মান্দিদের সাংসারেক ধর্মাচারের সন্ধানে

‘সাংসারেক মান্দিরাংনি ওয়ান্না’ বলতে বোঝায় সাংসারেক মান্দিদের ওয়ান্না। বাংলাদেশের বৃহত্তর জনপরিসরে তিনটি শব্দই অপরিচিত বা প্রায় অপরিচিত। ‘মান্দি’ নৃগোষ্ঠী আমাদের অপরিচিত না হলেও সাধারণ বাঙালিদের কাছে তারা ‘গারো’ নামেই পরিচিত। সাংসারেক মান্দিরাংনি ওয়ান্না বইটিতে মূল আলোচনায় ঢোকার আগেই ‘আমাদের কথা’য় ‘গারো’ আর ‘মান্দি’ নিয়ে আলাপ তুলে বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন এই বইয়ের গ্রন্থকারদ্বয় ‘‘বাংলাদেশ ও ভারতে বসবাসরত মান্দি জাতির লোকজন ‘গারো’ নামেই সর্বত্র পরিচিত হলেও নিজেদের আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে তারা ‘মান্দি’ শব্দটাই ব্যবহার করেন। মান্দি শব্দের অর্থ মানুষ।’’ পরের অংশে ‘সাংসারেক’ শব্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বলা হয়েছে, ‘মান্দিদের নিজস্ব ধর্মের নাম সাংসারেক। সাংসারেক মান্দিদের ওয়ান্না জুম চাষ বা হা’বাহুআ কেন্দ্রিক এক ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কৃত্য ও কৃত্যকেন্দ্রিক উৎসবের নাম। ওয়ান্না উৎসবটি ওয়ানগালা নামেও অধিক পরিচিত।’

খুব সহজে ‘ওয়ান্না’র সঙ্গে পরিচয়ের জন্য বলা যায়, ওয়ান্না মান্দি বা গারো নৃগোষ্ঠীর একটি ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব। তবে সে ধর্মটি অর্থাৎ ‘সাংসারেক’ ধর্মটি নামের মতোই ইহলৌকিক সংসারের শুভাশুভের রক্ষণ করতে তৎপর। যে-কারণে এ ধর্মের আচারাদিতে পারলৌকিক মঙ্গলের চেয়ে ইহলৌকিক মঙ্গলের প্রার্থনা লক্ষণীয়। ওয়ান্না উৎসবটি মূলত ফসল ঘরে তোলাকে কেন্দ্র করে পালিত আচার। যার উদ্দেশ্য ফসলের দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং নৈবেদ্য দান। ওয়ান্না পালনের কারণ নিয়েও রয়েছে একাধিক মিথ। এমনই এক মিথে উঠে এসেছে ধানের চাষ শুরু করার আগে মান্দিদের ফলমূল খেয়ে জীবনধারণ করার পর্বের এক ঘটনা।

মান্দিদের মিদ্দি (দেবতা) মিসি আর সালজং যান এক বৃদ্ধার বাড়ি এবং বৃদ্ধার কাছে নেশার উদ্রেককারী কিছু প্রার্থনা করেন। প্রথমে অপারগতা জানালেও দেবতারা তাকে মনে করিয়ে দেন যে, তার দকমান্দার (মান্দি নারীদের নিজস্ব পোশাক) আঁচলে যে সাস্যাৎ বা ধূপ গুঁজে রাখা আছে সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট। অতঃপর বৃদ্ধা দেবতাদের সামনে ধূপ জ্বেলে দেন এবং তাতেই তাঁদের নেশার উদ্রেক হয়। প্রস্থানের পূর্বে দেবতারা বৃদ্ধাকে শস্যবীজ উপহার দেন এবং প্রতি বছর কার্তিক মাসে ওয়ান্না পালনের নির্দেশ দেন। মিথ অনুসারে এভাবেই মান্দিরা ধানচাষ বা কৃষিকাজে যুক্ত হন। ফলে শস্য উৎপাদনের পর দেবতাদের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য ওয়ান্না পালন করা হয়। এছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন কারণে ওয়ান্না পালনের প্রচলন রয়েছে যেমন : বিশেষ কোনো কারণে (বিপদ থেকে রক্ষার নিমিত্তে), জুমের ফলন ভালো না হলে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে পড়লে। ওয়ান্না যেমন মান্দিদের কৃষিকাজ ও ফসলকাটার উৎসবের সঙ্গে যুক্ত তেমনি এই লৌকিক ধর্মাচার মান্দি নৃগোষ্ঠীর সমাজিক বন্ধন বাড়ানো ও শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

