কবি প্রার্থনা করেছিলেন ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’। এই তো সেদিনও এ দেশে ‘আঠারো’ এসেছিল নেমে। বিরাট দুঃসাহসে রাজপথে উঁকি দিয়ে, বিপদের মুখে অগ্রণী হয়ে, ‘এ বয়স’ নতুন কিছু করেও দেখিয়েছিল। দেশের মানুষও তাই ‘কিশোর বিদ্রোহ’ অভিধা দিয়ে বরণ করে নিয়েছিল, নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের অভূতপূর্ব সেই আন্দোলনকে। গত বছরের ওই ছাত্র-আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে এই মুহূর্তে বহুল আলোচিত নতুন ‘সড়ক পরিবহন আইন’-কে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজপথে ছাত্রছাত্রীদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের মুখেই, আট বছর ধরে আটকে থাকা সড়ক পরিবহন আইন দ্রুত মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছিল। যা এক বছরের কিছু বেশি সময় পর গত ১ নভেম্বর ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ নামে কার্যকর করা হলো। কিন্তু, এ দেশে কাগজে-কলমে আইন-কানুন বদলালেও বাস্তবতা পাল্টায় না। আর আইনের বদলও এমনই যে তা বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য কিনা সেটাও মনে হয় বিবেচনা করা হয় না। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সম্ভবত এই বাস্তবতারই এক বড় দৃষ্টান্ত।
পরিবহন মালিক শ্রমিকদের প্রবল বিরোধিতার মুখে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের ঘোষণায় দেশের পরিবহন খাতে এখন অচলাবস্থা চলছে। একদিকে নতুন আইন প্রয়োগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ ‘বিআরটিএ’ সোমবার থেকে রাজধানীতে অভিযান শুরু করেছে, আরেকদিকে নতুন আইন সংশোধনের দাবিতে ১০ জেলায় বাস চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে রেখেছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। এর বাইরেও অভিযানের ঘোষণায় রাজধানীসহ সারা দেশেই পরিবহন ধর্মঘটের মতো পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ সারা দেশে পরিবহন সংকটে ভয়াবহ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, আইন সংশোধন করা না হলে সর্বাত্মক পরিবহন ধর্মঘটে যাওয়ার হুমকি। দেশে স্মরণকালের রেকর্ড ভেঙে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে নাভিশ্বাসে পড়া গরিব মানুষ এরইমধ্যে চালের দাম বাড়ার আতঙ্কে রয়েছে। চালকল মালিকরা খাদ্যমন্ত্রীকে জানিয়ে দিয়েছেন, চলমান পরিবহন সংকটের কারণে চালের দাম আরও বাড়তে পারে। ফলে, এই হুমকিকে যেমন নতুন পরিবহন আইনের সাপেক্ষে বিবেচনা করতে হবে তেমনি মিলিয়ে দেখতে হবে দেশে চলমান দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সাপেক্ষেও।
আট বছর ধরে ঝুলিয়ে রেখে, গত বছর ছাত্র আন্দোলনের মুখে তড়িঘড়ি করে নতুন পরিবহন আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হলো। কার্যকর করার আগে পেরিয়ে গেল এক বছরেরও বেশি। কিন্তু তারপরও আইন প্রয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রস্তুতি নেই। আইনের কিছু ক্ষেত্রে রয়ে গেছে অনেক অস্পষ্টতা। যানবাহন নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স পরীক্ষার পদ্ধতি, যানবাহনের ফিটনেসের মেয়াদ, গণপরিবহনের রুট পারমিটÑ এই বিষয়গুলো নতুন বিধি তৈরির মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে সেই কাজ এখনো চলছে। নতুন আইনে শাস্তি ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে অত্যধিক হারে। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশের জরিমানা করার যন্ত্রগুলোর সফটওয়্যার সে অনুযায়ী আপডেট করা হয়নি বলেও খবর বেরিয়েছে। নতুন আইন হয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ আগের মতোই আছে। সংস্থাটিকে শক্তিশালী ও দক্ষ করা হয়নি, লোকবল বাড়ানো হয়নি। গাড়ির ফিটনেস, চালকের লাইসেন্স ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো গুণগত পরিবর্তনও আসেনি। নতুন আইন নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা যেমন সন্তুষ্ট নয়, তেমনি জনসাধারণের মধ্যেও এ নিয়ে নেই কোনো সচেতনতা। কেননা, এমন একটি আইন প্রয়োগ শুরুর আগে যে প্রচার-প্রচারণা চালানো প্রয়োজন ছিল সেটাও করা হয়নি।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, সরকার নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরের ঘোষণা দিলেও আইনটির কঠোর প্রয়োগের জন্য আনুষঙ্গিক কোনো প্রস্তুতিই নেয়নি। পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কেবল আইন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর ওপরই নির্ভর করে না। মনে রাখা দরকার, দেশের গণপরিবহন খাতের প্রায় পুরোটাই ব্যক্তিমালিকানার একচেটিয়ায় নিয়ন্ত্রিত হয়। সরকারি পরিবহন সংস্থার অংশীদারত্ব এখানে খুবই সামান্য। অন্যদিকে, অদক্ষতা, পেশাদারিত্বের অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ কেবলই এক ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার। এভাবেই রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী পরিবহন মালিকদের সিন্ডিকেট বছরের পর বছর ধরে সীমাহীন নৈরাজ্য চালিয়ে যাচ্ছে পরিবহন খাতে। একমাত্র মুনাফা ছাড়া, গাড়ির ফিটনেস, চালকের লাইসেন্স কিংবা পরিবহন আইন কোনোকিছুরই তোয়াক্কা করেন না পরিবহন মালিকরা। অতিরিক্ত মুনাফার লোভেই চালক, চালকের সহকারীসহ পরিবহন শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বদলে বেতনভুক্ত করতে রাজি নন মালিকরা। মুনাফায় ন্যূনতম ছাড় দিতে চান না বলেই পরিবহন খাত কিংবা পরিবহন আইনের কোনোরকম সংস্কারেরও বিরোধী মালিকরা। সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হলো, সবরকমের অধিকার বঞ্চিত এই পরিবহন শ্রমিকদেরই মালিকরা ধর্মঘটে ঠেলে দেন এবং দরকষাকষির রাজনীতি করেন। এই পরিস্থিতি দেশের মানুষ বা যাত্রীদের যেমন জিম্মি করে রেখেছে, তেমনি জিম্মি করে রেখেছে পরিবহন শ্রমিকদেরও। মালিকদের একচেটিয়ায় পরিবহন খাতের শাঁখের করাতে জনতা-শ্রমিক দুইই বলি হচ্ছে। দেশের মানুষকে এই জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ কাম্য। গণপরিবহনের শাঁখের করাতে শ্রমিক-জনতা