়ে গেল সে বিষয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম ও গৃহকর্মী দিতির লাশের ময়নাতদন্ত করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তিন সদস্যের মেডিকেল টিম। টিমের সদস্য মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. কবির সোহেল জানিয়েছেন, আফরোজা ও দিতির গলাসহ শরীরের একাধিক জায়গায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মৃতদেহ থেকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
দুই লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন ধানমন্ডি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক। তিনি জানান, মৃতদেহ দুটির গলায় ধারালো অস্ত্রের কাটা চিহ্ন রয়েছে। আফরোজা বেগমের ডান স্তনের নিচে ও পেটের ডান পাশেসহ বিভিন্ন স্থানে কাটা চিহ্ন পাওয়া গেছে। দিতির বাম স্তনের নিচেসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা চিহ্ন রয়েছে। এসব দেখে মনে হয়েছে, পেশাদার খুনিরাই এ জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে।
দিতির লাশ তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার পর ময়মনসিংহের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছেন স্বজনরা। আফরোজার মরদেহ হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা প্রবাসী দুই নাতনি দেশে আসার পর গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে বলে মনির জানিয়েছেন।