সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস চাই

অনেক স্বপ্ন নিয়ে, অনেক রক্তের বিনিময়ে, মৃত্যুর বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে। তার মধ্যে একটি বড় বিষয় ছিল দ্বি-জাতিতত্তাভিত্তিক পাকিস্তানি ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত হয়ে একটি গণতন্ত্রী, সেক্যুলার বাংলাভাষিক রাষ্ট্র গঠন। পুরো পাকিস্তান আমলে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামায় অনেক মৃত্যু, অনেক অঘটন ঘটেছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজে সেসব স্বপ্ন কি সত্য হয়েছে? সত্যিকার অর্থে আমরা কি একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র পেয়েছি? সমাজটা কি পাকিস্তানি আমল থেকে ভিন্ন চরিত্রে সেক্যুলার বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে? রাজনীতি সম্বন্ধেও একই প্রশ্ন কি সত্য নয়?

এই প্রশ্নগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সামাজিক চরিত্রের বিচার-বিশ্লেষণ করতে গেলে বাস্তব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, উত্তরগুলো মূলত নেতিবাচক। কারণ সম্ভবত একটাই। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পুনর্গঠনের অগ্রাধিকারমূলক ব্যস্ততার পরিপ্রেক্ষিতে সমাজ চরিত্র বদলের দিকে নজর দেওয়া বা গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি। তাই সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে সমাজে নেতিবাচক উপাদানগুলোর অবাধ বাড়বাড়ন্ত ঘটেছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে একাধিক সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা সত্তে¡ও সমাজে মানবিক অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করা হয়নি।

পারিবারিক শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে পর্যায়ক্রমে ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতন্ত্রী সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার কোনো কর্মসূচি নেওয়া হয়নি, যা শৈশব-কৈশোরের কাঁচা মনে সেক্যুলার আধুনিক চেতনার ছাপ ফেলতে পারে। প্রচলিত ধর্মকে ব্যক্তিপর্যায়ে, ঘরোয়াপর্যায়ে আবদ্ধ রেখে মনুষ্যত্ববোধের মানবধর্মকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার কথা ভাবা হয়নি। জনমানস পূর্বধারায়, পাকিস্তানি ধারার মূল্যবোধে পথ চলছে, কখনো রাজনৈতিক প্রভাবে তার সমৃদ্ধি ঘটেছে। দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে, স্বাধীনতার বছর কয়েকের মধ্যেই ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদী রাজনীতির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে। ক্রমশ তার সমৃদ্ধি। এর প্রতিফলন রাজনীতি থেকে সমাজে, সেই সঙ্গে ব্যক্তিমানসে। এভাবে বাংলাদেশি সমাজের বিপরীত পথপরিক্রমা।

দুই.

এর পরিণাম ও প্রকাশ ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। একদিকে রাজনীতিকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামাস হামলা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর। অন্যদিকে সমাজে ব্যতিক্রমী ধারার অনাচারকে উপলক্ষ করে নানা ধারায় সাম্প্রদায়িক হামলা, উদ্ভট সব অজুহাতে। সমাজটা পূর্বাবস্থায় এবং ধর্মীয় প্রশ্নে স্পর্শকাতর অবস্থায় থাকার কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম উপলক্ষে যেকোনো প্রকার গল্পকাহিনী ফেঁদে জনমানসে উন্মাদনা সৃষ্টি করা যায়। পরিণামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা যাদের সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই

ঘটনা অনেক। দু-একটা উদাহরণ আমাদের বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণ করবে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত কারারুদ্ধ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সম্বন্ধে গুজব রটানো হলো, তার মুখ চাঁদের বুকে দেখা গেছে। ব্যস, আর কথা নেই। বাঙালি জনমানস ধর্মান্ধতার পরিচায়ক এক উদ্ভট বিশ্বাসের উন্মাদনায় রামু এলাকা ও সন্নিহিত অঞ্চলে বৌদ্ধ ও হিন্দুপল্লীতে সংঘবদ্ধ হামলা চালাতে দুবার ভাবেনি। বৌদ্ধমূর্তি ধ্বংস, প্রতিমা ভাঙচুর, তাদের বাড়িঘরে হামলা, গণনির্যাতন সবই চলেছে যুক্তিহীন নির্বিকারত্বে। বাধা দেওয়ার কেউ ছিল না। সমাজে এমন কোনো শুভশক্তির ঐক্যবদ্ধ প্রকাশ ছিল না, যা এই অমানবিক বর্বরতার প্রতিরোধ ঘটাতে পারে। এই সংঘবদ্ধ হামলা ছিল পূর্বপরিকল্পিত

ঘটনার প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রী মহলকে স্পর্শ করে। গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। তাতে দেখা যায়, একাত্তরের ঘুমন্ত রাজাকারদের অংশবিশেষ জাগ্রত হয়ে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। নানা কারণের টানে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা-উপনেতা, এমনকি জনপ্রতিনিধি ও তৃণমূল কর্মকর্তাও দুর্বৃত্ত দলের পেছনে সমর্থন জুগিয়েছে। জামায়াত-শিবির বিশেষ ভ‚মিকা নিয়েছে। এ ঘটনার অপরাধীদের কি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছিল? স্বভাবতই সমাজে অশুভ শক্তির নেপথ্য আধিপত্য, সুযোগ-সুবিধা ও অনুক‚ল পরিবেশে তাদের অন্ধকার গহব্বর থেকে বেরিয়ে আসা এবং দুর্বৃত্তপনার ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি হয় না।

তিন.

