সারা দেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাস প্রতিরোধে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষায়িত ‘অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট’ গঠন করেছে সরকার। সন্ত্রাসী কার্যদমনে নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও বিন্যাসের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্তৃক সৃষ্ট ঝুঁকি পর্যালোচনার পর সরকারের কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন, সময় সময় বিশেষ প্রতিবেদন দাখিল করা, জিম্মি সংকট মোকাবিলা ও সংকট সমঝোতা কার্যক্রম পরিচালনা করাসহ নয়টি কার্যাবলি থাকছে পুলিশের এ নতুন ইউনিটিতে। গত মঙ্গলবার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী এ বিধিমালা জারি করেছেন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট বিধিমালা ২০১৯ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ইউনিটের বিধি চূড়ান্ত হওয়ায় বাংলাদেশ পুুলিশের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। তিনি আরও বলেন, এ সংক্রান্ত কোনো বিধিমালা না থাকায় ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালনা করতে নানা সমস্যা হচ্ছিল। এখন থেকে ইউনিটের প্রতিটি সদস্য কাজে উৎসাহ পাবেন। এমনকি অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত করতে পারবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের যেকোনো স্থানে নিজের ক্ষমতাবলে অপারেশন চালানো, গ্রেপ্তার ও তদন্তকাজ পরিচালনা করতে পারবে পুলিশের বিশেষায়িত এ ইউনিট। আপাতত ইউনিটের সদর দপ্তর থাকছে ঢাকায়। পরবর্তী সময়ে দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে এর একটি করে আঞ্চলিক ইউনিট গঠন করা হবে। জঙ্গি সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি কোরআন ও হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পথভ্রষ্টদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাসহ একাধিক বিষয় নিয়ে কাজ করবে ইউনিট। ইতিমধ্যে ৫৮১ জনবল নিয়োগের অনুমোদন পেয়েছে বিশেষায়িত এ ইউনিটটি। ইউনিটের প্রধান হলেন অতিরিক্ত আইজিপি মো. আবুল কাশেম। এছাড়া এ ইউনিটের ডিআইজি দিদার আহমেদ, অ্যাডিশনাল ডিআইজি মনিরুজ্জামান, হারুন অর রশীদ এছাড়া নয়জন পুলিশ সুপার দায়িত্ব পালন করছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছাড়াও এ ইউনিটের মোট জনবল হচ্ছে ৫৫৩ জন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে বারিধারায় সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ে বহুতল বিশিষ্ট একটি ভাড়া বাড়িতে ইউনিটের সদর দপ্তরের কার্যক্রম চললেও স্থায়ী ভবনের জন্য ঢাকার পূর্বাচলে ১০ কাঠার জমির জন্য আবেদন করা হয়েছে। পূর্বাচলে পুলিশ লাইনের জন্য জায়গা বরাদ্দ করেছে সরকার। সেখানেই হয়তো স্থায়ী ভবনের কাজ শুরু হতে পারে। তবে এতে সময় লাগবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নতুন এ ইউনিটের জন্য কয়েকটি লোগো পাঠানো হয়েছে। বলা হয়েছেÑ সুন্দরবন হচ্ছে আমাদের ম্যানগ্রোভ, আমরা চাই লোগোতে সুন্দরবন, সুন্দরবনের ঐতিহ্য গোলপাতা, আমাদের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মুখ ও পুলিশের লোগোতে ব্যবহার হওয়া নৌকা প্রতীক থাকুক। আশা করি অল্প সময়ের মধ্যে লোগো চূড়ান্ত করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি জঙ্গিবিরোধী বড় বড় অভিযান চালিয়ে সফলতা দেখিয়েছে ইউনিটটি। ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৬টি জিপ, দুটি সোয়াট ভ্যান, আটটি ডাবল কেবিন পিকআপ, একটি অ্যাম্বুলেন্স, একটি ট্রাক, একটি আর্মড পারসোনাল ক্যারিয়ার (এপিসি), একটি প্রিজন ভ্যান, একটি ওয়াটার ট্রেইলার ও ১০টি মোটরসাইকেল দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আগামী বছরের শুরুতে যানবাহন ও জনবল আরও বাড়ানো হবে।
