সুদমুক্ত টাকার গাড়ি রেখে সরকারি গাড়িতে চলাচল

আগে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন যুগ্ম সচিব বা তার ওপরের কর্মকর্তারা। এক গ্রেড নিচে নামিয়ে উপসচিবদেরও প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে। এই শ্রেণির কর্মকর্তারা ব্যবহারের জন্য সরকারের কাছ থেকে গাড়ি পান। সরকার এসব কর্মকর্তার পরিবহন পুলের মাধ্যমে গাড়ি দিলে অনেক বেশি খরচ হয়। এ কারণ দেখিয়ে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিজস্ব গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হয়। এসব গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ বা পরিচালনার জন্য প্রতি মাসে দেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা করে। রক্ষণাবেক্ষণের টাকা কোনো ঋণ বা অনুদান নয়। এটা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজস্ব গাড়ি চালানোর যে খরচ সেই বাবদ সরকারের তরফ থেকে মাসে মাসে দেওয়া টাকা। সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করার শর্তে কর্মকর্তারা সুদবিহীন ঋণ নিয়ে নিজস্ব গাড়ি কেনেন এবং মাসে মাসে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ গ্রহণ করেন। কিন্তু এই শর্ত ভঙ্গ করে সরকারি কর্মকর্তারা দেদার সরকারি সংস্থা বা বিভিন্ন প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন।

এ অবস্থায় গত রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে যারা সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ গ্রহণ করার পরও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের নির্দেশ দিয়েছে। গতকাল বুধবার এ নির্দেশনা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে। ওই নির্দেশনায় সরকারি যানবাহন ব্যবহার নীতিমালার ব্যত্যয়কারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তাদের অধীনস্থ দপ্তর, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও সংস্থাকে পুনরায় নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। জনপ্রশাসনের নির্দেশনায় সুদমুক্ত টাকায় কেনা গাড়ির ‘মালিকদের’ সরকারি গাড়ি ব্যবহারকে অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে এটা কর্মকর্তাদের অসদাচরণ এবং দুর্নীতির আওতাভুক্ত অপরাধ।

নিয়ম অনুযায়ী প্রেষণ, মাঠ প্রশাসন বা প্রকল্পে কর্মরত কোনো কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা থাকলে সুদমুক্ত ঋণের টাকায় কেনা গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের অর্ধেক অর্থাৎ ২৫ হাজার টাকা পাবেন। কিন্তু কর্মকর্তারা এ নিয়মও মানেন না। তারা প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করেও রক্ষণাবেক্ষণের শতভাগ টাকা তুলে নিচ্ছেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সুদমুক্ত ঋণ গ্রহণকারী কোনো কোনো কর্মকর্তা প্রেষণ, মাঠ প্রশাসন বা প্রকল্পে কর্মরত থাকা অবস্থায় সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ব্যবহারের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাবদ ২৫ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫০ হাজার টাকা উত্তোলন করছেন। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সুদমুক্ত অগ্রিম ও শতভাগ রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় গ্রহণ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করতে হবে। সরকারের দপ্তর বা সংস্থার গাড়ি ব্যবহার করা যাবে না বলে আদেশে পুনরায় সতর্ক করা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কর্মকর্তাকে সুদমুক্ত সুবিধায় গাড়ি কেনার বিশেষ ঋণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে প্রথম সুদমুক্ত গাড়ি কেনার ঋণ দেওয়া হয় ১৬ লাখ টাকা। পরে ধাপে ধাপে সেই টাকা ২০ লাখ, ২৫ লাখ হয়ে বর্তমানে ৩০ লাখে পৌঁছেছে। মাসে মাসে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ শুরুতে ছিল ৩৫ হাজার টাকা। পরে সেটা বাড়িয়ে ৪৫ হাজার করা হয়। বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু যে সাশ্রয়ের কথা বলে কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত ঋণ ও শতভাগ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ দেওয়া হচ্ছে সেই সাশ্রয় হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। বেশিরভাগ কর্মকর্তা আগের মতো মন্ত্রণালয়, দপ্তর, সংস্থার বা প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ দামি গাড়িও হাঁকাচ্ছেন।

শুধু প্রশাসন ও ইকোনমিক ক্যাডার কর্মকর্তারা সুদবিহীন সুবিধা পাচ্ছেন। এ কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্য, পুলিশসহ বাকি ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা নাখোশ। তারা বিভিন্ন সময় সরকারের সিনিয়র মন্ত্রীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সুদবিহীন গাড়ি না পাওয়ার হতাশার কথা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মন্ত্রী জানিয়েছেন, অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তা সুযোগ পেলেই প্রশাসন ও ইকোনমিক ক্যাডার কর্মকর্তাদের সুদবিহীন গাড়ি ঋণ পাওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মাসে মাসে ৫০ হাজার টাকা পাওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করে। এসব মন্ত্রীর কথা, সুবিধা দিলে সমমানের সব কর্মকর্তার একই সুবিধা দেওয়া উচিত। যতদিন এ বৈষম্যের অবসান না হবে ততদিন প্রশাসন ও ইকোনমিক ক্যাডার ছাড়া অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ সেবা পাওয়ার আশা করা যায় না।

একাধিক ক্যাডারের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অন্যায়ভাবে গাড়ি ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে বলেছে সেই মন্ত্রণালয়ও এ অনিয়মের বাইরে নয়। এ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব সুদবিহীন ঋণ সুবিধায় সরকারি গাড়ি নেওয়ার পরও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন। তার ব্যবহারিত সরকারি গাড়িতে বরাদ্দের বেশি জ্বালানি ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে। এ মন্ত্রণালয়ের আরও অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অতিরিক্ত জ¦ালানি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছিউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধেও সুদবিহীন ঋণ নিয়ে গাড়ি কেনার পরও প্রকল্পের গাড়ি ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি ঋণ সুবিধা নিয়ে গাড়ি কিনেছি ঠিকই। প্রকল্পের গাড়িও ব্যবহার করি। কিন্তু শতভাগ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ নিই না। যতটুকু আমার প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই নেই।

সুদবিহীন ঋণ সুবিধায় কেনা ব্যক্তিগত গাড়ি বেশিরভাগ কর্মকর্তা অফিসে যাতায়াতের কাজে ব্যবহার করছেন না। তাদের গাড়িটি ব্যবহার হচ্ছে পারিবারিক সদস্যদের কাজে। অনেক কর্মকর্তা তাদের গাড়ি যত্ন করে গ্যারেজে ঢেকে রেখে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। অনেক কর্মকর্তা সরকারি চালক দিয়ে মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত গাড়িটি স্টার্ট দিয়ে সচল রাখেন মাত্র।

জনপ্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, এভাবে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন তারা দুর্নীতি করছেন। কারণ সুদমুক্ত ঋণ সুবিধায় গাড়ি কেনার পর শতভাগ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ গ্রহণ করে এভাবে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করার কোনো নৈতিক অধিকার থাকে না।