মন্ত্রিসভা বৈঠক আজ

প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল অঙ্কের তহবিল হচ্ছে

সময় ও যুগের চাহিদা মেটাতে দেশীয় মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়নের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ থেকে একটি একক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে সরকার। এখন থেকে দেশে দক্ষতা উন্নয়নের যত ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আছে তার সবই নতুন গঠিত জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় আনা হচ্ছে। তহবিল, সময়োপযোগী পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবনসহ প্রশিক্ষণ দিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থা যেসব সমস্যা মোকাবিলা করে সেসব সমস্যার সমাধান দেবে এই কর্তৃপক্ষ। সব ধরনের প্রশিক্ষণ সমন্বয় করার জন্য এ কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ। সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নানা খাত থেকে এ ‘আনলিমিটেড ফান্ডের’ বা অর্থের জোগান দেবে। এই অর্থ ব্যবহার করার জন্য ‘জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল ব্যবহার নীতিমালা-২০১৯’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। নীতিমালাটি অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। বৈঠকে তহবিল ব্যবহার নীতিমালা ছাড়াও মন্ত্রিসভা বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে স্বাক্ষরিত আয়ের ওপর দ্বৈত করারোপ পরিহার ও রাজস্ব ফাঁকিরোধ সংক্রান্ত চুক্তির প্রস্তাব অনুমোদন সংক্রান্ত এজেন্ডা রয়েছে মন্ত্রিসভা বৈঠকের।

জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. ফারুক হোসেন গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল হচ্ছে ওপেন বাস্কেট বা আনলিমিটেড ফান্ড। এ তহবিলে যত টাকা লাগবে তত টাকা সরকার দেবে। এ অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি কোম্পানি গঠন করেছে। এ কোম্পানি তহবিলের জোগান দেবে। আর বিভিন্ন সংস্থা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় যেসব সমস্যা মোকাবিলা করছে কীভাবে সেসব সমস্যা সমাধান করা যায় আমরা তার উপায় বাতলে দেব। আমরা নিজেরা কোনো প্রশিক্ষণ দেব না। যারা প্রশিক্ষণ দেয় আমরা তাদের রেজিস্ট্রেশন করাব এবং তাদের কাজের সমন্বয় করব। আমাদের মতামতে ফান্ড রিলিজ করবে উন্নয়ন তহবিল কোম্পানি। ইতিমধ্যে শতাধিক সরকারি-বেসরকারি সংস্থা দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন নিয়েছে। সামনের দিনগুলোতে দক্ষতাভিত্তিক যে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হচ্ছে সেখান থেকে উত্তরণের জন্য এ কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।’

দক্ষতা উন্নয়ন কাজে অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার জন্য ২০১৬ সালে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ‘জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিল’ গঠন এবং ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ নামে নতুন একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। পরে ২০১৮ সালে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন পাস করা হয়।

দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানান, যেসব প্রশিক্ষণ কাজের দক্ষতা বাড়াবে আমরা শুধু সেসব প্রশিক্ষণই সমন্বয় করব। দক্ষতা বলতে কোনো একটা নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য অর্জিত কৌশল ও পেশার আদর্শমান অনুযায়ী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা মোতাবেক পণ্য বা সেবা উৎপাদনের সামর্থ্যকে বোঝায়। বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে প্রশিক্ষণের নামে বিদেশ ভ্রমণের জন্য এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে না। এ কর্তৃপক্ষ প্রশিক্ষণ দেবে তাদেরই যারা বিদেশে গিয়ে চাকরি করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাবে বা দেশের ভেতর কারিগরি কাজ করে সেবা দেওয়ার বিনিময়ে যারা অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে তাদের।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে বিভিন্ন সংস্থা নানাভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। বৈদেশিক কর্মস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সারা দেশে ৬৪টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ট্রেড কোর্সে প্রশিক্ষণ দেয়। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা দেশের মানুষকে প্রশিক্ষিত করার জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো নানা সমস্যায় ধুঁকছে। অনেক প্রশিক্ষণ কোর্সের পাঠ্যসূচি যুগোপযোগী নয়। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ভবন নির্মাণ আটকে আছে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে তারা দেশ-বিদেশে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। তাদের আরও বেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ দেওয়ার জন্য জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে।

বিশ^ায়নের প্রেক্ষাপটে সব পর্যায়ে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টের জন্য প্রশিক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবন, সংস্কার, সক্ষমতা বাড়ানো, অভিন্ন প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, বাস্তবায়ন করবে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে সংস্থাটি কাজ করছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ২০০৮ সালে দেশে কারিগরি শিক্ষার হার ছিল ১ থেকে ২ শতাংশ। এটা বেড়ে এখন ২০ শতাংশের কাছাকাছি। টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেইনিং রিফর্ম প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কারিগরি শিক্ষায় ব্যাপকতা এসেছে। কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ানোর জন্য মেয়েদের বৃত্তি দেওয়া হয়। তবে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। কারিগরি শিক্ষার জন্য একটি মাত্র বোর্ড। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থাও খারাপ।