এক ব্রেক্সিটে কত ঘটনা

ব্রেক্সিট প্রশ্নে টালমাটাল যুক্তরাজ্য। ২০১৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে ব্রেক্সিটের পক্ষে রায় দেয় দেশটির মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে ব্রেক্সিটের বিপক্ষে থাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করে থেরেসা মে’র কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আগাম নির্বাচনের মাধ্যমে পাকাপাকিভাবে প্রধানমন্ত্রী হয়েও ব্রেক্সিট সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন তিনি। তার পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী হন বরিস জনসন। মে’র পদাঙ্ক অনুসরণ করে বরিসের প্রস্তাবে আরও একটি নির্বাচনের মুখোমুখি ব্রিটেন। লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

চার বছরে তৃতীয় নির্বাচন

অনেক জল্পনা-কল্পনা শেষে অবশেষে চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অবশেষে প্রথমবারের মতো কোনো সিদ্ধান্তে সংসদের সমর্থন পেলেন বরিস জনসন। তার প্রস্তাবিত আগাম সাধারণ নির্বাচনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন সংসদ সদস্যরা। ব্রেক্সিট কার্যকরের মেয়াদ বাড়ানোর পর এবার এ বিষয়ে জনসমর্থনের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন তারা। ১৯২৩ সালের পর এই প্রথম ডিসেম্বরে ক্রিসমাস ডে-র আগে ভোট হতে যাচ্ছে ব্রিটেনে। বিগত চার বছরের মধ্যে ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে টালমাটাল ব্রিটেনে তৃতীয়বারের মতো ভোট দেবে দেশটির সাধারণ মানুষ।

ব্রেক্সিট ইস্যুতে (ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া) গত বেশ কয়েকমাস ধরেই টানাপড়েন চলছিল। বিষয়টি নিয়ে জল ঘোলাও কম হয়নি। ব্রিটেনের রানীকে পর্যন্ত ব্রেক্সিট ইস্যুতে কথা বলতে হয়েছে। বলা যায়, বর্তমানে ইস্যুটি নিয়ে দেশটির সর্বমহল তো বটেই পুরো বিশ্ব উৎসুক। সর্বশেষ ২৯ অক্টোবর আগাম নির্বাচনের পক্ষে ঐক্যমতে পৌঁছান ব্রিটিশ সংসদ সদস্যরা। হাউস অব কমন্সে ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ৪৩৮টি, বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন মাত্র ২০ জন।

৬৫০ সদস্যবিশিষ্ট কক্ষে বিলটি পাস হতে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন ছিল। বিলটি এখন উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডসে অনুমোদনের জন্য উঠবে। খুব শিগগিরই এটি আইনে পরিণত হতে পারে। আইন হয়ে গেলে নির্বাচনী প্রচারের জন্য মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় পাবে রাজনৈতিক দলগুলো।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, ব্রিটেনের জনগণের ব্রেক্সিট এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে মতামত দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তিনি আশা করছেন, এ নির্বাচন তাকে বেক্সিট চুক্তি এবং বর্তমান সংসদে অচলাবস্থা নিরসনে নতুন করে ক্ষমতা এনে দেবে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে জানানো হয়েছিল, বিদ্রোহের কারণে কনজারভেটিভ পার্টির (টোরি পার্টির উত্তরসূরি) বহিষ্কৃত ২১ সংসদ সদস্যের অর্ধেককে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারা কনজারভেটিভ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

অপরদিকে নির্বাচন বিষয়ে প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন বলেছেন, দেশ সংস্কার এবং জনগণের স্বার্থরক্ষা করার জন্য এই নির্বাচন বর্তমান প্রজন্মের কাছে একটি দারুণ সুযোগ। তিনি জানান, তার দল দেশের সত্যিকারের পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী আর জোরালো প্রচার শুরু করবে যা ব্রিটেনে আগে কখনো দেখা যায়নি। উদারপন্থি লিবারেল ডেমোক্রেট ও স্কটল্যান্ডের স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) দলও ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনের তারিখ মেনে নিয়েছে।

ব্রেক্সিট সীমা ৩১ জানুয়ারি

ব্রেক্সিট নিয়ে ব্রিটেনের রাজনৈতিক সংকট যে রকম চরম অবস্থার মধ্যে পৌঁছেছে, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন। গত ৩১ অক্টোবর ইইউ ছাড়ার কথা ছিল ব্রিটেনের। কিন্তু পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট বিল পাস করাতে ব্যর্থ হন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। এরপরই ব্রেক্সিটের নির্ধারিত সময় পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ইইউকে চিঠি দেন তিনি।

