মনসা মঙ্গলের কাহিনী মোটামুটি সবার জানা। চাঁদ সওদাগর বেহুলা, লখিন্দর আর স্বয়ং সর্পদেবতা মনসার পারস্পরিক কাজিয়া। তার জেরে নিñিদ্র লোহার বাসরঘরে, হাজারো সতর্কতা সত্ত্বেও কীভাবে সাপের কামড়ে লখিন্দরের মৃত্যু হলো, তা বংশপরম্পরায় আমরা শুনে আসছি। যেকোনো কারণেই হোক আমরা আখ্যান শুনি কিন্তু তার ভেতরের শিক্ষাটুকু মনে রাখি না। অন্তত ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিতবিক্রম, বল্লভভাই প্যাটেল পরবর্তী লৌহকঠিন লৌহমানব অমিত শাহ যে মনে রাখেননি, তা ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর দেশে সব থেকে বড় সিপাহি বিদ্রোহ দিল্লির বুকে আছড়ে পড়ার ধরন দেখেই স্পষ্ট।
আমাকে যদি কেউ বলেন এই কয়েক দিনের ভারতীয় ঘটনাপ্রবাহে কাশ্মীর, মণিপুর, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ক্রমেই খারাপ হওয়া, এনআরসিÑ এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে কাকে সব থেকে বেশি উল্লেখযোগ্য মনে করেন? আমি এক কথায় বলব, প্রত্যেকটি আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখলেও এ মুহূর্তে নিঃসন্দেহে প্রবল আলোড়িত বিষয় রাজধানীর বুকে হাজার হাজার পুলিশের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে ফেটে পড়া।
বিক্ষোভের ধরনে স্পষ্ট যে, দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা যন্ত্রণা বাঁধভাঙা বন্যার মতো ভাসিয়ে নিয়ে গেছে এ দেশের মিথ হয়ে যাওয়া সব থেকে সুশৃঙ্খল বাহিনীর যাবতীয় আনুগত্যের শপথকে।
যারা এত দিন শাসক দলের কথায় জেএনইউয়ের ছাত্রদের কিংবা শ্রমিক কৃষক বিক্ষোভে উত্তাল দিল্লিকে কঠোরভাবে দমন করেছেন, যারা মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেও হেনস্তা করতে দ্বিধা করেননি, তারাই প্রকাশ্যে সরাসরি ওপরতলার বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলবে এটা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বৈকি।
বিষয়টির গুরুত্ব শুধু সেখানেই নয়, দিল্লি পুলিশের বিদ্রোহে প্রবল সমর্থন জানিয়েছে অন্যান্য রাজ্যের পুলিশের বড় অংশ। প্রাক্তন পুলিশ কর্মচারীদের একাংশও। এই বিদ্রোহীদের মধ্যে যেমন সাধারণ কনস্টেবল আছেন, তেমনি উচ্চপদস্থ অফিসারেরও নাম আছে। পশ্চিমবঙ্গের অনেক আইপিএসও সোশ্যাল মিডিয়ায় সোচ্চার হয়ে পাশে থেকেছেন দিল্লির সহকর্মীদের।
‘হ্যাশট্যাগ তিসহাজারি’ বলে এক নতুন সাইট আন্দোলনের কর্মীরা বানিয়েছেন। তা মিনিটে মিনিটে সমর্থনের প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে। অথচ এটা সত্যি যে এত বিশাল এক ঘটনা ঘটতে চলেছে, তা আমাদের অতি পরাক্রমশালী গোয়েন্দা বিভাগও জানতে পারল না কেন তা নিয়েই পুরোদস্তুর এক গোয়েন্দা কমিটি তৈরি করা দরকার। আমি নিশ্চিত আগামী দিনে তা হবেও। কিন্তু তাতেও চাপা দেওয়া যাবে না ভারতীয় গণতন্ত্রের এই অভাবনীয় ঘটনা।
ঘটনা যে এইদিকে যেতে চলেছে, তার বিন্দুমাত্র আভাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা তার দপ্তরের আধিকারিকরা কেন পেলেন না, তা নিয়ে একটি শব্দও এখনো কেউ শোনেনি। না অমিত শাহর মুখে, না দপ্তরের কারুর গলায়।
যে দিল্লি পুলিশকে ইদানীং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তার এই বিদ্রোহ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে নাগরিক সুরক্ষা নিয়ে। বেআব্রু হয়ে গেছে কঠোর নিরাপত্তাবলয় সম্পর্কে প্রাচীন ধারণাটি। বাইরের সন্ত্রাসী হামলায় এই বাহিনী কতটা নিরাপত্তা সাধারণ মানুষকে দিতে পারবে, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কথা উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
