দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চারবারের নির্বাচিত সভাপতি মাহবুবুল আলম। ভোগ্যপণ্য আমদানিতে দেশের অন্যতম নেতৃস্থানীয় এই ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। এছাড়া তিনি এখন সার্ক চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসংশ্লিষ্ট বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) ট্রাস্টি চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটির গভর্নিং বোর্ডের সদস্য, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ-এর পরিচালক, বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের এক্সিকিউটিভ বোর্ড মেম্বার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা মাহবুবুল আলম বেশ কয়েকটি ব্যবসায়িক উদ্যোগের প্রধান উদ্যোক্তা। বহুল আলোচিত পেঁয়াজ সংকট নিয়ে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে নিজস্ব অভিমত তুলে ধরেছেন মাহবুবুল আলম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক শামসুল ইসলাম
দেশ রূপান্তর : দেশে বর্তমানে পেঁয়াজ নিয়ে যে সংকট চলছে তার কারণ কী?
মাহবুবুল আলম : আমাদের দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজের চাহিদা রয়েছে সে পরিমাণ দেশীয় উৎপাদন নেই। আমাদের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন দিয়ে মেটানো হলেও অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ পেঁয়াজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ভৌগোলিক সুবিধা, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সহজলভ্যতার কারণে এই পেঁয়াজ আমদানির জন্য আমরা অনেকটাই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। আমদানিকৃত পেঁয়াজের সিংহভাগই আসে ভারত থেকে। হঠাৎ করে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরের শেষে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত। এর ফলে আমাদের দেশে পেঁয়াজের সরবরাহ বড় ধরনের ধাক্কা খায়। বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করার পর সেখানকার রপ্তানিকারকরাও পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে আমাদের দেশে পেঁয়াজের বাজারে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এটিই হচ্ছে বাস্তবতা।
দেশ রূপান্তর : মিসর, চীন, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির পরও পেঁয়াজের বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে না কেন?
মাহবুবুল আলম : ভারতের বিকল্প হিসেবে আমদানিকারকরা মিয়ানমারের পাশাপাশি মিসর, তুরস্ক, চীন ইত্যাদি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য ঋণপত্র খুললেও তা জাহাজ লোড করে সমুদ্রপথে দেশে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। তাছাড়া পচনশীল হওয়ার কারণে বিদেশ থেকে পেঁয়াজ হিমায়িত ব্যবস্থায় আনতে হয়। অন্যথায় আসার পথেই অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। এখানেও তাই হয়েছে। মিয়ানমার থেকে যে পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে তার মধ্যে অনেক পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। তাছাড়া আগে ভারত থেকে সড়কপথে দৈনিক ১৫০ ট্রাক থেকে ২০০ ট্রাক পেঁয়াজ বাংলাদেশে আসত। কিন্তু মিয়ানমার কিংবা অন্য দেশ থেকে সেই পরিমাণ পেঁয়াজ সরবরাহ পাওয়া যায়নি। মিয়ানমার থেকে টেকনাফ দিয়ে কিছু পেঁয়াজ এলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। আর সংকটকালীন অন্যান্য দেশ থেকে এ পর্যন্ত যে পেঁয়াজ এসেছে তাও খুব বেশি নয়। যে কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পেঁয়াজের সরবরাহে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
দেশ রূপান্তর : পেঁয়াজ নিয়ে এ পরিস্থিতির কীভাবে সৃষ্টি হলোÑ সরকারের অদূরদর্শিতায় নাকি সিন্ডিকেটের কারসাজিতে?
মাহবুবুল আলম : ভারত থেকে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের বিষয়টি কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে হয়েছে। যে কারণে ব্যবসায়ী কিংবা সরকার কেউই সম্ভাব্য পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে আঁচ করতে পারেনি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। যদি আগে থেকে জানা থাকত যে, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেবে। তাহলে ব্যবসায়ীরা সময় নিয়ে এর বিকল্প মার্কেট খুঁজতে পারত। আর তখন এই সংকট সৃষ্টি হতো না। তবে, এখানে কিছু কৃত্রিম সংকট যে হয়নি এটা আমি বলব না। ৩০ টাকা কেজির পেঁয়াজ আড়াইশ টাকা করার পেছনে কিছু অসাধু লোক নিশ্চয়ই জড়িত ছিল। আমদানি পর্যায়ে যে খরচ পড়ে তার সঙ্গে যৌক্তিক লাভের অংশটা যোগ করে পেঁয়াজ বিক্রি করলে এতটা নেতিবাচক পরিস্থিতি হতো না। দেখা গেছে, জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট যখনই বাজারে অভিযান চালাতে গিয়েছেন তখনই আমদানি মূল্যের মধ্যে বাজার মূল্যের ব্যাপক তারতম্য পেয়েছেন।
দেশ রূপান্তর : চলমান পেঁয়াজ সংকটে ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন হিসেবে এক্ষেত্রে চট্টগ্রাম চেম্বারের ভূমিকা কী ছিল?