নির্বাচন ১২ ডিসেম্বর। আর এর ফল অনুযায়ী পরিবর্তন আসতে পারে অনেক নিয়ম কানুনেই। কিন্তু এই দিনটি নির্ধারণের জন্য ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। ৪ সেপ্টেম্বর রাতে হাউজ অব কমন্সে তিনি দুই দফা পরাজিত হন। আগাম নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে যে প্রস্তাব এনেছিলেন সেটি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সে সময় খারিজ হয়ে যায়। এর আগে সংসদ সদস্যরা

‘নো-ডিল ব্রেক্সিট’ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে চুক্তি ছাড়া বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আটকে দিয়ে একটি বিল পাস করেন পার্লামেন্ট। সেই বিলটি উত্থাপনে বিরোধী দলগুলো আর তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির বিদ্রোহী এমপিরা। এই বিলের মাধ্যমে ব্রেক্সিট প্রশ্নে সরকারের ভ‚মিকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। বিলের মাধ্যমে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন যদি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি সমঝোতা করে পার্লামেন্টে নিয়ে আসতে না পারেন, তাহলে তাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে ফিরে যেতে হবে এবং অনুরোধ জানাতে হবে যে, ব্রেক্সিটের সময়সীমা যেন ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরাবর যে কোনো উপায়ে নির্ধারিত ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই ব্রেক্সিট সম্পন্নের কথা বলে আসছিলেন। শেষ পর্যন্ত এ প্রতিশ্রæতি রক্ষায় ব্যর্থ হন তিনি। বিবিসির রাজনীতি বিষয়ক সহকারী সম্পাদক নরম্যান স্মিথ লিখেছেন, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে জনসনের ব্রেক্সিট সম্পন্নের প্রতিশ্রæতির মৃত্যু ঘটেছে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। সুতরাং অবধারিতভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এখন আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে এগোবে।

‘নো-ডিল ব্রেক্সিট’ আটকে দিয়ে পার্লামেন্টে যে বিল পাস করা হয়েছে সেটি এক অর্থে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আত্মসমর্পণ বলে জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। এই বিল পাস হওয়ার পর বরিস জনসন ১৫ অক্টোবর নির্বাচনের প্রস্তাব এনেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী চেয়েছিলেন নির্বাচনে জয়লাভের পরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাওয়া অর্থাৎ ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যাবে। ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই তাদের এই জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

বরিস জনসন বলেছিলেন, বের হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি ইইউর সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করতে চান। এমনকি সমঝোতা হোক বা না হোক ৩১ অক্টোবরের মধ্যেই ইইউর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছেদ করবে ব্রিটেন। কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট হয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে ব্রিটেনকে সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কাস্টমস ইউনিয়ন এবং একক বাজার থেকে বের হয়ে যেতে হবে। এই সমঝোতার আওতাতেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করে থাকে।

কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই ইইউ থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার (নো ডিল ব্রেক্সিট) প্রস্তাবের বিরুদ্ধে এমপিরা একাধিকবার ভোট দিয়েছেন। বিরোধী দলগুলোর এমপিরা সে সময় ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দলের কিছু এমপিকে সঙ্গে নিয়ে নো-ডিল ব্রেক্সিট ঠেকাতে নতুন আইন করার চেষ্টা করেছিলেন।

