‘বুলবুল’ মোকাবিলায় চাই সর্বাত্মক প্রস্তুতি

ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে মানবিক সকল প্রচেষ্টাই কার্যত অসহায়। কেননা দুর্যোগ প্রতিরোধের কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি বিজ্ঞান। তবে, সাইক্লোন আঘাত হানার আগেই সম্ভাব্য উপদ্রুত এলাকা থেকে জনসাধারণকে নিরাপদ অবস্থানে সরিয়ে নিয়ে এবং দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সফল করতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব। ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর বেলাতেও এ কথাগুলো সত্যি। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় আঘাতের আগেই ঘূর্ণিঝড়ের গতিবিধি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা পাওয়া গেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত শনিবার রাতে দেশের খুলনা ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত হানবার কথা। 

সরকারের তরফ থেকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ১৮ লাখ মানুষকে ৪ হাজার ৭১টি আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে উদ্ধার ও জরুরি ত্রাণ তৎপরতার জন্য। পাশাপাশি উপকূলীয় সেনা ক্যাম্পগুলোকে সতর্ক রাখা হয়েছে।  প্রতিটি জেলায় খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ২০০০ প্যাকেট করে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকে এবং ২২টি কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রচার করছে। উপকূলীয় ১৩ জেলার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে তাদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব জেলার সব কর্মীর ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তারা গঠন করেছে ১ হাজার ৫৭৭টি মেডিকেল টিম।

অতীতে বাংলাদেশ এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ শিকার হয়েছে। ব্যাপক প্রাণহানিসহ ধ্বংসযজ্ঞ ও সম্পদহানির ঘটনা ঘটেছে। ১৯৭০ সালের ১৩ নভেম্বর দক্ষিণাঞ্চলে যে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, সেটি ছিল ভয়ংকরতম প্রাকৃতিক দুর্যোগের একটি। ওই ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।  এরপর ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়েও ১ লাখ ৩৮ হাজারের মতো প্রাণহানি ঘটেছিল। ২০০৭ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতের দুই বছরের মাথায় ২০০৯ সালে আঘাত হেনেছিল আইলা। এই দুটি ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত উপকূলীয় অঞ্চল ও সেখানকার অনেক মানুষকে এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ অবস্থায় নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে আজন্ম যুদ্ধ করে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী মানুষকে টিকে থাকতে হয়। পলিবিধৌত বদ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি উঁচুতে অবস্থিত নয়। তাছাড়া আমাদের আছে ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকা। আর এই বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে এই বনের অবদান বিপুল। তাই এই বনটির অস্তিত্ব যাতে কোনোক্রমেই হুমকির সম্মুখীন না হয় সেটা বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। ১৯৭০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৫০ বছরে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে শুধু নভেম্বর মাসেই ৯টি মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। যার ফলে ব্যাপক প্রাণহানি, গৃহপালিত ও বন্যপশুর মৃত্যু ও সম্পদহানি ঘটে।  তাই উপকূলবাসীর মধ্যে নভেম্বর আলাদা একটি আতঙ্কের মাস।

গত মে মাসের ‘ফণি’ ঘূর্ণিঝড়ের সময়ের মতো এইবারও আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিন প্রচারে ১০৯০ হটলাইন ও ওয়েবসাইটে কারিগরি জটিলতা দেখা গেছে। দেশ যখন ডিজিটালাইজেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তখন আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিভাগে এই ধরনের কারিগরি জটিলতা প্রশ্ন তৈরি করে।

দীর্ঘকাল ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তবে উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামোগত ও অনবকাঠমোগত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়ে আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা ও সে সবের মধ্যে সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় কম। আশ্রয়কেন্দ্রে গৃহপালিত পশুপাখি ও অন্যান্য সম্পদ সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেকে সেখানে আশ্রয় নিতে চায় না।  বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে। উপকূলীয় অনেক নদী বরাবর ঘন ও বিস্তৃত বনের বেষ্টনী তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় এ বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।  বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই যেকোনো দুর্যোগের পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর মতো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রাখতে হবে। উপকূল অঞ্চলের সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর, তেল রিজার্ভার, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর কারও হাত নেই। তবে আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ছাড়া এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর চিকিৎসাসেবা বা খাদ্য ও পানীয় জোগান দেওয়াসহ যেসব জরুরি করণীয় থাকে, সে ব্যাপারে আগাম প্রস্তুতি থাকলে সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার অভিযান ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নেমে পড়া যায়। দুর্যোগ মোকাবিলা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দক্ষতার সুনাম রয়েছে। আশা করব, এ ক্ষেত্রেও তা বজায় থাকবে। সরকার, সংশ্লিষ্ট সবাই এবং জনগণ মিলে এবারের এই ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় সক্ষম হবে এবং জানমালের যথাসম্ভব কম ক্ষয়ক্ষতি হবেÑ এটাই সবার প্রত্যাশা।