জারি করা বিধিমালায় বলা হয়েছে, উগ্রবাদ, সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ অর্থায়নে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা, অনুসন্ধান ও এ সংক্রান্ত হওয়া মামলা তদন্ত করবে, মৌলবাদীদের প্রতিরোধ ও তাদের নিষ্ক্রিয় করাসহ সন্ত্রাসী কার্যপ্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করা, যারা সহিংসতা ছড়ায় তাদের দমন করতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিদ্যমান আইন ও বিধি বিধানের অধীনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত বা সংস্থার সহায়তায় উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসীদের ওপর প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা নজরদারি, তাদের অবস্থান শনাক্তকরণ ও ওই কার্যপ্রতিরোধসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আটকের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, জিম্মি সংকট মোকাবিলা ও সমঝোতা কার্যক্রম পরিচালনা করা, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী কার্যের হুমকি মোকাবিলা ও তার সম্ভাব্য প্রতিকারের উদ্দেশ্য আইজিপির নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় করা, উগ্র ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের কারণ ও প্রতিকার সংক্রান্ত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা, সন্ত্রাস দমনে নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও বিন্যাসের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্তৃক তৈরি ঝুঁকি পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল ও সময় সময় বিশেষ প্রতিবেদন করা, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের উদ্দেশ্য পূরণ করে সন্ত্রাসী কার্যদমন, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
বিশেষায়িত টিম বা স্কোয়াড গঠন : বিধিমালায় বলা হয়েছে ইউনিটপ্রধান ও সদস্যদের সমন্বয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনার জন্য উপযুক্ত সাজ-সরঞ্জামসহ দক্ষ সোয়াত টিম, ক্রাইম সিন ইনভেস্টিগেশন টিম, বোম্ব বিস্ফোরণ ইনভেস্টিগেশন টিম, ক্রাইসিস ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম, এক্সপ্লোসিভ ডিসপোজাল টিম এবং কেনাইন স্কোয়াডসহ (ডগ স্কোয়াড) প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিশেষায়িত টিম ও স্কোয়াড গঠন করতে পারবে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট।
মামলার তদন্ত পরিচালনা করা : ইউনিট, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অপরাধ এবং ওই অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা তদন্ত করতে পারবে। কোনো ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইউনিটের কাছে কার্যালয়কে ওই ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে, থানায় মামলা হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওসি প্রাথমিক তথ্য ইউনিটকে অবহিত করবেন, মামলার তদন্তের পর আসামি গ্রেপ্তার করাসহ আইনানুগ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। ইউনিট কোনো মামলার তদন্ত কার্যক্রম শুরু করলে আইজিপির লিখিত অনুমোদন ছাড়া অন্য কোনো সংস্থায় ওই মামলা হস্তান্তর করতে পারবে না।
ইউনিট কর্মকর্তাদের ক্ষমতা : ইউনিটের সাব-ইন্সপেক্টর ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি, পুুলিশ আইন অনুযায়ী থানার ওসিদের মতো গ্রেপ্তার, আটক, তল্লাশি ও জব্দসহ অন্যান্য ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।
ইউনিট কার্যক্রমে পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপারের দায়িত্ব : অভিযান পরিচালনা, অনুসন্ধান ও মামলার তদন্তের ক্ষেত্রে ইউনিটের চাহিদা অনুযায়ী জনবল, অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য লজিস্টিকসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ইউনিটকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
অন্যান্য সংস্থা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা : ইউনিটে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের সুবিধার জন্য স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন, নির্বাচন কমিশন, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, পাসপোর্ট ও বহির্গমন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে।
গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সেল এবং ডেটাবেজ সেন্টার : ইউনিটে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের দক্ষ ও চৌকস হিসেবে গড়ে তুলতে নিজস্ব গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সেল গঠন এবং ডেটাবেজ সেন্টার স্থাপন করতে পারবে। তাছাড়া লিগ্যাল সেল, সাধারণ ডায়েরি, পরিদর্শন বই সংরক্ষণ, রেকর্ডপত্র ও ডেটাবেজ সংরক্ষণ করতে পারবে।