খসড়া শিগগির চূড়ান্ত হচ্ছে

বিচার কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আইন আসছে

বিচারকাজে গতি আনা, মামলাজট কমাতে বিচারিক আদালতে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দুর্ধর্ষ জঙ্গি ও সন্ত্রাসীসহ স্পর্শকাতর মামলার আসামিদের আদালতে আনা-নেওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে প্রস্তুত হচ্ছে সাক্ষ্য ও বিচার কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আইন। মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে এই আইনের আওতায় ডিজিটাল মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মামলার আসামি, সাক্ষী ও আইনজীবীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। শুনানি হবে অডিও-ভিডিও তথা ডিজিটাল মাধ্যমে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘সাক্ষ্য ও বিচার কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আইন-২০১৯ এর খসড়া শিগগির চ‚ড়ান্ত করছে আইন কমিশন। চলতি বছরের মধ্যেই এটি  চূড়ান্ত  হবে বলে মনে করছেন কমিশনের কর্মকর্তারা। খসড়া চ‚ড়ান্ত হলে এটি পাঠানো হবে আইন মন্ত্রণালয়ে। আইন মন্ত্রণালয় তা যাচাই-বাছাই শেষে মন্ত্রিসভায় তুলবে। সেখানে অনুমোদন পেলে জাতীয় সংসদে নতুন আইনটি পাসের জন্য ভোটাভুটিতে দেওয়া হবে। আর পাস হলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে এটি পরিণত হবে আইনে।

নতুন এই আইনে ডিজিটাল মাধ্যম বা ইলেকট্রনিক রেকর্ড হিসেবে কোনো তথ্য-উপাত্ত, বার্তা, কোনো ঘটনার ধারণকৃত ভিডিওচিত্র এবং টেলিফোন বা মুঠোফোনের কোনো অ্যাপসের মাধ্যমে বা অন্য কোনো মাধ্যমে কথোপকথনের অডিও রেকর্ড যে কোনো দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার কার্যক্রমে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।

আইনজীবীরা বলছেন, বিচারিক আদালতে যেকোনো মামলায় সাক্ষীর গড় হাজিরা মামলা নিষ্পত্তিতে বড় অন্তরায়। প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হলে আদালতের দূরবর্তী প্রান্ত বা দেশের বাইরে বসেও সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে পারবেন। এছাড়া কোনো মামলায় সরকারি সাক্ষী (চিকিৎসক ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা) বিশেষ কারণে আদালতে আসতে না পারলে হাসপাতাল, থানা কিংবা কর্মস্থলে বসেই ডিজিটাল মাধ্যমে সাক্ষ্য দিতে পারবেন। পাশাপাশি স্পর্শকাতর মামলার আসামিরা কারাগারে বসেই প্রযুক্তির মাধ্যমে শুনানিতে অংশ নিতে পারবেন। তাদের আদালতে আনার ঝুঁকি থাকবে না। এতে করে মামলা দ্রæত নিষ্পত্তি হবে। এক্ষেত্রে উভয় প্রান্তে মামলাসংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি ‘দৃশ্যমান উপস্থিতি’ হিসেবে গণ্য হবে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ১৮৭২ সালের বিদ্যমান সাক্ষ্য আইনে ডিজিটাল সাক্ষ্যের বিষয়ে কিছু বলা নেই। ডিজিটাল এই যুগে অপরাধের ধরনও পাল্টাচ্ছে। ডিজিটাল সাক্ষ্যের বিষয়টি সাক্ষ্য আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে কিংবা এ সংক্রান্ত আইন করতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন আইন বিশেষজ্ঞরা। নতুন আইন হলে বিচারিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি হবে সাক্ষ্য আইনের সম্পূরক একটি আইন। খসড়াটি চলতি বছরের মধ্যেই চ‚ড়ান্ত হবে বলে আশা করছি। আমরা বিভিন্নজনের মতামত চেয়েছিলাম, তা পেয়েছি। খসড়া চ‚ড়ান্ত হলে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাক্ষী না আসায় বছরের পর বছর মামলা অনিষ্পন্ন থেকে যায়। এছাড়া স্পর্শকাতর আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করাও একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আইনটি কার্যকর শুরু হলে বিচারিক ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের উদ্যোগে সুফল পাওয়া গেছে। আমাদের দেশেও এর সুফল ভোগ করা যাবে।’