থেরেসা মে’র ব্যর্থতা

বরিস জনসনের আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-ও ব্রেক্সিট চুক্তি নিয়ে বেশ চেষ্টা করে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় তিনি ব্রেক্সিট বাস্তবায়ন করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু কী উপায়ে সেই ব্রেক্সিট হবে তার কোনো সঠিক পরিকল্পনা তিনি দিতে পারেননি যা পার্লামেন্টে অনুমোদন পাবে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি যে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিয়েছিলেন তাতে কনজারভেটিভ পার্টি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ডিইউপির সমর্থন নিয়ে তাদের সরকার গঠন করতে হয়। এরপর থেকেই মূলত থেরেসা মে’র জনপ্রিয়তা ক্রমাগত কমতে থাকে। ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করে তার মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য একের পর এক পদত্যাগ করতে থাকেন। অন্যদিকে ব্রেক্সিট কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে তার পরিকল্পনাটি ইইউ নেতাদের অনুমোদন পেলেও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে এটি পর পর তিন বার তুলেও তা পাস করাতে ব্যর্থ হন তিনি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র দ্বিতীয়বার পেশ করা প্রস্তাবের বিরোধিতা করে সংসদের নি¤œ কক্ষের স্পিকার জন বার্কো জানিয়েছিলেন, একই অধিবেশনে একই প্রস্তাব দ্বিতীয়বার পেশ করা নিয়মবিরোধী। ইইউ থেকে বিচ্ছেদের চুক্তির মধ্যে মৌলিক রদলবল করলে তবেই সেই চুক্তি অনুমোদনের জন্য পেশ করা সম্ভব। উল্লেখ্য, গত ১০০ বছরে ব্রিটিশ সংসদের কোনো স্পিকারকে এই নিয়ম প্রয়োগ করতে হয়নি। এদিকে ইইউ চুক্তিতে কোনো রদবদল করতেও প্রস্তুত নয়। ফলে শেষ মুহ‚র্তে কোনো রকম ছাড়েরও সম্ভাবনা নেই।

শেষ অবধি ব্রেক্সিট অর্থাৎ ব্রিটেনের ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ত্যাগের ব্যাপারে তার নতুন পরিকল্পনা মন্ত্রিসভায় ও পার্লামেন্টে অনুমোদিত না হওয়ায় গত ৭ জুন পদত্যাগ করেন থেরেসা মে। তার পদত্যাগের পরই ২৩ জুলাই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বরিস জনসন।

জন বার্কোর পদত্যাগ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যাওয়া বা ব্রেক্সিটের খসড়া চুক্তি অনুমোদনে হাউস অব কমন্সে আইনপ্রণেতাদের ‘হাঁ-না’ ভোটের আয়োজন করতে চেয়েছিল বরিস জনসন সরকার। সরাসরি সে প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন স্পিকার জন বারকো।

গত ১৯ অক্টোবর আইনপ্রণেতাদের সামনে খসড়া ব্রেক্সিট চুক্তিটির ওপর প্রস্তাব আনা হয়েছিল। সে সময় জন বারকো বলেন, একই ‘বিতর্কিত’ প্রস্তাব যদি আবার আনা হয় তবে এটি ‘পুনরাবৃত্তিমূলক’ এবং ‘অব্যবস্থাপনামূলক’ হবে।

এদিকে, সেপ্টেম্বর মাসেই ৩১ অক্টোবর ব্রেক্সিট কার্যকর কিংবা আগাম নির্বাচন যাই হোক না কেন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের হাউজ অব কমন্সের স্পিকার এবং সংসদ সদস্যের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন জন বারকো। তার দেওয়া প্রতিশ্রæতি অনুযায়ী তিনি পদত্যাগ করেন নির্দিষ্ট দিনেই। প্রচারবিমুখ জন বারকো বরাবরই সংসদে ব্রেক্সিট হস্তক্ষেপে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। এ জন্য অবশ্য তাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে বেশ কিছু সমালোচনারও। স্পিকার হিসেবে এক দশক দায়িত্ব পালনকালে তিনি অন্তত ১৪ হাজার বার সংসদ সদস্যদের কথার মাঝে হস্তক্ষেপ করেছেন। তর্ক নিয়ে সভাপতিত্ব ছাড়াও জন বারকো সংসদীয় সকল নিয়মেই বেশ কড়া ছিলেন যা প্রভাব ফেলেছে যখন হাউজ অফ কমন্সে কোনো ধরনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না সে সময়।

তার বিচারকক্ষে সব সময় পেছনের সারিতে বসা ব্যক্তিরাই সুবিধা পেতেন বেশি। এই কারণে লেবার পার্টির এমপিদের মাঝে তিনি বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। ২০১৫ সালে এই জনপ্রিয়তার দরুন টোরি সরকারের প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী বহিষ্কারের প্রয়াস থেকে বেঁচে যান তিনি।