একটা বিষয় উল্লেখ্য, প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে মান্দিদের ধর্ম-জীবন এবং আচারের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। তাই ফসল উৎপাদন থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলার প্রক্রিয়ায় প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষার বিষয়ে রয়েছে সতর্কতা। এই বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করে বইটির শুরুতেই বলা হয়েছে, ‘প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে মান্দি দাকবেওয়ালের সম্পর্ক তাই অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ। এই সম্পর্কে প্রাণবৈচিত্র্যের কোনো অযথা বিনাশ বা ধ্বংস নেই; আছে সংরক্ষণের প্রথাগত নানান কিসিমের চর্চা। আর তাই, সাংসারেক মান্দিদের ওয়ান্নার পাঠ একদিকে যেমন তাদের ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে বুঝতে সহায়তা করে, তেমনি পরিবেশের প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে তাদের নিবিড় যোগসূত্রকেও আমাদের সামনে হাজির করে।’ (পৃ. ১৭)

সাংসারেক ধর্মের কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। তাই অনুসারীর আচার এবং মস্তিষ্কেই এর নিবাস। এখন অনুসারীদের সংখ্যাও নগণ্য। ধর্মান্তরিত হয়ে অধিকাংশ মান্দিই এখন খ্রিস্টধর্মের অনুসারী। খ্রিস্টান ধর্মানুসারী গোষ্ঠীর জীবন ও মনে এ ধর্মের প্রগাঢ় বা প্রত্যক্ষ অস্তিত্ব নেই কিংবা ক্ষয়িষ্ণুপ্রায়। অর্থাৎ যে ক্ষুদ্র সংখ্যক মানুষ এই ধর্মটিকে লালন করছেন বা একসময় লালন করেছেন তারা হারিয়ে গেলে ধর্মটির ইতিবৃত্তও মুছে যাবে পৃথিবী থেকে। যার মানে দাঁড়ায়, একটা মানবগোষ্ঠীর যাপনের দীর্ঘ ইতিহাস হারিয়ে যাওয়া। সেই প্রায় হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে খানিকমাত্রায় হলেও পুনরুদ্ধার করতে সাংসারেক ধর্মের নথিপত্র সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেছিলেন পরাগ রিছিল ও জুয়েল বিন জহির। পরাগ রিছিল মান্দি নৃগোষ্ঠীর একজন হিসেবে নিজের ধর্ম-সমাজ-আচার এবং নানা সামাজিক পরিবর্তন কাছে থেকে নিবিড়ভাবে দেখেছেন। তিনি দালিলিকভাবে খ্রিস্টধর্মের অনুসারী হলেও নিজেকে অন্বেষণ করেন সাংসারেক ধর্মের জীবন ও ছায়ায়। কবি হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। নিজের জীবন এবং সাহিত্যচর্চা দুটোকেই তিনি অভিন্নধারায় প্রবাহিত রেখেছেন। জীবনাচারে যেমন নিজের শেকড় খুঁজতে খুঁজতে সাংসারেক ধর্ম এবং জীবনবোধকে আশ্রয় করেন, সাহিত্যচর্চায়ও ঘটে তার প্রতিফলন।

সাংসারেক মান্দিরাংনি ওয়ান্নার যুগ্ম সংগ্রাহক ও সংকলক জুয়েল বিন জহির। মান্দি সমাজের সদস্য না হলেও মান্দি নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিবিড় সংশ্রব তার। ‘মৃত্তিকা’ নামে লোকায়ত জ্ঞানচর্চা বিষয়ক একটি পত্রিকা সম্পাদনা করছেন দীর্ঘদিন ধরে। এছাড়া জাতিতাত্ত্বিক লোকায়ত জ্ঞান ও সংস্কৃতিচর্চার উদ্দেশ্যে মধুপুরের জয়নাগাছায় ‘মৃত্তিকা গ্রন্থকেন্দ্র’ স্থাপনের প্রধান উদ্যোক্তা তিনি। 

