বুয়েটে অচলাবস্থার ইন্ধনদাতারা চিহ্নিত হয়েছে : নওফেল

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েটে) অচলাবস্থার পেছনের ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী। গতকাল সোমবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বুয়েটের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান তিনি।

একই দিন বুয়েট প্রশাসন চার্জশিটভুক্ত আসামিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি পূরণে দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছে। আন্দোলনকারীরা এর মধ্যে দাবি পূরণ হলে ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরবেন বলে জানিয়েছেন।

শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, ‘বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা একটি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনা। দলীয় বিবেচনা না করে হত্যাকান্ডের জড়িত সন্দেহভাজন সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মামলার চার্জশিটও দেওয়া হয়েছে। তারপরও আমরা লক্ষ করছি কতিপয় গোষ্ঠী হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে রেখেছে। তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। খুব দ্রুতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তির সহায়তায় আমাদের কাছে সব তথ্য রয়েছে। মেধাবীদের প্রতিষ্ঠান বুয়েট, তাই আমরা কারও বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা বা অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে চাই না। আপনারা (অভিভাবকরা) সন্তানদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে সঠিক পথ দেখান। উসকানিমূলক আচরণ করে জনগণের অর্থে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় অচল রাখার চেষ্টা করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবেন না।’ আন্দোলনে শিক্ষকদের ইন্ধন রয়েছে অভিযোগ করে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা উসকানি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে রেখেছেন। আবার আপনারা বেতনও নিচ্ছেন। এটা কোন নৈতিকতার মধ্যে পড়ে?’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির রাজনৈতিক সুবিধা নিতে এক অভিভাবক উসকানি দিয়ে দেশের শীর্ষমানের এ প্রতিষ্ঠানটিকে অস্থির করে রেখেছেন।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নে উপমন্ত্রী বলেন, ‘অভিযুক্ত অপরাধীরা কারাগারে আটক। তাদের বিচারকাজ চলছে, এ সময় বুয়েট থেকে তাদের স্থায়ী বহিষ্কারের ইস্যু তুলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করছেন। স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য একটি প্রক্রিয়া রয়েছে, এজন্য সময় প্রয়োজন। যেহেতু অপরাধীরা পুলিশের হাতে আটক, এ সময় তাদের স্থায়ী বহিষ্কার মুখ্য বিষয় নয়। এ ইস্যুতে আন্দোলন চাঙ্গা রাখা হবে তা হতে পারে না।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কবে কাটবে এমন প্রশ্নে মহিবুল বলেন, ভিসির পক্ষে-বিপক্ষে শিক্ষকদের দুটি আলাদা অভিযোগ জমা পড়েছে। আমরা প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বুয়েটের আন্দোলনকারীদের দাবি তিনটি হলোÑ আবরার হত্যার চার্জশিটের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের স্থায়ীভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার; আহসানউল্লাহ, তিতুমীর ও সোহরাওয়ার্দী হলের র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় অপরাধীদের মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া এবং সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি ও র‌্যাগের জন্য সুস্পষ্টভাবে ক্যাটাগরি ভাগ করে শাস্তির নীতিমালা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটের অনুমোদন নিয়ে অর্ডিন্যান্সে অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপ নেওয়া। এসব দাবি পূরণে গতকাল দুই সপ্তাহ সময় চেয়েছে বুয়েট প্রশাসন। আন্দোলনকারীরাও জানিয়েছেন, এর মধ্যে দাবি পূরণ হলে ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরবেন তারা। গতকাল দুপুর ২টার দিকে বুয়েট শহীদ মিনারের পাদদেশে এক সংবাদ সম্মেলনে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের ১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী শীর্ষ সংশপ্তক এ তথ্য জানান। এর আগে দুপুর ১টার দিকে আন্দোলনকারীরা উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। আলোচনায় ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান, বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা তিনটি দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান। পরে উপাচার্য ড. সাইফুল দাবিগুলো বিবেচনা করতে তিন সপ্তাহ সময় চান। তবে ডিনরা দুই সপ্তাহের মধ্যেই বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে জানান।

আলোচনা শেষে ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তাদের দাবি পূরণের জন্য আমরা কিছুদিন সময় চেয়েছি। আশা করছি আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের সব দাবি পূরণ করতে পারব।

পলাতক চারজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ রাব্বি হত্যা মামলায় পলাতক চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর হাকিম কায়সারুল ইসলাম মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গ্রহণ করে তাদের বিরুদ্ধে এ পরোয়ানা জারি করেন। গ্রেপ্তার-সংক্রান্ত তামিল প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেছেন আদালত। পলাতক ওই চার আসামি হলেন মোর্শেদুজ্জামান জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মোর্শেদ অমত্য ইসলাম ও মোস্তবা রাফিদ। এদের মধ্যে প্রথম তিনজন এজাহারভুক্ত আসামি।

বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবরার হত্যা মামলায় গত ১৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক ওয়াহিদুজ্জামান। অভিযুক্ত ২৫ জনের মধ্যে এজাহারে নাম রয়েছে ১৯ জনের। এজাহারভুক্ত ১৯ জনের মধ্যে ১৬ জন ও এজাহারবহির্ভূত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গ্রেপ্তার ২১ জন হলেন মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মেহেদী হাসান রবিন, মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মুনতাসির আলম জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, মো. মুজাহিদুর রহমান, মুহতাসিম ফুয়াদ, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মো. আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মাজেদুর রহমান, শামীম বিল্লাহ, মোয়াজ আবু হুরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত, ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, অমিত সাহা, মো. মিজানুর রহমান ওরফে মিজান, শামসুল আরেফিন রাফাত ও এসএম মাহমুদ সেতু।

গত ৬ অক্টোবর রাতে আবরার ফাহাদকে তার শেরেবাংলা হলের কক্ষ থেকে ডেকে নিয়ে যায় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। এরপর রাত ৩টার দিকে শেরেবাংলা হলের নিচ ও দোতলার সিঁড়ির করিডর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা জানান, আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আবরারের বাবা বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করেন।