দখল করা জমি মুক্ত করার সময় হামলা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ময়নুল হক মঞ্জু সিন্ডিকেটের দখলে থাকা টিকাটুলীর স্বামী ভোলানন্দগিরি আশ্রমের সাড়ে ৩ বিঘা জমি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল শনিবার সকালে আশ্রম কর্র্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসী ওই সম্পত্তি উদ্ধার করে। এ সময় হিন্দু ও মুসলিম সংগঠনের নেতা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। আশ্রম কর্র্তৃপক্ষ ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, এ সময় মঞ্জুর সন্ত্রাসী বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। তবে মঞ্জু পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ওয়ারী থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) তামান্না জানান, সেখানে মন্দিরের সম্পত্তিতে সূর্যের হাসি ক্লিনিকসহ কয়েকটি স্থাপনা ছিল। মঞ্জু গ্রেপ্তার হওয়ায় মন্দিরের লোকজন সেটা তুলে দিয়ে দেয়াল নির্মাণ করতে গেলে স্থানীয় কয়েকজন তাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেখানে পুলিশের একটি দল মোতায়েন করা হয়।

টিকাটুলীর ১২ কে এম দাস লেনের শ্রীশ্রী ভোলানন্দগিরি আশ্রমটি প্রায় সাড়ে সাত বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেখানকার সাড়ে তিন বিঘা জমি ও একটি পুকুর দখলের অভিযোগে মঞ্জুসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৭ জুলাই ওয়ারী থানায় দুটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মঞ্জু ছাড়া মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বেসরকারি সংস্থা ন্যাশনাল টিউবারকিউলোসিস রিহ্যাবিলিটেশন সোসাইটির (এটিআরএস) মহাসচিব খন্দকার আবদুল মোমেন, কোষাধ্যক্ষ স ম হাসান জামান, সরদার আমিন শামছুদ্দোহা, সাবেক সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক, সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা এম এ রশীদ আজাদ, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হুমায়ুন মোল্লা, স্পেস প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীদুর রহমান, ঢাকা জেলা জজকোর্টের আইনজীবী এস এম এ কায়ুম, স্থানীয় বাসিন্দা এনায়েত করিম, ফজলুল করিম, রেজাউল করিম, নূরুল করিম, হোসনে আরা বেগম, আঞ্জুমান আরা বেগম, রেহেনা পারভীন, শাহানা সুলতানা ও  নিগার সুলতানা।

দুদকের নথি অনুযায়ী, ভোলানন্দগিরি আশ্রমের জায়গাটি দেবোত্তর সম্পত্তি। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এর তিন বিঘারও বেশি জায়গা দখল করে কয়েকজনের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন। পরে শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জি সি দেবের স্বাক্ষর জাল করে একটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে পাঁচটি ১০ তলা ভবন তৈরির চুক্তি করেন তারা। ফ্লোরের অর্ধেক-অর্ধেক ভাগাভাগির চুক্তিতে শিগগিরই কাজ শুরুর চেষ্টা করে চক্রটি। মামলার বিবরণীতে রেজিস্ট্রি মূল্য ২২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা দেখানো হলেও এর বাজার মূল্য শতকোটি টাকারও বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।  

আশ্রম ও ট্রাস্টের কর্মকর্তারা জানান, স্বাধীনতার বেশ কয়েক বছর আগে ট্রাস্ট করে ওই জমি দান করেন জিসি দেব। তবে শর্ত ছিল, সেখানে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল বানাতে হবে। সে অনুযায়ী জমির একাংশে এনটিআরএস (ন্যাশনাল টিউবারকিউলোসিস রিহ্যাবিলিটেশন সোসাইটি) দাতব্য চিকিৎসালয় নামে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়। যার তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত হন বিশিষ্ট চিকিৎসক (পরে জাতীয় অধ্যাপক) নুরুল ইসলাম। পাকিস্তান সরকারের বরাদ্দ দেওয়া ৫০ হাজার টাকায় সেখানে একটি একতলা ভবনও তৈরি করা হয়। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৩ সালে হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে জিসি দেব শহীদ হন। নব্বইয়ের দশকে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. গিয়াস উদ্দিনকে। পরে ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে সরিয়ে এর নিয়ন্ত্রক বনে যান কাউন্সিলর মঞ্জু। এরপর তিনি লিজ নেওয়ার জাল দলিল দেখিয়ে স্পেস কনস্ট্রাকশন নামের একটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্ট ভবন তৈরির চুক্তি করেন।

আশ্রম ও ট্রাস্টের এক কর্মকর্তা জানান, প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্রটি সাইনিং মানি হিসেবে নেয় সাড়ে তিন কোটি টাকা। শুধু ফ্ল্যাট বানালে প্রশ্ন উঠতে পারে তাই প্রকল্পটির সঙ্গে ছোট্ট একটি হাসপাতাল রাখার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।

এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার মঞ্জু গ্রেপ্তার হন। পরদিন অস্ত্র ও মাদক মামলায় তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। গতকাল ছিল তার রিমান্ডের প্রথম দিন।