গাজীপুর কালিয়াকৈরের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম গত বিশ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন। বর্তমানে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে ৬২নং ওয়ার্ডের ৬৪১নং বেডে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। জহিরুল ইসলাম জানান, ১৯৯৯ সালে ডায়াবেটিস ধরা পড়ে তার। চার বছর আগে পায়ের আঙুলে হঠাৎ ফোসকা পড়ে। এক সপ্তাহ না যেতেই পা অস্বাভাবিক ফুলে ওঠে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নিলে কিছুদিন পর পায়ে পচন দেখা দেয়। পরে রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসকরা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কেটে ফেলেন।
জহিরুল ইসলামের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে জানান, ডায়াবেটিসের কারণে স্বামীর শরীরে নতুন নতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে চোখে ছানি পড়েছে। হার্টের সমস্যাও দেখা দিয়েছে। আগে প্রতিমাসে দুই-তিন হাজার টাকা লাগলেও এখন ছয়-সাত হাজার টাকা ওষুধের জন্য খরচ হচ্ছে।
পাশের বেডেই ২২ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা মো. শাহজাহান (৪৮)। ১২ বছর ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। নেত্রনালিসহ চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে। অস্ত্রোপচারের পরও চোখে ঝাপসা দেখছেন।
চিকিৎসার ব্যয় প্রসঙ্গে শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে জানান, সাতজনের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। রঙের কাজ করতেন। গত এক বছর ধরে কাজ করতে পারছেন না। প্রতিমাসে ইনসুলিন ও অন্যান্য ওষুধ বাবদ খরচ হচ্ছে পাঁচ হাজার টাকা। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বসতভিটা ছাড়া সব জমি বিক্রি করেছেন তিনি। এভাবে চলতে থাকলে পথে নামা ছাড়া কোনো উপায় দেখছেন না শাহজাহান।
ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিক ফেডারেশনের (আইডিএফ) ২০১৭ সালের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, দেশে বর্তমানে ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭৩ লাখ। এসব রোগীর চিকিৎসার জন্য বছরে ব্যয় হচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি অনুদান মিলছে মাত্র ৭শ কোটি টাকা। বাকি ১৩শ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে রোগীদের। আবার মোট অনুদানের মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি। বাকি ৯৫ শতাংশ অনুদান আসছে বেসরকারি খাত থেকে।
অবশ্য ডায়াবেটিসের ধরন ভেদে চিকিৎসা ব্যয় ভিন্ন বলে জানান ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান। তিনি বলেন, সাধারণত ডায়াবেটিস-১ টাইপের রোগীদের মাসে খরচ গড়ে ৬-৭ হাজার টাকা ও টাইপ-২ এর খরচ দেড় হাজার টাকা। এর বাইরে ডায়াবেটিসের কারণে দেখা দেওয়া অন্যান্য রোগের (পঙ্গুত্ব, হৃদরোগ, অন্ধত্ব, কিডনি রোগ ইত্যাদি) চিকিৎসায়ও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। সে হিসেবে ডায়াবেটিসের পেছনে মূল ব্যয় অনেক বেশি। সরকার ডায়াবেটিসের রোগীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ না নিলে নিম্নবিত্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে না।
আইডিএফ-২০১৭ সালের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট প্রায় ৭৩ লাখ রোগীর মধ্যে অর্ধেক নারী। তা ছাড়া ডায়াবেটিস আক্রান্তদের ৫০ শতাংশ লোক জানেই না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে। ১০০ গর্ভবতী নারীর মধ্যে ২০ জন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, এদের ৬৫ শতাংশই পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়।
গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি জানায়, গত বছরের নভেম্বরে সারা দেশে এক লাখেরও বেশি লোকের ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৬০ শতাংশই ডায়াবেটিস আক্রান্ত ছিলেন। এই সংখ্যা এত দিনের অনুমিত সংখ্যার চাইতে অনেক বেশি। এই জরিপে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ডায়াবেটিসের রোগী চট্টগ্রামে ও কম সিলেটে।
অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বংশগত কারণ ছাড়াও নগরায়ণ ও পরিবর্তিত জীবনধারণের কারণেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জীবনযাপনের ধরন সবার আগে পরিবর্তন করতে হবে। খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা পরিবর্তন এবং শারীরিক পরিশ্রম বাড়ানোর মাধ্যমে ৬০-৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সবার পক্ষে এ রোগের ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। ডায়াবেটিস টাইপ-১ রোগীদের নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হয়। আমরা বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছি যাতে টাইপ-১ রোগীদের জন্য ইনসুলিন ফ্রি করে দেয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আমাদের প্রস্তাবটি তাদের বিবেচনাধীন রয়েছে। যদি সরকার আমাদের প্রস্তাবটি মেনে নেয়, তবে ডায়াবেটিসের রোগীর খরচ অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করি।
ডায়াবেটিস চিকিৎসার ব্যয় প্রসঙ্গে বারডেম হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ডায়াবেটিস গবেষক অধ্যাপক ডা. আবু সায়িদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডায়াবেটিস প্রধানত দু’ধরনের টাইপ-১ ও টাইপ-২। সাধারণত ৩০ বছরের কম বয়সীদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস দেখা যায়। এ ধরনের রোগীর শরীরে ইনসুলিন একেবারেই তৈরি হয় না। তাই বেঁচে থাকার জন্য রোগীর ইনসুলিন নিতে হয়। এ ধরনের রোগীর সংখ্যা দেশে কম। বেশি রোগী টাইপ-২, প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশ। এসব রোগীর শরীরে ইনসুলিন নিষ্ক্রিয় বা ঘাটতি থাকে। ফলে অনেক সময় ইনসুলিন নিতে হয়। তবে এ ধরনের রোগীরা কায়িক পরিশ্রম বা হাঁটাহাঁটি করলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। ইনসুলিনের প্রয়োজন হয় না।
আজ বিশ^ ডায়াবেটিস দিবস : বিশে^র ১৭০টি দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্যÑ ‘আসুন, প্রতিটি পরিবারকে ডায়াবেটিস মুক্ত রাখি’। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন হাসপাতাল ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি নিয়েছে।
রাজধানীতে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি বারডেম হাসপাতালে সমিতির মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, মহাসচিব মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন, বারডেম জেনারেল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান ও অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী।
সম্মেলনে বলা হয়, দেশের ৭৩ লাখ রোগীর মধ্যে ৪৫ লাখ (প্রায় ৬৫ শতাংশ) রোগীকে ডায়াবেটিস-সেবার আওতায় আনা গেছে। বারডেম ও সমিতির অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৪৫ লাখের বেশি নিবন্ধনকৃত রোগীদের স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিনামূল্যে ইনসুলিন ও ওষুধ বিতরণ বাবদ গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করেছে সমিতি।
দিবসটি উপলক্ষে দেশব্যাপী সমিতি বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে পদযাত্রা, সকাল ৮-১১টা পর্যন্ত শাহবাগ, রমনা পার্কের গেটের পাশে, ধানমণ্ডি রবীন্দ্র সরোবর এবং এনএইচএন ও বিআইএইচএসের বিভিন্ন কেন্দ্র সংলগ্ন স্থানে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয়, বারডেম মিলনায়তনে আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠান।
দিবসটি উপলক্ষে গতকাল বুধবার রাজধানীতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সাগর রুনি মিলনায়তনে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বক্তারা বলেন, ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য পরামর্শ হলো সুষম খাবার গ্রহণ, নিয়মিত হাঁটা, শরীরকে সচল রাখা, ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধ ও ইনসুলিন গ্রহণ করা। বাংলাদেশে ২০ ভাগেরও কম রোগী ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সফল। সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি হলো দেশে অতি অল্প বয়সের ছেলেমেয়েরা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসেরের সভাপতিত্বে সেমিনারে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ডা. মো. আবু সায়িদ খান, পবা সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সোবহান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী প্রমুখ।