নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি বিক্রীত এমন অন্তত ১০ রকমের ওষুধের দাম গত এক মাসে ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে দেশে উৎপাদিত অ্যাসিডিটির রেনিটিডিন জাতীয় সব ধরনের ওষুধ নিষিদ্ধ হওয়ার পর কোম্পানিগুলো ‘অ্যান্টি আলসারেন্ট’ গোত্রের সব ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সে সুযোগে প্রতিদিন ঘরে ঘরে ব্যবহার হয় এমন সাধারণ কিছু ওষুধের দামও বেড়ে গেছে।
এর ফলে বেশ ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা। গত সোমবার শাহবাগে ওষুধ কিনতে আসা বড় মগবাজারের বাসিন্দা আবদুল ওয়াহাব দেশ রূপান্তরকে জানান, তার মা ও স্ত্রীর প্রায় প্রতিদিনই গ্যাস্ট্রিক ও উচ্চ রক্তচাপের ট্যাবলেট লাগে। বাচ্চার ঠা-ার জন্য সিরাপ কিনতে হয়। আগে যেখানে এসব ওষুধ ৫০০-৬০০ টাকায় কিনতে পারতেন, এখন তা হাজারে পৌঁছেছে। তিনি দুঃখ করে বলেন, বাজারে সব জিনিসের দাম চড়া। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর ওষুধের দামও কিছুদিন পরপরই বাড়ছে। সরকারের উচিত এদিকটা নজর দেওয়া।
কেন দাম বাড়ছেÑ জানতে চাইলে একটি নামকরা ওষুধ কোম্পানির এক বিক্রয় প্রতিনিধি কোম্পানির পাঠানো দাম বৃদ্ধি
সংবলিত একটি নোটিস দেশ রূপান্তরকে দেখান। সেখানে বলা হয়েছে, উল্লিখিত ওষুধগুলোর দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এখন থেকে নির্ধারিত বর্ধিত দামেই বিক্রি করতে হবে। নোটিসে আরও বলা হয়েছে, ওষুধের বাক্সের গায়ে নতুন দামের সিল মারতে হবে এবং পুরনো দাম রাখা যাবে না। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসকদেরও বিষয়টি অবহিত করতে বলা হয়েছে।
কেন এই দাম বৃদ্ধি জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শীর্ষ ওষুধ কোম্পানির এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাধারণত বিশ্ববাজারে ওষুধের কাঁচামালের দাম ও দেশে প্যাকেজিং খরচ বাড়লে সে অনুপাতে ওষুধের দাম সমন্বয় করা হয়। এর ফলে ওষুধের দাম কিছুটা বেড়ে যায়। এবারও তাই হয়েছে। তবে সব ওষুধের দাম বাড়েনি।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ডা. মাহবুবুর রহমান দেশের বাইরে থাকায় এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এ নিয়ে কথা বলতে চাননি এক পরিচালক। আরেক পরিচালক ফোন ধরেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১১৭টি জেনেরিক ওষুধ বাদে অন্যগুলোর ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসনের কিছু করার নেই। এগুলো কোম্পানি আমাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করে। সরকারি মূল্য কমিটির প্রধান স্বাস্থ্য সচিব। তারা দেখেন। তবে এ কথা ঠিক যে, বিশ্বের বাজারে ওষুধের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। যেমন উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের জন্য ওলমিসাটেল নামে যে কাঁচামাল লাগে, সেটার দাম তিনগুণ বেড়ে গেছে। এছাড়া চীনের অনেক কাঁচামাল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের এখানে যে ওষুধ উৎপাদন হয় তার ৮০ শতাংশ কাঁচামালই আসে চীন ও ভারত থেকে। বাকি অন্য দেশ থেকে। তারপরও আমরা ওষুধ কোম্পানিগুলোকে দাম সহনীয় মাত্রায় রাখতে বলি। অতিরিক্ত দাম যেন তারা না রাখে সে বিষয়ে পরামর্শ দিই।’
একই কথা বলেন ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব শফিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে চীনে প্রায় শখানেক ফ্যাক্টরি বন্ধ। পরিবেশ রক্ষায় দেশটির সরকার সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে কাঁচামালের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এর কারণেও ওষুধের দাম বাড়তে পারে।’
তবে ওষুধ কোম্পানিগুলোর এমন যুক্তির সঙ্গে একমত নন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা। এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখনো দেশে চিকিৎসার জন্য মানুষকে ৬৭ শতাংশ ব্যয় করতে হচ্ছে নিজের পকেট থেকে। তার ওপর এভাবে ওষুধের দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের খুবই কষ্ট হয়। বিশেষ করে গরিব রোগীরা বিপাকে পড়ে। ফলে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে সরকারের নজরদারি বাড়াতে হবে। এজন্য ওষুধ নীতিমালা বাস্তবায়ন ও দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে নজর দিতে হবে।’
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘চলতি বছর ক্যানসারসহ কয়েকটি রোগের প্রতিষেধকের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কহার কমানো হয়েছে। এরপরও বাজারে প্রতিটি কোম্পানির ওষুধের দাম হঠাৎ বাড়ানো হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো ওষুধের দাম গত এক বছরে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এটা হতে পারে না। কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত মুনাফা করতে নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়িয়ে দেয়।’