এই বইয়ের তথ্যসংগ্রহের ক্ষেত্র মধুপুরের চুনিয়া গ্রাম। চুনিয়া গ্রামের অধিবাসী সাংসারেক ধর্মাবলম্বী শতবর্ষী জনিক নকরেক এই ধর্মকে বহন করেন আজও। সেইসঙ্গে এ গ্রামের প্রবীণ সদস্যদের খ্রিস্টীয় জীবনের আস্তিনের তলায়ও রয়ে গেছে আদিধর্মের শেকড়-বাকড়। পরাগ রিছিল এবং জুয়েল বিন জহির সাংসারেক ধর্মকে নথিবদ্ধ করতে তাই এই স্থানটিকেই কেন্দ্র করেছেন।

একটি ধর্ম থেকে আরেকটি ধর্ম, একটি জীবনবিশ্বাস থেকে আরেকটি জীবনবিশ্বাসে প্রতিস্থাপিত হওয়ার পর্বান্তরকালে ওয়ান্না পালনে ছিল দীর্ঘ বিরতি। প্রায় চল্লিশ বছর বিরতির পর ২০০৩ সালে জনিক নকরেকের উদ্যোগে চুনিয়া গ্রামে আবার ওয়ান্না পালিত হয়। এই পুনঃযাত্রার শুরু থেকেই পরাগ রিছিল এবং জুয়েল বিন জহির ছিলেন পুরো আয়োজনের ঘনিষ্ঠ সহচর। জনিক নকরেকসহ সাংসারেক ধর্মের আদি অনুসারীদের ঘনিষ্ঠ সংশ্রবে থেকে বিলুপ্তপ্রায় ধর্মটির সার-নির্যাস ধরে রাখতে উদ্যোগী হয়েছেন। নিবিষ্টভাবে ওয়ান্নায় পালিত আচারসমূহ পর্যবেক্ষণ করেছেন বছরের পর বছর। আমুয়ায় (পূজা) পাঠ করা মন্ত্রসমূহ সংগ্রহ করেছেন। তাদের এই দীর্ঘ পথযাত্রারই পরিণতি সাংসারেক মান্দিরাংনি ওয়ান্না বইটি।

ওয়ান্না প্রচলনের সূত্রপাত, পালিত আচারাদির সবিস্তার বর্ণনা, প্রতিটি ধাপে পাঠ করা মন্ত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ সংকলন রয়েছে বইটিতে। আছে প্রতি বছরে পালিত ওয়ান্নাসহ আরও নানা প্রাসঙ্গিক স্থিরচিত্র। যা আরও সুস্পষ্টভাবে আচারগুলোকে বুঝতে সহায়তা করবে পাঠকদের। বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্নভাবে মান্দি জাতির আদিধর্ম, ধর্মীয় আচার,শ্বাসের  বর্ণনা গ্রন্থবদ্ধ হলেও পূর্ণাঙ্গভাবে এবং দীর্ঘ নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে বিষয়গুলো তুলে আনার প্রচেষ্টা এই প্রথম। বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা ধর্মগ্রন্থহীন এক ধর্মের নাড়ি সম্পর্কে আদ্যন্ত না হলেও একটা প্রাথমিক ধারণা পেতে সাংসারেক মান্দিরাংনি ওয়ান্না সহায়ক হয়ে উঠবে আশা করা যায়।

বই : সাংসারেক মান্দিরাংনি ওয়ান্না

সংগ্রাহক ও সংকলক : পরাগ রিছিল, জুয়েল বিন জহির

প্রকাশকাল : আগস্ট, ২০১৯। প্রকাশক : থকবিরম

মূল্য : ৪৫০ টাকা

গ্রন্থ সমালোচক: শিশুসাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী