ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে সুন্দরবনের দুই অংশে অবস্থিত বনবিভাগের বিভিন্ন ভবন, স্থাপনা, নৌযান ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে পূর্ব সুন্দরবনে ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে বনবিভাগ নির্ণয় করেছে। এই অংশের গাছপালার ক্ষয়ক্ষতির হিসাব এখনো করা হয়নি। তবে পশ্চিম সুন্দরবন অংশের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে আরও দুই-তিন দিন সময় লাগতে পারে বলে বনবিভাগ জানিয়েছে।
আমাদের মোংলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বুলবুলের তাণ্ডবে পূর্ব সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নৌযান ও অবকাঠামোর। তবে বন্যপ্রাণী হতাহতের খবর নেই বনবিভাগের কাছে। বনের গাছপালার ক্ষতি নির্ণয়ে কাজ চলছে, দুয়েক দিনের মধ্যে এ তথ্য জানা যাবে।
গতকাল মঙ্গলবার পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় (বাগেরহাট) বন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বুলবুলের আঘাতে চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে ছয়টি আবাসিক ভবন ও ১৭টি অনাবাসিক ভবনের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এগুলোর কোনোটির চাল উড়ে গেছে, কোনোটির দেয়াল ধসে পড়েছে। বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়িতে থাকা ১০টি জেটি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ১৯টি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার, পন্টুন, ফুট ট্রেইলার, গ্যাংওয়ে, হরিণের খাঁচা, পাহারা ঘর ও সোলার প্যানেল। ক্ষতি হয়েছে বনবিভাগের একটি স্পিডবোট ও দুটি ট্রলারের। বনবিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের সাতটি স্টেশন ও ৩৩টি টহল ফাঁড়ির নৌযান ও অবকাঠামোগত এ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
ঝড়ের পর চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. শাহীন কবির ও শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীন ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চল পরিদর্শন শেষে ক্ষয়ক্ষতির এ প্রতিবেদন পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসানের কাছে দাখিল করেন। এ দুই কর্মকর্তাই আগামী দুয়েক দিনের মধ্যে বনের গাছপালার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে বিভাগীয় কর্মকর্তার কাছে দাখিলের কথা রয়েছে।
দুবলার চরের জেলেপল্লীতে ক্ষয়ক্ষতি: ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে বঙ্গোপসাগর পাড়ের সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের দুবলার চরের জেলেপল্লীতেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চরে শুঁটকির জেলেদের গড়ে তোলা অস্থায়ী বসতঘর, মাচা ও গুদামঘর ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুব বেশি ক্ষতি হয়নি চরের জেলেদের স্থাপনার। কারণ চরের অধিকাংশ ঘরই তৈরি সস্তা ও সহজলভ্য বাঁশ, গোলপাতা, হোগলা ও পলিথিন দিয়ে। ঝড়ে ওইসব ঘর, মাচা, চাল, বেড়া ও পলিথিন উড়ে গেলে তা আবার ঠিক করে নিয়েছেন তারা। আর মৌসুম মাত্র শুরু হওয়ায় তেমন ক্ষতি হয়নি শুঁটকির। গত ১ নভেম্বর থেকে দুবলার চরে শুরু হয়েছে শুঁটকি মৌসুম। চলবে আগামী মার্চ পর্যন্ত। চরের জেলেদের জাল ও নৌকার কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কারণ এবারের ঘূর্ণিঝড় নিয়ে বনবিভাগের প্রচার ও প্রস্তুতিও ছিল অন্যান্য দুর্যোগকালীন সময়ের তুলনায় ভালো। এছাড়া কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী আগে থেকেই দুবলার চরের জেলেদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়। জেলেরাও অধিক সতর্কতাবস্থায় থাকায় তাদের ট্রলার ও জাল দড়ির কোনো ক্ষতি হয়নি।
