রোহিতের নাগপুরে বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ

রাসেল ডমিঙ্গো, ড্যানিয়েল ভেট্টোরি, শার্ল ল্যাঙ্গাভেল্ট, রায়ান কুক চেক আউট করে বেরিয়ে এলেন হোটেল থেকে। মুশফিকুর রহিম এবং আরও কজন ক্রিকেটার কোচদের পথ ধরে চড়ে বসেন অপেক্ষমাণ টিম বাসে। রাজকোট বিমানবন্দরে যেতে হবে এবার। এর মধ্যে হঠাৎ খবর আসে, তাদের নিয়ে উড়তে যাওয়া বিশেষ বিমানটি তখনো মুম্বাই ছাড়তে পারেনি। অগত্যা সবাইকে বাস থেকে নেমে হোটেলে ঢুকে অপেক্ষমাণ যাত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়।

গতকাল সকালে এ ঘটনার আরও ঘণ্টা তিনেক পর বোর্ডিং করে বাংলাদেশ জাতীয় দল। ছোট্ট রাজকোটের পরিচ্ছন্ন-সুন্দরের অভিজ্ঞতা ঠেলে উড়াল দিয়ে চলে আসা এই শহরে। ক্রিকেট দলকে অনুসরণ করে বাংলাদেশি সাংবাদিকদেরও একই হাল। তাদের জন্য অবশ্য নাগপুরের সরাসরি বিমানের ব্যবস্থা করার কেউ নেই। তাই এই প্রতিবেদককেও রাজকোট থেকে আবার দিল্লিতে ফিরতে হয়। সেখান থেকে আরেক বিমানে নাগপুর।

দিল্লিতে প্রথম টি-টোয়েন্টি জিতে বাংলাদেশ গিয়েছিল গুজরাট রাজ্যে। কিন্তু সেখান থেকে হেরে তিন ম্যাচের সিরিজে সমতা আনার স্বস্তি দিয়ে এখন নাগপুরে। ১০ তরিখের ম্যাচ সিরিজের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে অপেক্ষায়। বিরাট কোহলির দিল্লিতে জয় দিয়ে সবাইকে ঝাঁকুনি দিয়েছিল মাহমুদউল্লাহর দল। তাতে আত্মাভিমানে প্রবল চোট খাওয়া স্ট্যান্ড ইন ক্যাপ্টেন রোহিত শর্মা কতটা ভয়ংকর প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছেন তা বাংলাদেশ টের পেয়েছে সৌরাষ্ট্র ক্রিকেট স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় ম্যাচে। ৪৩ বলে ৮৫ রানের ওই ইনিংসে একাই রোহিত খুন করেছেন প্রতিপক্ষকে। ১-১-এর সমতা এনে এবার ফিরেছেন নিজের ঘরে। অবশ্যই ‘হোম টাউন’ নাগপুরকে ‘লোকাল ফেভারিট বয়’ রোহিত সিরিজ উপহার দিয়ে শেষ হাসিটা হাসতে চান। মহারাষ্ট্রে ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’ প্রবাদ প্রমাণের অপেক্ষায় ভারত।

দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টির আগের পরিস্থিতির সঙ্গে এখন সবকিছুর অমিল খুব। তখন বাংলাদেশ খুব নির্ভার ছিল ১-০-এর লিডে। এখন সমতা এনে ভারত আছে তেতে। সিরিজ জয়ের স্বপ্ন ছিল যে ম্যাচ জিতে সেটি হেরেও অবশ্য মাহমুদউল্লাহ বলেছেন, ‘আত্মবিশ্বাস এখনো আছে।’ কিন্তু দোষ দিচ্ছি না বলে ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বহীনতায় যে গেল ম্যাচটায় জেতার লড়াই দেওয়ার স্কোর গড়া হয়নি তা বলতে ভুল হয়নি তার। ব্যাটসম্যানদের কাছে সেই বার্তা পৌঁছেছে নিশ্চিতভাবে।

প্রথম দুই ম্যাচে বাংলাদেশের একই একাদশ খেলল। কিন্তু তৃতীয় ওয়ানডেতে বুঝি পরিবর্তন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। রাজকোটের মতো নাগপুরেও খেলা হবে একেবারে ফ্ল্যাট উইকেটে। সেখানে তিন পেসার নিয়ে বাংলাদেশের কী কাজ? শফিউল ইসলাম, আল আমিন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমানদের সঙ্গে একমাত্র বিশেষজ্ঞ স্পিনার লেগি আমিনুল ইসলাম বিপ্লব। দুই স্পিনার-দুই পেসার তত্ত্ব আরও ভালো হয় কি না সেই ভাবনা নিয়ে আসলে মুশফিকরা পৌঁছেছেন নাগপুরে।

কিন্তু রোহিত শর্মার কিছু দেনা-পাওনা আছে নাগপুরবাসীর সঙ্গে। ওই যে জামথার বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়াম সেটিও তো নীরব এক দাবি নিয়ে রোহিতের চোখে চোখ রেখেছে। যেমনটা তার ঘরের সবাই কিংবা নিজের শহরের প্রত্যেক ভক্ত এবং সেই সঙ্গে গোটা দেশ। সিরিজ জয় চাই তাদের।

এবারই যে প্রথম অধিনায়ক রোহিত নয়। নিয়মিত অধিনায়ক কোহলির অনুপস্থিতি আগেও দায়িত্ব চাপিয়েছে। সেটা সফলভাবে শেষ করেছেন। এবারের দাবিটা পেছন থেকে উঠে এসে আর প্রতিপক্ষের কাছে নতজানু হওয়ার লজ্জায় না পড়ার, ট্রফিটা নিজেদের শোকেসে তুলে রাখার। তা ছাড়া ঘরের মাঠে ভারতের জন্য অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি জেতার সুযোগ কি আর রোজ রোজ আসে? নাগপুরবাসীর জন্য ঘরের ছেলের হাতে দেশের ট্রফি দেখার বড় সাধ হয়েছে আজ। রোহিত সুযোগ মিস করবেন কেন?

রোহিত হয়তো কোনো অলস সময়ে ভাববেন, প্রতিদান দেওয়ার সুযোগ এলে কখনো মিস করতে নেই। গরিব ঘরের ছেলে। বাবার ছিল কেয়ারটেকারের ছোট এক চাকরি। মা গৃহিণী। দুই সন্তানের খরচ সামলাতে জেরবার বাবার। স্কুলের ফিও ঠিকমতো দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। রোহিতকে তাই ছেলেবেলায় নানা-মামার সঙ্গে কাটাতে হয়েছে।

মায়ের দিকের আত্মীয়স্বজনই চাঁদা তুলে রোহিতকে ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে দিয়েছিলেন। তখন কেবল স্পিনার। কিন্তু একজন কোচ তাকে স্বামী বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি করতে চাইলেন। উন্নত কোচিং ও ট্রেনিং সুবিধা ওখানে। রোহিতরা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছিলেন। কোচ কীভাবে যেন একটা স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে ফেললেন। রোহিতের জীবন বদলে গেল।

স্পিনার, যে ৮ বা ৯ নম্বরে ব্যাট করে সে কি না অল্প কিছুদিনের মধ্যে ব্যাটিং দিয়ে মুগ্ধ করে খাঁটি ওপেনার বনে গেলেন। রোহিতকে এভাবে যাত্রা শুরু করে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। অবশ্য আজ নিজের ঘরে শতকোটির চেয়েও অনেক বেশি মানুষের দেশের অধিনায়ক হয়ে ফিরে রোহিতকে ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হয়। হোন না তিনি ‘স্ট্যান্ড বাই’ ক্যাপ্টেন। তাতে কী? ইতিহাসে লেখা থাকবে নিজের ছেলেটা অধিনায়ক হয়ে ফিরে বুক ভাঙেনি, বঞ্চিত করেনি। নাগপুরের মানুষ ও রোহিত আজ তাই মিলেমিশে একাকার।

আর বাংলাদেশ? চ্যালেঞ্জের পর চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। তৈরিও তারা কঠোরতম পরীক্ষা দিতে। ফল এখন সময়ের হাতে। অপেক্ষা সামান্যই।