দেশের ভেতর থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যার ৮০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে হচ্ছে। অর্থ পাচার এক ধরনের ‘সফিসটিকেটেড’ অভিজাত দুর্নীতি। আর এ দুর্নীতি হয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক শক্তিশালী পদক্ষেপ নিলেই অর্থ পাচার কমানো সম্ভব। ‘অর্থ পাচার রোধে জাতীয় কৌশলপত্র ২০১৯-২১’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের বিষয়টি স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সাধারণত আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে পণ্যের আন্ডার ইনভয়সিং ও ওভার ইনভয়সিংয়ের মাধ্যমে এ অর্থ পাচার হচ্ছে। তা বন্ধে আমরা অটোমেশন সিস্টেমে যাচ্ছি।
গতকাল রবিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এসব কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে কৌশলপত্র বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, মানি লন্ডারিং অর্থনীতির শত্রু আর মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে সন্ত্রাস তৈরি হয়, যা দেশের শত্রু। তাই অর্থনীতি এবং মানবসভ্যতার জন্য মানি লন্ডারিং বড় হুমকি। এটি শুধু আমাদের জন্যই হুমকি এমনটি নয়, মানি লন্ডারিং সব দেশের জন্যই হুমকি। আমাদের এই মাটি থেকে আমরা তা দূর করব। তবে আমরা একা আওয়াজ তুলে এর প্রতিরোধ করতে পারব না। এ সমস্যা সমাধানে কোনো দেশের একক প্রচেষ্টায় ফলাফল পাওয়া সম্ভব নয়। জাতীয় স্বার্থেই বিশ্বের প্রত্যেকটি দেশকে অর্থ পাচার রোধে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যদি সবাই মিলে কাজ করি তবে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সফল হব বলে আশা করি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে উৎসাহিত করতে পশ্চিমা বিশ্বের একটি দেশের প্রবাসীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বাংলাদেশে পাঠানো হতো। আমরা কয়েক বছর ওই দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, কিন্তু তারা আমাদের বিষয়টি উপলব্ধি করতে চায়নি। সম্প্রতি নিজেরাই একটি সমস্যায় পড়ার পর আমাদের বিষয়টি তারা উপলব্ধি করেছে। আমাদের সমস্যাটা তারা এখন দেখছে। অনেক আগে তারা বিষয়টি উপলব্ধি করলে আমরা অনেক সমস্যা থেকে রক্ষা পেতাম। তিনি বলেন, বন্ধুরাষ্ট্রগুলোকে আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা অনুধাবন করতে হবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেই মূলত টাকা পাচার হয়। অর্থ পাচারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সবাই একে অন্যের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে সহযোগিতা করে। তাই অপরাধীদের চিহ্নিত করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া এসব মামলার সমাধানে অনেক কালক্ষেপণ হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, অর্থ পাচার এক ধরনের ‘সফিসটিকেটেড’ বা অভিজাত দুর্নীতি। আর এই দুর্নীতি হয় ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে। দেশের ভেতর থেকে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যার ৮০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে হচ্ছে। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক শক্তিশালী পদক্ষেপ নিলেই অর্থ পাচার কমানো সম্ভব।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, মানি লন্ডারিং হলো প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের অক্সিজেন। একটি দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে এটা প্রতিরোধ করা খুবই জরুরি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেন, অর্থ পাচার রোধ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আজকে প্রকাশিত এ কৌশলপত্রের মাধ্যমে অর্থ পাচার প্রতিরোধ করা যাবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সেমিনারের শুরুতে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে জাতীয় কৌশলপত্র উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান আবু হেনা মো. রাজি হাসান। কৌশলপত্রে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধে মোট ১১টি কৌশলের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়। এই ১১টি কৌশলের মাধ্যমে ১৩৭টি কার্যকর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। কোন কৌশল কোন কোন সংস্থা বাস্তবায়ন
করবে এবং কার কী দায়িত্ব রয়েছে তা তুলে ধরা হয়।