দক্ষিণে ১২ উপজেলা এখনো বিদ্যুৎহীন

ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতে দেশের দক্ষিণ জনপদের বেশ কয়েকটি জেলার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সেসব লাইন এখনো পুরোপুরি মেরামত করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে পাঁচ দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন পার করছেন বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা ও মাদারীপুর জেলার দেড় লক্ষাধিক গ্রাহক। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বাপবিবো) নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানার পর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সংস্থাটির প্রায় ৩ হাজার ৬৫২ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। যার ফলে ১ লাখ ৩২ হাজার পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে জীবনযাপন করছে। তবে প্রতি পরিবারের সদস্যসংখ্যা হিসাব করলে দুর্ভোগে থাকা মানুষের সংখ্যা দাঁড়াবে গ্রাহকসংখ্যার চার থেকে পাঁচগুণেরও বেশি।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে উপকূলীয় জেলাগুলোর ৮৫ হাজার ৫১০ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশালের ৩৯ লাখ ২২ হাজার গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী অঞ্জন কান্তি দাশ গতকাল শুক্রবার রাত ৮টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিরোজপুরের ৫টি, বাগেরহাটের ৪টি এবং বরিশালের ৩টি উপজেলাসহ এখনো বিদ্যুৎহীন রয়েছে মোট ১২টি উপজেলা। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে ১৩ জেলায় প্রায় ৩৫০০ খুঁটি ভেঙে পড়ে যায়।’

ঘূর্ণিঝড়ের ফলে তার সংস্থার প্রায় ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা এই কর্মকর্তার।

সুন্দরবন এই ঝড় থেকে দেশকে রক্ষা করেছে উল্লেখ করে প্রকৌশলী অঞ্জন কান্তি আরও বলেন, ‘যদি সুন্দরবন না থাকত তাহলে চার মাসেও এই ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামত করা সম্ভব হতো না। এসব জেলায় সঞ্চালন লাইন মেরামতের কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনের পাশাপাশি প্রতি জেলায় বাপবিবোর কয়েক হাজার কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। তারপরও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে আরও কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।’

বাংলাদেশ সময় গত শনিবার রাত ৯টায় পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। পরদিন রবিবার ভোর ৫টা নাগাদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছায় এই ঝড়ের ঝাপটা। তবে তার আগেই দমকা বাতাসে

 ঘরবাড়ি, স্থাপনা ও গাছপালার সঙ্গে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। ঝড়ের বিপদ কাটে রবিবার বিকেলের পর।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ঢাকার পরিদর্শক মাধব কুমার রায় গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিরোজপুরের ২ হাজার ১০০ কিলোমিটার লাইন বন্ধ রয়েছে এবং ৭৫ হাজার গ্রাহক বিদ্যুতের আওতার বাইরে রয়েছেন। বাগেরহাটের ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার লাইন এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে, যার ফলে ৩০ হাজার গ্রাহক এখনো বিদ্যুতের আওতার বাইরে রয়েছেন। এছাড়া গৌরনদী, আগৈলঝড়া, বরিশাল ক্যাডেট কলেজ নিয়ে গঠিত বাপবিবোর বরিশাল-২ এলাকায় ৪৫০ কিলোমিটার লাইন বন্ধ, যার ফলে ২৫ হাজার গ্রাহক এখন বিদ্যুতের আলোহীন। এছাড়া বরিশাল-১ জোনে ২ কিলোমিটার লাইন বন্ধ থাকার কারণে বিদ্যুৎহীন রয়েছেন ৪০০ ভোক্তা। এছাড়া খুলনা অঞ্চলে  ১ হাজার ২০০ গ্রাহক এবং মাদারীপুরে ৫০০ গ্রাহক বিদ্যুতের আওতার বাইরে রয়েছেন।’

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব এলাকার হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো জরুরি সেবাকেন্দ্রগুলোতে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মীরা। রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক সাধারণ গ্রাহকের কাছে এখনো তারা পৌঁছাতে পারেননি। এছাড়া অনেক জায়গায় হয়তো কেউ কোনো যোগাযোগ করেননি বলে সেই এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়নি। তবে খোঁজ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সৌরবিদ্যুতের সাহায্য নিয়ে কেউ কেউ আপৎকালীন সময় পার করছেন। যাদের সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই তাদের ভরসা কেরোসিনের কুপি আর মোমবাতি। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোন অপারেটরদের তিন হাজারের বেশি টাওয়ার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের পর অনেক টাওয়ার সচল হলেও কিছু এলাকা এখনো মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কের বাইরে রয়ে গেছে। নেটওয়ার্ক ফিরলেও অনেকের হাতের মোবাইল ফোনটি বন্ধ হয়ে আছে চার্জ দিতে না পারার কারণে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা থেকে দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, গ্রাম এলাকার অনেকেই শহরে এসে মোবাইল ফোন চার্জ দিচ্ছেন।

পল্লী বিদ্যুৎ কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিদ্যুতের লাইন যে রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা সর্বোচ্চ গতি নিয়ে মেরামত করলেও আরও দুদিন সময় লেগে যেতে পারে। দেশ রূপান্তরের মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের পর তিন দিন কালকিনি উপজেলা শহরে বিদ্যুৎ ছিল না। পরে বিদ্যুৎ সংযোগ এলেও শহরের বাইরে অনেক এলাকা বিদ্যুতের আওতার বাইরে ছিল। প্রায় ৯১টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। এ পরিস্থিতিতে জেনারেটর দিয়ে মোবাইল ফোন চার্জ করতে হচ্ছে জেলার অনেক বাসিন্দাকে। 

বাগেরহাট পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হাসপাতাল, স্কুর-কলেজে আগে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় আনতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে।’

দেশ রূপান্তরের পিরোজপুর প্রতিনিধি জানান, ঝড়ের পর শহরাঞ্চলে দুদিন বিদ্যুৎ ছিল না, তারপর ফিরে এলেও গ্রামাঞ্চলে এখনো অধিকাংশ লাইন মেরামতের অপেক্ষায়। এছাড়া ভা-ারিয়া ও ইন্দুরকানীসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করা হলেও তা আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় ছোট আকারের জেনারেটর চালু করে মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।