কয়েক দিন ধরেই পুলিশের সঙ্গে আইনজীবীদের আপাত সামান্য কারণে মন-কষাকষি চলছিল। তিসহাজারি কোর্ট চত্বরে গাড়ি রাখা নিয়ে কয়েক দিন আগে পুলিশের সঙ্গে বচসা বাধে কয়েকজন আইনজীবীর। ক্রমে ক্রমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে। হাতাহাতি থেকে মারামারির পর্যায়ে চলে যায় বিষয়টি। একটা সময় পুলিশ গুলি চালায়। আইনজীবীদের একাংশ পাল্টা মারে কয়েকজন পুলিশকে। পুলিশের ওপরতলা একতরফাভাবে ‘দোষী’ পুলিশদের সাসপেন্ড করলেও আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কিছুমাত্র পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, শাস্তি হয় না।
সেই ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যে রাজ্যে। স্বাধীন ভারতে জন্ম নেয় নতুন এক সিপাহি বিদ্রোহের। কেউ কেউ বলতেই পারেন যে এ অতি সাধারণ ঘটনা। অত ফুলিয়ে, ফাঁপিয়ে বড় করে দেখানোর কিছু নেই। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক সিপাহি অভ্যুত্থানের ঘটনার সূচনাও হয়েছিল আপাত সামান্য ঘটনার মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ রাজ নতুন এক কার্তুজ এনেছিল, যা শোনা যায় গরু ও শুয়োরের চামড়া দিয়ে তৈরি। যা আবার হিন্দু ও মুসলমান দুই ধর্মাবলম্বীদের কাছেই হারাম ও পাপ।
ফলে তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সিপাহি দল দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রিটিশ শাসকের লাল চোখ উপেক্ষা করে রাস্তায় নামে, যা ইতিহাস হয়ে আছে মহাবিদ্রোহ নামে। কার্ল মার্ক্স যাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা-সংগ্রাম বলে।
পরবর্তী সময়ে প্রায় সব গবেষণায় প্রমাণ হয়ে গেছে পলাশী যুদ্ধের পরে যেভাবে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জনসাধারণের বিপুল অংশকে চরম শোষণ শাসনে অতিষ্ঠ করে তুলছিল, যে কৌশলে দেশের শাসকদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছিল, তা জনসাধারণের সব মহলকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলছিল আর তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ওই মহাবিদ্রোহের মধ্য দিয়ে।
বিদ্রোহে অগ্রণী ভূমিকা সিপাহিদের থাকলেও সমাজের নীচুতলার নানা অংশের সমর্থন ছিল যুগান্তকারী ওই অভ্যুত্থানে। প্রান্তিক কৃষক, ভাগচাষি, কারিগর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবার প্রচ্ছন্ন ও পরোক্ষ মদদ ছিল বিদ্রোহের পেছনে। মনে রাখতে হবে, এত বছর পরও ভারতের সেনা, আধা সেনা ও স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর বড় অংশই আসে গ্রাম ভারতের দরিদ্র কৃষক ও অসংগঠিত শ্রমিক পরিবারের মধ্য থেকে। উগ্র জাতীয়তাবাদী জিগির যতই বাড়–ক, তার প্রতি সাধারণের সমর্থন যে কমছে, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে কিছুদিন আগের মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানার বিধানসভা নির্বাচনে। খোদ গুজরাট উপনির্বাচনেও বিজেপির ফল ভালো হয়নি। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ সফল না হলেও প্রবল আন্দোলিত করেছিল ভারতীয় সমাজকে। তার অন্যতম কারণ হিন্দু-মুসলমান একযোগে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে পা মিলিয়েছিল। আজকের ভারতেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের শাসক রাজনীতি ক্রমেই মানুষ প্রত্যাখ্যান করছে। ভোটের রাজনীতির পাশাপাশি পুলিশ বিদ্রোহের পেছনেও একমাত্র না হলেও নিশ্চিতভাবে অন্যতম কারণ ভারতীয় সমাজে সাম্প্রদায়িকতা নয়; সামনে আসছে রুটি-রুজি ও অধিকারের লড়াই।
পুলিশ বিক্ষোভ যে আপাত কারণেই হোক, আসল দাবি নিঃসন্দেহে অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে মুক্তি। এই দাবি সামনে রেখে খুব, খুবই ধীরে একজোট হচ্ছে সমাজের সর্বস্তরের গরিব মানুষ। এই দেয়াললিখন পড়তে না পারলে আগামী দিনে শাসকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়তে পারে।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও কলামনিস্ট