জন বারকো বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। নিম্নকক্ষে তার বিচারাধীন প্রক্রিয়া অনেকেরই পছন্দ ছিল না এটা সত্যি। এত কিছুর পর ২০১৭ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তিনি আবার আলোচনার কেন্দ্রে আসেন। তিনি সরাসরি বলেন, তিনি চান না সংসদে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বক্তব্য পেশ করুন। এছাড়াও বারকো ট্রাম্পকে সে সময় ‘বর্ণবাদী’ বলেও আখ্যায়িত করেন। বলাবাহুল্য তার এই মন্তব্য অনেক রক্ষণশীল কনজারভেটিভই খুব একটা ভালো চোখে দেখেনি। শুধু তাই নয়, ২০১৭ সালে ছাত্রদের যখন বার্কো জানান যে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থাকার জন্য ভোট দিয়েছিলেন সেই বিষয়টি নিয়েও পরে ব্রেক্সিটের পক্ষপাতিত্ব করার কারণ হিসেবে তাকে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি তার গাড়িতে ‘ব্রেক্সিট-বিরোধী’ স্টিকার লাগিয়ে এই ধারণাকে বাতিল করে দেন। যদিও গাড়িটি ছিল তার স্ত্রী স্যালির এবং তিনি ছিলেন নিজ মতবাদে বিশ্বাসী।

একনজরে ব্রেক্সিট

২০১২ সালে ব্রিটিশ ইনফ্লুয়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা পিটার ওয়েলডিং ‘ব্রিটেন’ আর ‘এক্সিট’ মিলে প্রথম ‘ব্রেক্সিট’ শব্দটি ব্যবহার করে একটি টুইট করেন। তারপর থেকে শুধু ব্রিটেন আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মাঝেই শুধু নয়, পৃথিবীব্যাপী বহুল আলোচিত বিষয় ব্রেক্সিট। যতই সময় যাচ্ছে ব্রেক্সিট যেন ততই দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। ব্রেক্সিট এখন প্রতিনিয়ত জন্ম দিচ্ছে অসংখ্য প্রশ্নের যার কোনো পরিপূর্ণ সমাধান মেলেনি এখনো। ভৌগোলিকভাবে ব্রিটেন হলো একটা দ্বীপপুঞ্জ। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলস নিয়েই বর্তমান যুক্তরাজ্য। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের নেতৃত্বে ১৯৭৩ সালে ব্রিটেন ইইউতে যোগ দেয়। তখন এটির নাম ছিল ইইসি (ইউরোপিয়ান ইকোনমিক কম্যুনিটি)। পৃথিবীতে ভৌগোলিকভাবে একই এলাকায় অবস্থিত দেশগুলো নিজেদের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক জোটবদ্ধ হয়ে সুবিধা পেয়ে আসছে। সফল আঞ্চলিক-অর্থনৈতিক জোটের তালিকায় প্রথমেই আসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নাম। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ২৮টি দেশ রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে জোটবদ্ধ হয়ে আছে। এ জোটের সদস্য দেশগুলোর উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা, শিক্ষা সুবিধা, সবচেয়ে বড় একীভ‚ত বাজার ব্যবস্থা ও ইইউ নাগরিকত্বের প্রচলন করে জোটটি অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। এ ছাড়া মানবাধিকার রক্ষায়ও ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট, ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস, প্রযুক্তি সহায়ক ও পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ গড়তেও ইইউ গ্রহণযোগ্য ভ‚মিকা রেখে চলেছে।

বৃহত্তর মানবকল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা চেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ ইইউ ২০১২ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পায়। ৪০ বছরের বেশি সময় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে থাকার পর ব্রিটেন সিদ্ধান্ত নেয় তারা আর এ জোটে থাকবে না।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদর্শের সঙ্গে ব্রিটিশদের মনস্তাত্তিক দ্বন্দ্ব ছিল আগে থেকেই। ব্রিটিশরা কখনই ইইউ-এর মতামতে চলাটা মেনে নিতে পারেনি। ফলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২০১৫ সালে তার দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী ইশতেহারে ব্রেক্সিট প্রশ্নে গণভোট ডাকার প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। এবং প্রতিশ্রতি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ জুন ব্রেক্সিট প্রস্তাবে গণভোটের আয়োজন করেন। সেখানে ব্রিটিশ নাগরিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যুক্তরাজ্যের কি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে থাকা উচিত, নাকি উচিত না? ওই গণভোটে ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার পক্ষে, আর থাকার পক্ষে ছিল বাকি ৪৮ শতাংশ। ডেভিড ক্যামেরন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ছিলেন, নিজের অবস্থানের পক্ষে গণভোটের রায় না আসায় পদত্যাগ করেন ক্যামেরন এবং প্রধানমন্ত্রী পদে ক্যামেরনের স্থলাভিষিক্ত হন থেরেসা মে। থেরেসা মে’র চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন ব্রেক্সিট দায়িত্বে আছেন বরিস জনসন। আগামী ১২ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরই বলা যাবে বরিস কতটা সফল করতে পারবেন ব্রেক্সিট।