নতুন আইন নিয়ে আতঙ্কে মালিক-চালকরা

রাজধানীসহ সারা দেশে পরিবহন সংকটের শঙ্কা

নতুন সড়ক ও পরিবহন আইন নিয়ে অসন্তুষ্ট গাড়ির মালিক ও চালকরা আতঙ্কে রয়েছেন জেল-জরিমানার ভয়ে। এ কারণে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বাস চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছেন তারা। তাদের মধ্যে কেউ পূর্বঘোষণা দিচ্ছেন, কেউ তা-ও দিচ্ছেন না। এতে চরম বিপাকে পড়ছেন অনেকে। হিলি-বগুড়া রুটে গতকাল শনিবার সকাল থেকেই ঘোষণা দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। আর ঘোষণা ছাড়াই গতকাল সকালে বগুড়া থেকে জয়পুরহাট, রংপুর, নওগাঁ, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, নাটোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ রাখেন বাস মালিক ও চালকরা।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু রাজধানীর সড়কে চলাচলরত বাসের ৮০ শতাংশ চালকেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স ত্রুটিপূর্ণ। তাই নতুন আইনে ক্ষোভ প্রকাশ করে

আজ রবিবার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসেই রাজধানীতে বাস চালাবেন না বলে জানিয়েছেন বেশ কিছু চালক। তারা বলছেন, বিষয়টি মালিকরাও জানেন। ফলে রাজধানীতে আজ তীব্র গণপরিবহন সংকট দেখা দিতে পারে। তবে পরিবহন মালিকরা বলছেন, বাস বন্ধ রাখার কোনো সিদ্ধান্ত তারা জানেন না। এতটুকু জানেন যে চালকরা নতুন আইনে বাস চালাতে চান না। তাই অনেক বাস চালকের অভাবে বসে রয়েছে। তারা বলছেন, এ ক্ষেত্রে পরিবহন সংকট দেখা দিলে তাদের কিছু করার থাকবে না।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করে। কিন্তু মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে তা তাৎক্ষণিক কার্যকর করতে পারেনি। আইন করার এক বছরের বেশি সময় পর ১ নভেম্বর থেকে আইনটি কার্যকর করা হয়। তবে ট্রাফিক পুলিশের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় আইনটি বাস্তবায়ন হয়নি। আইন বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগের ডিসি মো. মেহেদি হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন আমরা আইন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করছি। কমিশনার স্যারের নির্দেশ অনুযায়ী এই মাসের ২০ তারিখের পর আইন বাস্তবায়নের দিকে যাব।’

আইন নিয়ে মালিক ও চালকদের অসন্তোষ এবং সড়কে গণপরিবহনের সংকটের আশঙ্কার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের অদূরদর্শিতার ফসল। বর্তমানে বাস মালিক-শ্রমিকদের কাছে মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। নতুন আইন বাস্তবায়নের পর যেখানে গণপরিবহন সংকট তৈরি হবে, সেখানে এই মুহূর্তে বিআরটিসির বাস জরুরি ভিত্তিতে ব্যবহার করা সময়ের দাবি।’

রাজধানীতে চলাচলরত ঠিকানা ও ইতিহাস বাসের ভাইস চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গাড়ি চলা বন্ধ করা হয়নি। তবে যাদের সঠিক লাইসেন্স নেই তাদের ২৫ হাজার টাকা জরিমানা হবে এই ভয়ে অনেকেই হয়তো চালাবে না। এ ছাড়া সঠিক কাগজ থাকার পরও কিছু ড্রাইভার আতঙ্কে বাস চালাবে না। এতে ড্রাইভারের সংকট হতে পারে। তিনি বলেন, যে গাড়ির ফিটনেস নেই, কাগজপত্র আপডেট নেই, বডি ভাঙা, গ্লাস ভাঙা, রুট পারমিট ঠিক নেই, সেই গাড়ি বের না হতে পারে। এ ছাড়া অনেক গাড়িই চালকের অভাবে কয়েক দিন ধরে বসে আছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে চালকদের হালকা লাইসেন্স। যদি ঢাকা সিটিতে এক লাখ বাস চালক থাকে তার ৮০ হাজারের হালকা লাইসেন্স। অনেক চালকেরই বয়স হয়েছে, তারা নবায়ন করেনি। আবার অনেকেই দালালের মাধ্যমে করার চেষ্টা করে। সেগুলো দালালরা টাকা নিয়ে পরে হারিয়ে ফেলে। এদের অনেকেই পেশা পরিবর্তনের কথাও বলছে। দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা সব দিকেই বিপদে আছি। একদিকে সরকারি চাপ, অন্যদিকে ড্রাইভারের সংকট। আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে আবেদন করেছি এই মাসটা সময় দিতে।’

গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলা বাসের কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আজ রবিবার থেকে তারা বাস না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ বিষয়ে মালিকদেরও জানিয়ে দিয়েছেন। তবে সরকারের চাপ থাকায় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি কোনো বাসের চালক। তারা বলছেন, বাস না চালানোর এই সিদ্ধান্তে সমর্থন রয়েছে মালিকদের। গতকাল দুপুরে মিরপুর ১০ নম্বরে কথা হয় ইতিহাস পরিবহনের এক চালকের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, ‘নতুন আইনে বাস চালানো সম্ভব না। কাল (রবিবার) থেকে আমরা বাস চালাব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীতে রবিবার কোনো বাসই চলবে না। এ বিষয়ে আমাদের নেতাদেরও নির্দেশ রয়েছে।’ নেতা কারা জানতে চাইলে তিনি নাম বলতে রাজি হননি। সরকার তাদের বাস চালাতে চাপ দিচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ফার্মগেটে কথা হয় লাব্বাইক পরিবহনের এক চালকের সঙ্গে। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘কাল (রবিবার) থেকে রাজধানীতে কোনো বাস রাস্তায় নামবে না। আমরা বাস চালাব না। যে আইন করা হয়েছে, এই আইন মেনে বাস চালানো সম্ভব না। রাস্তায় চললে দুর্ঘটনা ঘটবেই। তাই বলে এত জেল-জরিমানা করা হলে আমরা কীভাবে গাড়ি চালাব।’ বাংলামোটরে কথা হয় মিজানুর রহমান নামে এক বেসরকারি চাকরিজীবীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সড়কে বাস অনেক কম। বাদুর ঝোলা হয়ে অফিস যেতে হচ্ছে। সরকারের উচিত সড়কে দ্রুত নিজস্ব বাস নামানো।’

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকালেই কোনো ঘোষণা ছাড়াই বগুড়া থেকে জয়পুরহাট, রংপুর, নওগাঁ, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, নাটোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ রাখেন বাস মালিক ও চালকরা। এ কারণে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। অনেক যাত্রী টার্মিনালে মালামালসহ গিয়েও কোনো বাস না পেয়ে বিকল্প পথে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন।

বগুড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি কামরুল মোর্শেদ আপেল জানান, শ্রমিক ইউনিয়ন থেকে গাড়ি বন্ধের কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। যেহেতু নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হয়েছে। তাই অভিযানের ভয়ে মালিক ও চালকরা নিজে থেকেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ রাখেন।

দুপুর পর্যন্ত এই অবস্থা চলার পর বগুড়া ট্রাফিক পুলিশের প্রতিনিধিরা মালিক ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পর আবারও যান চলাচল শুরু হয়।

বগুড়া ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (টিআই-১) রেজাউল করিম জানান, পূর্বঘোষণা না দিয়ে দুপুর থেকে হঠাৎ বগুড়ার সঙ্গে অধিকাংশ জেলার বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিষয়টি নিয়ে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়। দুপুর ২টার পর থেকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে বলে তিনি জানান।

হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারের দাবিতে দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলি থেকে হিলি-বগুড়া পথে অনির্দিষ্টকালের জন্য যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন চালকরা। তবে হিলি-দিনাজপুর, হিলি-জয়পুরহাট রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। সেই সঙ্গে সব রুটে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। গতকাল শনিবার সকাল থেকেই চালকরা হিলি বাসস্ট্যান্ডে নিজ নিজ গাড়ি বন্ধ রেখে অনির্দিষ্টকালের এই কর্মসূচি পালন শুরু করেন। আবার অনেক চালক তাদের বাস মালিকের বাড়িতে জমা দিয়েছেন। হঠাৎ করে বাস চলাচল বন্ধ হওয়ায় ওই পথে চলাচলরত যাত্রীরা বাস না পেয়ে বিপাকের মধ্যে পড়েছেন। বিকল্প উপায়ে ভ্যান-রিকশা বা ইজিবাইকে করে কিংবা অন্য রুট হয়ে বাড়তি ভাড়ার মাধ্যমে যাতায়াত করছেন।

বাসচালক রেজাউল ইসলাম ও ইমরান হোসেন জানান, তাদের যারা বাস চালান তারা কেউ তো ইচ্ছা করে কোনো দুর্ঘটনা ঘটান না বা কাউকে চাপা দেন না। সড়কে ভ্যান-রিকশা-সিএনজির যে চাপ এগুলোর চালকরা তো ডান-বাম বোঝে না হুট করে লেন পরিবর্তন করে ঢুকে দেয়, কিন্তু এখন কোনো কারণে একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই আর তাতে কেউ মারা গেলে নতুন আইনে চালকের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে বা কেউ আহত হলে ৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্যও তাদের নেই, তাই বাস চালিয়ে জেলখানায় যেতে চান না তারা। দিনাজপুর মোটরপরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন হাকিমপুর উপজেলা স্ট্যান্ড কমিটির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান মিলন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এটি সংগঠনের কোনো কর্মসূচি নয়, হিলি-বগুড়া পথের বাসের চালকরা নিজেরাই গাড়ি চালানো থেকে বিরত রয়েছেন।

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, গড়ির লাইসেন্স ও ফিটনেস, ড্রাইভিং লাইলেন্স, ইন্স্যুরেন্সসহ রাস্তায় গাড়ি চালাতে আইনসিদ্ধ যা কিছু মেনে চলার কথা তার ব্যত্যয় ঘটলেই কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হবেÑ এমন প্রচারে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। এ আতঙ্কে দুদিন আগেই মেহেরপুর-কুষ্টিয়া এবং কুষ্টিয়া-দৌলতপুর উপজেলার মধ্যে চলাচলকারী লোকাল বাস বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। তবে সব রুটে দূরপাল্লার পরিবহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সভাপতি আজগর আলী।