রাজস্ব আয়ের ৩৬ শতাংশের সমান অর্থ পাচার

দেশের অর্থনীতির অন্যতম সমস্যা বিদেশে অর্থ পাচার। ২০১৫ সালে দেশের মোট রাজস্ব আয়ের ৩৬ শতাংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। এই পাচার বন্ধ হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। জাতিসংঘের বিনিয়োগ বাণিজ্য সংস্থা আঙ্কটাডের রিপোর্টে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) বুধবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে বাংলাদেশ বৈদেশিক সম্পর্ক এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশ বের হয়ে আসার পর সম্ভাব্য ঝুঁকি ও করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন ও সিনিয়র রিসার্স ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের মোট রাজস্ব আয় ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। এর ৩৬ শতাংশের মানে হলো ওই সময়ে দেশ থেকে ৬৫ হাজার ৬০০ হাজার কোটি টাকার বেশি পাচার হয়েছে; যা দিয়ে দুটি পদ্মা সেতু করা যায়। আঙ্কটাডের রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট রাজস্ব আয়ের ৩৬ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পাচার হয়েছে কম্বোডিয়া থেকে। দেশটি থেকে পাচারের পরিমাণ মোট করের ১২০ শতাংশের বেশি। আর সবচেয়ে কম পাচার হয়েছে পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওস; যা ওই দেশের রাজস্বের ১ শতাংশের কম। সাম্প্রতিক সময়ে পাচারের অর্থ এই রিপোর্টে যুক্ত হয়নি।  এ ছাড়া অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় কর আহরণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ওই রিপোর্ট অনুসারে বাংলাদেশের উন্নয়ন মূলত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং কৃষিতে সীমাবদ্ধ।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি সব সময় তিন ধরনের ঘাটতির মধ্যে থাকে। প্রথমত, সঞ্চয় দিয়ে বিনিয়োগে পূর্ণভাবে অর্থায়ন করা যায় না। ফলে বিনিয়োগ সঞ্চয়ের ভেতরে ঘাটতি আছে। দ্বিতীয়ত, সরকার যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে, তার পুরোটাই করের মাধ্যমে আসে না। এ ক্ষেত্রে আর্থিক ঘাটতি থাকে। তৃতীয়ত, বৈদেশিক লেনদেনে ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসে, তা দিয়ে আমদানি ব্যয় মেটানো যায় না। আর তিন ঘাটতি পূরণের জন্য ঋণ নিতে হয়। এর মধ্যে কিছুটা দেশের মধ্য থেকে আবার কিছু বৈদেশিক ঋণ।

সিপিডির সম্মানিত ফেলো বলেন, এক দশকে বাংলাদেশ প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহার করেছে। আর এ ক্ষেত্রে যে দায়দেনা সৃষ্টি হয়েছে, তা এখনো আয়ত্তের মধ্যে আছে। ফলে বাংলাদেশ কোনো দিন বৈদেশিক দায়দেনা পরিশোধে ব্যর্থ হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমান্বয়ে মিশ্র অর্থনীতির দিকে যাচ্ছি আমরা। একদিকে বৈদেশিক অনুদান নেওয়া হচ্ছে, অপরদিকে ঋণও বাড়ছে। কিন্তু অনুদানের চেয়ে ঋণ অত্যন্ত বেশি। ফলে দায়দেনা ও দেনা পরিশোধের হার দুটিই বাড়ছে।

তিনি বলেন, দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩৭ শতাংশ বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। আবার এই ৩৭ শতাংশের ৪৭ শতাংশ সামাজিক খাতে এবং ৪৪ শতাংশ আর্থিক অবকাঠামো খাতে ব্যবহার হচ্ছে। এর মানে হলো উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য অংশই বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে মধ্যম আয়ের দেশ ও স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে চলে আসার পর বৈদেশিক সহায়তার কী প্রভাব ফেলবে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পৃথিবীর বহু দেশ আছে, এ রকম পরিস্থিতিতে তার দায়দেনার হার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, অর্থনীতির কাঠামো শক্তিশালী করতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কর আহরণের বিকল্প নেই। কারণ আমাদের রাজস্ব আয় না বাড়লে বিদেশি দাতাগোষ্ঠীও টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ দেখাবে না। মধ্যম আয় এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা চলে এলে যেসব বৈদেশিক সহায়তা কমবে, তা পূরণের জন্য বিকল্প কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা ভাবতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের যে রপ্তানি আয় হয়, তা বাজারসুবিধার ওপর নির্ভরশীল। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে এলে বিভিন্ন দেশে যে বাজারসুবিধা (জিএসপি) পাওয়া যায়, তা বন্ধ হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কী করা যায়, তা ভাবতে হবে। পাশাপাশি স্বল্পোন্নত দেশে থাকাকালীন যে প্রযুক্তি সুবিধা পাওয়া যেত, বন্ধ হলে কী করণীয়, সেটি অবশ্যই ভাবতে হবে। ড. দেবপ্রিয় বলেন, এই সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত জরুরি। অর্থাৎ পরিষদ যদি সিদ্ধান্ত নেয়, আমরা আগের মতো সহায়তা অব্যাহত রাখব। তবে কেবল সমস্যার সহজ সমাধান সম্ভব।