রাজধানীর শাহবাগ ও মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে এবং ওষুধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণ কিছু ওষুধ যেগুলো সব ঘরেই মানুষ প্রায় প্রতিদিনই সেবন করে, এমন কিছু ওষুধের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাসিডিটি, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, ডায়রিয়া, শিশুদের ভিটামিন, অগ্নিদগ্ধ রোগীদের ব্যবহৃত মলম, কোলেস্টেরল, ব্যথানাশক, শিশুদের জ্বর ও ঠান্ডার সিরাপ এবং শ্বাসকষ্ট লাঘবে ইনহেলার।
মালিবাগের শহীদ সেলিনা পারভীন সড়কের মেডিসিন কর্নারের বিক্রেতা আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, গত দুই-তিন মাস ধরেই সাধারণ ওষুধের দাম বাড়ছে। কোনো কোনো ওষুধের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বেশি বেড়েছে বড় কোম্পানির ওষুধ। এর মধ্যে অ্যাসিডিটির ৫ টাকার সেকলো ক্যাপসুল এখন ৬ টাকা, ৫ টাকার ম্যাক্সপো ট্যাবলেট ৭ টাকা ও র্যাব ট্যাবলেট ২ টাকা বেড়ে ৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উচ্চ রক্তচাপের অ্যাবিক্যাব ট্যাবলেট ৮ থেকে ১১ টাকা, ১০ টাকার অ্যামলোকার্ড ও বাইজোরান প্রতি পিস ১২ টাকা হয়েছে। আবদুল্লাহ আরও বলেন, দাম বাড়লে আমাদের মেসেজ পাঠানো হয়। ওষুধের বাক্সের গায়ে বর্তমান দাম লেখা থাকে। ওষুধ কোম্পানির লোকের দাম বাড়ার কারণ বলেন না।
মিটফোর্ডের ওষুধ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রেনিটিডিন নিষিদ্ধ হওয়ায় অ্যাসিডিটির পিপিআই (প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর) গোত্রের ওমিপ্রাজল, র্যাবিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল, ল্যানসোপ্রাজল জাতীয় ওষুধের দাম বেড়ে গেছে। সব কোম্পানিই তাদের এসব ওষুধের দাম ট্যাবলেট-ক্যাপসুলপ্রতি ২ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা ওষুধের দাম বাড়ার তথ্য জানিয়েছেন। তাদের তথ্যমতে, ডায়রিয়া উপশমে ব্যবহৃত হেপাক্সিমিন জাতীয় ট্যাবলেট ২ টাকা বেড়ে ২২ টাকা হয়েছে। কিডনি রোগীদের ইউরিন ইনফেকশন লাঘবে ব্যবহৃত প্রতি ট্যাবলেটের দাম ১০ টাকা বেড়ে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৯৫-২০০ টাকার ইনহেলার কোম্পানিভেদে ২২০-২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাইন সিস গোত্রের শিশুদের ভিটামিন সিরাপ বোতলপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে ৯০ টাকা হয়েছে। উচ্চ রক্তচাপের ডুয়োব্লোক জাতীয় ট্যাবলেট ৮ টাকা থেকে বেড়ে ১০ টাকা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একটি কোম্পানির অ্যাসিডিটির প্রতি পিস ‘ফিনিক্স’ ট্যাবলেট দুই সপ্তাহ আগেও ৫ টাকায় বিক্রি হতো। এখন সেটি ৭ টাকা। আরেক কোম্পানির একই ওষুধ এক পাতায় ১০টি অ্যাসিফিক্স ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০, বাইজোরান ৫/২০ নামে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ ১০ টাকা মূল্যের প্রতি পিস ১২ ও বাইজোরান ৫/৪০ ১৫ টাকার পরিবর্তে ১৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে ৫ টাকার রেডিপ্লাজল-২০ ৭ টাকা, ১৫০ টাকা মূল্যের একপাতা মোনাস-১০ ১৬০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। পাড়া-মহল্লার ফার্মেসিগুলোতে উচ্চ রক্তচাপের সিরাপ ক্যামলোসার্ট ৮০ থেকে ১২০ টাকা ও শিশুদের ঠা-া-জ¦রের ১৪ টাকার নাপা ড্রপ ২০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রয় প্রতিনিধি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এসব ওষুধের দাম সব কোম্পানিই বাড়িয়েছে। দুই-তিন মাস আগে থেকেই বাড়ছে। গত ১৫ দিন আগেও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অ্যাসিডিটির অ্যান্টি আলসারেন্ট ও উচ্চ রক্তচাপের হাইপার টেনসিভ জাতীয় ওষুধ। এ দুটি ওষুধ খুব চলে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ২৬৯টি ওষুধ কোম্পানি ২৪ হাজার ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে। এর বাইরে সরকারিভাবে উৎপাদিত হচ্ছে ১১৭ ধরনের ওষুধ। ওষুধ প্রশাসন শুধু সরকারিভাবে উৎপাদিত ওষুধের মূল্য নির্ধারণ দেয়। এর বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো আলোচনা সাপেক্ষে নিজেদের ওষুধের দাম নির্ধারণ করে। অধিদপ্তরের কাছ থেকে কোম্পানিগুলো নিজেদের চাহিদামতো দাম বৃদ্ধির অনুমতি নিয়ে রাখে। পরে সুবিধামতো সময়ে তারা বাজারে বাড়তি দামে ওষুধ ছাড়ে।