সমাজের এই দুর্বলতার সুযোগ দুর্বৃত্ত ও অশুভশক্তির ব্যক্তি বা সমষ্টি নিতেই পারে। ইতিপূর্বে নিতে দেখা গেছে। এসব ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য বলির পাঁঠা। এর আগেও দেখা গেছে এক যুবককে। এবারও তাই। নাম বিপ্লব চন্দ্র শুভ। তার ভাষ্য মতে, (থানায় জিডির বক্তব্য) অজ্ঞাত সূত্রে তার কাছে চাঁদা দাবি করা হয়, না পেয়ে তার ফেইসবুক হ্যাকিং করে সেখানে ইসলামবিষয়ক অবমাননাকর উক্তি পোস্ট করা হয়।

ব্যস, উদ্দেশ্য সিদ্ধ। যুক্তি বিচার, তথ্য যাচাই কিছুরই প্রয়োজন হয়নি। ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে ইসলামপন্থিদের বিক্ষোভ, মিছিল, সমাবেশ ও সংঘাত। হামলা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। অনেক তুলকালাম কাণ্ডে শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপ। তাতে আবার নতুন সমস্যা গোলাগুলির কারণে। গোটা পরিস্থিতি এক ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এখন আন্তর্জাতিক মহলের সম্পর্ক যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আরও একাধিক খাতে বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক নিবিড় সম্পর্ক। পোশাকশিল্প এবং পণ্যবাজার ও বিনিয়োগ এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ বাজার-অর্থনীতিতে বিশ^াসী হওয়াও একটি বড় নেপথ্য কারণ।

তাই দেশের কেন্দ্রীয় শাসক শ্রেণিকে অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে সামলে চলতে হয়, সতর্ক পদক্ষেপে চলতে হয়। ইতিমধ্যে সুশাসন ও মানবাধিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে প্রশ্ন উঠেছে। উঠেছে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিত বিচারে। বোধগম্য কারণে এবার ভোলার ঘটনার অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এ ক্ষেত্রে অবহেলার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাই সাংবাদিকদের বলেছেন, এ সম্পর্কে সরকার সচেতন।

তদন্ত দ্রæত চলছে। হামলাকারীদের মধ্যে চেনামুখও দেখা যাচ্ছে। ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কুশীলবদের পরিচয় শিগগির পাওয়া যাবে। ব্যবস্থা নিতে দেরি করবে না সরকার। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বোধোদয় সত্তেসও আমাদের প্রশ্ন, অনুরূপ মনোভাব কি দলের বিভাগীয় বা জেলা-উপজেলাপর্যায়ে নেতাদের মধ্যে রয়েছে? থাকলে তারা ঘটনার সঙ্গে প্রতিষেধক ব্যবস্থা নিতেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে একটা আপ্তবাক্য : প্রতিকারের চেষ্টার চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থাই উত্তম। সেটা সমাজ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও সত্য। তাতে অনেক সামাজিক সমস্যা এড়ানো সম্ভব হয়

চার.

ইতিমধ্যে থলের বিড়াল বেরিয়ে এসেছে। একটি দৈনিক পত্রিকায় সংবাদ শিরোনাম : ‘ফেসবুকের সেই হ্যাকার শনাক্ত’। অর্থাৎ বিপ্লব থানায় জিডি করতে গিয়ে সত্য কথাই বলেছে যে, তার ফেইসবুকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার নামে মিথ্যা বক্তব্য পোস্ট করা হয়েছে। এবার পুলিশ, প্রযুক্তিবিদ ও প্রশাসনের কর্তব্য দ্রæত সেই দুর্বৃত্ত হ্যাকারকে আইনের আওতায় আনা। দ্রত সত্য উদ্ঘাটন এবং নিরপরাধ বিপ্লবকে লাঞ্ছনা থেকে মুক্ত করা। এটা তো তাৎক্ষণিক কর্তব্য প্রশাসনের। কিন্তু সমাজ ও রাজনীতির কর্তব্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো আদর্শিক দিকগুলোতে বিশ্বাসী ও সক্রিয় হওয়া। তাদের মুখেই হরহামেশা শোনা যায়, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। তাই যদি সত্য হবে, তাহলে কোনো ঘটনার সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে, যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা না করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা কেন। সে ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন স্থানীয় নেতারা সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণে তাৎক্ষণিক তৎপরতা প্রদর্শন করেন না কেন, যাতে অবাঞ্ছিত অঘটন প্রতিরোধ করা যায়? সমাজে এই অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটি, সত্য বলতে কি এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি, হলে অনেক অবাঞ্ছিত ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। সমাজসেবী, রাজনৈতিক নেতা, সাংস্কৃতিক সংগঠন সবারই এদিক থেকে দায়বদ্ধতা রয়েছে। এদিকেই বিশেষ নজর ও প্রাধান্য দিতে হবে। না হলে শুধু মুখের কথায় চিড়ে ভিজবে না।

লেখক

ভাষাসংগ্রামী ও রবীন্দ্র গবেষক