দুর্যোগে আগলে রাখছে সুন্দরবন: সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছোট-বড় সব দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে উপকূলের মানুষকে আগলে রাখছে সুন্দরবন। তাই সুন্দরবনই আমাদের রক্ষাকবজ। এ কবজের যত্ন না নিলে আমাদের চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তাই আমাদের সবাইকে যে যার অবস্থান থেকে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। বিগত সিডর ও আইলায় যে প্রাণহানি ঘটেছিল, যদি সুন্দরবন না থাকত তাহলে তা আরও বেশি ভয়াবহ হতো। এবার বুলবুলের তাণ্ডব থেকে উপকূলের লোকজনকে বাঁচিয়েছে সুন্দরবন।
আমাদের খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, বুলবুলের আঘাতে পশ্চিম সুন্দরবন অংশে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনো নিরূপণ হয়নি। এ বিষয়ে জরিপ পরিচালিত হবে। এতে দুই-তিন দিন সময় লাগতে পারে। সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের অন্তভু©ক্ত বনবিভাগের সাতটি স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো বন্যপ্রাণীর ক্ষতির তথ্য এখনো মেলেনি।
সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগীয় বনবিভাগ জানায়, পশ্চিম সুন্দরবনের আওতায় ৩৬টি ক্যাম্প, ফাঁড়ি, রেঞ্জ ও স্টেশন রয়েছে। বনের সামগ্রিক ক্ষতি নিরূপণের চেষ্টা চলছে। সার্ভে না করে কিছু বলা যাবে না। তবে প্রাথমিকভাবে কোনো বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। কারণ ভাটার সময় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। ফলে জলোচ্ছ্বাস ছিল না। দমকা হাওয়ার কারণে বনের গাছপালা উপড়ে ও ডাল ভেঙে পড়ে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বশিরুল আল মামুন বলেন, বুলবুলের আঘাতে সাতক্ষীরা রেঞ্জের পুষ্পকাঠি ফরেস্ট স্টেশনের ঘরের টিনের চালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কদমতলার এফজি ব্যারাকের টিনের চাল উড়ে গেছে ও রান্নাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠশ্বর অফিসের ছোট ট্রলার নদীতে ডzবে গেছে এবং পাকাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোবাদক স্টেশনের কাঠের ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের জেটিটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ব্যারাকের চাল ও রান্নাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চুনকুড়ির সোলার প্যানেল উড়ে নদীতে ভেসে গেছে। দোবেকি টহল ফাঁড়ির ৪০ ফুট দীর্ঘ পন্টুনটি ভেঙে গেছে। নলিয়ান রেঞ্জ অফিসে যাতায়াতের রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অফিসের চারপাশের গাছপালা ভেঙে পড়েছে।
সুন্দরবনে নভেম্বরে সীমিত আকারে পর্যটন: চলতি মাসে সুন্দরবনে সীমিত আকারে পর্যটন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৫ থেকে ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিন পর্যটন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টায় খুলনার বন ভবনে টু¨র অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সঙ্গে বনবিভাগের এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বশিরুল আল মামুন জানান, পানিতে যেহেতু কোনো সমস্যা নেই, তাই জেলেদের জন্যও পাস পারমিট দেওয়া হবে।
খুলনার বন সংরক্ষক (সিএফ) মঈনুদ্দিন খান বলেন, সুন্দরবনে আগামী ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত সীমিত আকারে পর্যটন চলবে। কারণ রাসমেলার আগে টু¨র অপারেটররা পর্যটক বুকিং নিয়েছিলেন। সেগুলো ছাড়ার জন্যই নভেম্বর মাসে পর্যটন সীমিত করা হচ্ছে। আর ২৫ থেকে ২৭ নভেম্বর–তিন দিন পর্যটন বন্ধ রাখা হবে। ইলিশ নিষেধাজ্ঞার কারণে জেলেদের দুই দফায় মাছ শিকার বন্ধ ছিল। এ কারণে জেলেদের জন্য আজ (গতকাল) থেকে পাস পারমিট দেওয়া চালু করা হয়েছে।