প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, মোকদ্দমা সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সাক্ষী, অভিযুক্ত ব্যক্তি, আইনজীবী, বিশেষজ্ঞ অথবা কর্র্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অডিও-ভিডিও কনফারেন্সে তার দৃশ্যমান উপস্থিতির মাধ্যমে সাক্ষ্য বা বক্তব্য গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করতে পারবেন আদালত। তবে এই আবেদন মামলার কোনো পক্ষ অথবা সাক্ষী তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের ১৫ দিনের বা যুক্তিগ্রাহ্য সংক্ষিপ্ত সময় পূর্বে করতে হবে। এর বাইরে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের শনাক্তকরণের সুবিধার্থে ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র, টেলিফোন নম্বর ও ই-মেইল আইডি সংক্রান্ত সব তথ্য উল্লেখ করতে হবে। খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, দূরবর্তী প্রান্ত সংশ্লিষ্ট আদালতের অংশ হিসেবে গণ্য হবে এবং দূরবর্তী প্রান্তে সংঘটিত আদালতের মর্যাদাহানিকর যে কোনো কাজ, শপথভঙ্গ, আদালত অবমাননা কিংবা আইনের কোনো ব্যত্যয় সংশ্লিষ্ট আদালত কক্ষে সংঘটিত হয়েছে মর্মে গণ্য হবে। এছাড়া কোনো মামলায় ডিজিটাল মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় দলিলাদি প্রমাণের ক্ষেত্রে দূরবর্তী প্রান্তে উপস্থিত অভিযুক্ত ব্যক্তি অথবা সাক্ষীকে তা প্রদর্শন করতে হবে এবং প্রদর্শিত যে কোনো দলিল আদালত কর্র্তৃক প্রত্যায়িত দলিল বলে গণ্য হবে।

আইন কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, যে মামলায় এ পদ্ধতি কার্যকর হবে সেই মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দৃশ্যমান উপস্থিতিতে শুনানির সময় তার নিয়োজিত আইনজীবীর সঙ্গে গোপন পরামর্শ ও সহায়তা নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে এবং এ পরামর্শ বিশেষাধিকার হিসেবে গণ্য হবে যা তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মামলায় বিশেষজ্ঞ সাক্ষীর প্রয়োজন হলে কোনো বিশেষজ্ঞ অডিও-ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আদালত প্রান্ত অথবা দূরবর্তী প্রান্ত থেকে সংশ্লিষ্ট বিচার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। পাশাপাশি অডিও-ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাক্ষ্যগ্রহণের আগে দূরবর্তী প্রান্তে উপস্থিত অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সাক্ষীকে ওই জায়গা থেকে অডিও-ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে আদালত প্রান্তে সংশ্লিষ্ট বিচারক শপথবাক্য পাঠ করাবেন।

প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূলত সাক্ষীর অভাবে মামলা নিষ্পত্তিতে সময় লাগে। মামলাজট বাড়ে। এখন এটি কার্যকর হলে মামলার বিচার নিষ্পত্তিতে খুবই ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে। যেসব সাক্ষী নানা কারণে আদালতে আসতে পারেন না, ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের উপস্থিতি ও সাক্ষ্য নিশ্চিত করা যাবে। এভাবে বিচারকাজে গতিশীলতা আসবে।’

অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিম্ন আদালতে সাক্ষী না আসার কারণে বিচারকাজ দিনের পর দিন মুলতবি করা হয়। এতে করে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি মামলাজট বাড়ে। বিচার বিলম্বিত হয় এবং সঠিক বিচার হয় না। এটি আইনে পরিণত হলে সময় নষ্ট হবে না। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। নিশ্চয়ই এর সুফল পাওয়া যাবে। আমরা আশা করি, এটি যেন দ্রত আইনে পরিণত হয়।’