দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের তীব্র সংকট। অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অফ সোসাইটি অফ অ্যানেসথেসিওলজিস (ডব্লিউএফএসএ)’র মতে, চিকিৎসাসেবার মান ঠিক রাখতে প্রতি লাখ রোগীর বিপরীতে পাঁচজন করে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট থাকা দরকার। সেখানে বাংলাদেশে এই সংখ্যা একজনেরও কম, অর্থাৎ এই মুহূর্তে দেশে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংখ্যা শূন্য দশমিক ৭৩ জন। বাংলাদেশ সোসাইটি অব
অ্যানেসথেসিওলজিস্টের হিসাবে, বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে মাত্র ২৬০০ জনের মতো বিভিন্ন ক্যাটাগরির অ্যানেসথেসিওলজিস্ট রয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে পদ ও অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংখ্যা সাড়ে ৯শর মতো।
সোসাইটি আরও জানায়, মোট
অ্যানেসথেসিওলস্টের মধ্যে সোসাইটির অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন প্রায় ১৮০০ চিকিৎসক। এদের মধ্যে আবার মাত্র ৭শ জন নিয়মিতভাবে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে চিকিৎসাসেবার মান ঠিক রাখতে প্রতি লাখে ৫ জন করে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট থাকা দরকার বলেও মনে করে সোসাইটি।
অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকটের কারণে দেশে রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানেসথেসিয়া, অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, রোগী অনুপাতে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের পদ অনেক কম। বেসরকারি পর্যায়ের অবস্থাও খুব একটা ভালো না। সাধারণত সরকারি অ্যানেসথিওলজিস্টরাই ওভার ডিউটি করে বেসরকারি পর্যায়ে সেবা দিয়ে থাকেন। এর ফলে দেখবেন একটি সরকারি হাসপাতালে অপারেশন কম হয়। কিন্তু পাশের একটি ছোট ক্লিনিকে প্রতিদিন কমপক্ষে পাঁচ থেকে দশটা ওটি হয়।
অ্যানেসথেসিওলজিস্টের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, একজন সার্জন মূলত রোগীর অপারেশন করেন। অপারেশন শেষ, তার কাজও শেষ। কিন্তু একজন
অ্যানেসথিওলজিস্টের কাজ শুরু হয় অপারেশনের আগে রোগীকে অজ্ঞান করার মধ্য দিয়ে। সার্জন যখন অপারেশন করেন তখনো অ্যানেসথিওলজিস্টের রোগীর দিকে সতর্ক নজর রাখতে হয়। কারণ অপারেশনের মধ্যেও রোগীর ব্যথা উঠতে পারে। একটা অপারেশন তখনই সফল হয় যখন রোগীর ব্যথামুক্তভাবে জ্ঞান ফিরে আসে। অ্যানসেথেসিওলজিস্ট একটু অসতর্ক হলেই রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে
দেশে অ্যানেসথেসিওলজিস্ট সংকটের পেছনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তিনটি কারণের কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সোসাইটি অফ অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সাধারণ সম্পাদক ডা. কাওসার সরদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের উন্নতি হয়নি। নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে অ্যানেসথেসিওলজিস্টদের কাজ করতে হচ্ছে। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে মেডিকেলগুলোতে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকদের পদ কম। এই চিকিৎসকরা শুধু এমবিবিএস কোর্স শেষ করে অ্যানেসথিয়াতে প্র্যাকটিস করতে পারেন না। তাদের আলাদা প্রশিক্ষণ বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি নিতে হবে। অথচ অন্য বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করার সময় থেকেই প্র্যাকটিস করা যায়। ফলে মেডিকেল শিক্ষার্থীরা অ্যানেসথেসিয়ায় আসতে চান না। এটি এই পেশায় চিকিৎসক সংকটের অন্যতম কারণ।
অধ্যাপক দেবব্রত বনিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই বিষয়ে (অ্যানেসথেসিয়া) সবচেয়ে বড় সমস্যা পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ কম। ঢাকার ভেতর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড হাসপাতাল) ও বাইরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে একজনও অ্যানেসথেসিওলজির অধ্যাপক নেই। ফলে একটা ছেলে যখন দেখবে তার ওপরে ওঠার জায়গা নেই, তখন সে আর এই বিষয়ে আসবে না।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, বাহিরের দেশে প্রতিটি করপোরেট হাউজে অ্যানেসথিয়া থাকে। তাদের মূল্যায়নও বেশি। আমেরিকায় একজন অ্যানসেথেসিওলজিস্ট একজন সার্জারি চিকিৎসকের চেয়ে বেশি টাকা পান। যেহেতু অনেক চাপ নিয়ে ফুলটাইম জব করতে হয়, তাই তাদের অ্যানেসথেসিওলজিস্টদের ছুটির পরিমাণও বেশি থাকে। কারণ এখানে ওভার ওয়ার্ক বেশি করা যায় না। ওভার ওয়ার্ক করলে ভুল হওয়ার বেশি সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু আমাদের জনবল কম থাকায় আমাদের অনেক চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়।