মাহবুবুল আলম : চট্টগ্রাম চেম্বার সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করে থাকে। ভারত থেকে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার পরপরই বিকল্প দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য আমরা চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলাম। গত ১ অক্টোবর চিটাগাং চেম্বার সভাপতি হিসেবে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে আমি বলেছি, পূর্বের আমদানিকৃত পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির কোনো যুক্তি নেই। তাছাড়া কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা করা হলে তাতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে তেমনি সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। এ প্রেক্ষাপটে দেশের জনগণের কথা বিবেচনা করে পেঁয়াজের দর সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রতি চেম্বারের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া পেঁয়াজের দামের ঊর্ধ্বগতি রোধে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত যখনই যেখানে অভিযানে গেছে আমরা তাদের সহযোগিতা দিয়েছি।
দেশ রূপান্তর : কবে নাগাদ পেঁয়াজের বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে পারে?
মাহবুবুল আলম : আপনারা নিশ্চয়ই জেনেছেন, পেঁয়াজের বিষয়টিকে সরকারও বিশেষ গুরুত্ব সহকারে দেখছে। সরকারের অনুরোধে দেশের বেশ কয়েকটি শিল্প গ্রুপসহ নতুন নতুন আমদানিকারকরা পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। মিসর, তুরস্ক, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এসব পেঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া চলছে। সমুদ্রপথ ছাড়াও আকাশপথেও এ পেঁয়াজ আনা হচ্ছে। কোনো কোনো আমদানিকারকের পেঁয়াজ ইতিমধ্যে দেশে আসা শুরু করেছে। পাশাপাশি ডিসেম্বরে আমাদের দেশি পেঁয়াজ উঠতে শুরু করবে। দেশি পেঁয়াজ বাজারে চলে এলে ঘাটতি পরোপুরি মিটে যাবে। দেশে পেঁয়াজের দাম যে আকাশছোঁয়া হয়ে গিয়েছিল তা ইতিমধ্যে কমতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে আশা করা যায় আগামী পনের দিনের মধ্যে এখানে পেঁয়াজের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
দেশ রূপান্তর : পেঁয়াজ ছাড়াও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামও দেখা যায় হঠাৎ করে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। এজন্য এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর কারসাজিকে দায়ী করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
মাহবুবুল আলম : দেখুন, পণ্যের দাম ওঠানামা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি পেলে তার একটা প্রভাব সাধারণ বাজারে পড়ে। তা ছাড়া পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি থাকলে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। তবে সবক্ষেত্রে পণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে একটা যৌক্তিকতা থাকতে হবে। তাই আমি মনে করি, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্যগুলোর চাহিদা ও মজুদ নির্ধারণে প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর মনিটরিং হওয়া প্রয়োজন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধির সমন্বয়ে এ বিষয়ে মনিটরিং সেল থাকা প্রয়োজন। নিয়মিত মনিটরিং থাকলে কখন কোন পণ্যের কী চাহিদা তা আগে থেকে নিরূপণ করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বাজারে সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ নিয়ে কেউ যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর মনিটরিং থাকতে হবে। এ ধরনের কৃত্রিম সংকটকারীদের আমি ব্যবসায়ী হিসেবে আখ্যায়িত করতে চাই না। এরা অসাধু লোক। আমি মনে করি, এ ধরনের লোকদের কঠোর হস্তে দমন করা উচিত।
দেশ রূপান্তর : চলমান পেঁয়াজ সংকটে চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন?
মাহবুবুল আলম : এই সংকটকালে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনসহ অন্য সংস্থাগুলো শুরু থেকেই বাজার পরিস্থিতি নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা হিসেবে পেঁয়াজের আড়তে দফায় দফায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ব্যবসায়ীদের বারবার সতর্ক করেছেন। অনেককে জরিমানাও করেছেন। এক কথায় তারাও পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিজেদের মতো চেষ্টা করে গেছেন।
দেশ রূপান্তর : পেঁয়াজ নিয়ে এ সংকটের দায় নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেনÑ আপনি কি এর সঙ্গে একমত?
মাহবুবুল আলম : এখানে তো বাণিজ্যমন্ত্রীর কোনো ব্যর্থতা আমি দেখছি না। পেঁয়াজ সংকট নিরসনে তার প্রচেষ্টা কিংবা আন্তরিকতার কোনো অভাব আমি দেখিনি। আমি আগেও বলেছি, এটা পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের বিষয়। যে কোনো পণ্যের চাহিদার ও সরবরাহে অবশ্যই সমন্বয় থাকতে হবে। যদি এ দু’য়ের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি হয় তখন এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এখানেও ভারত থেকে পেঁয়াজ আসা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি সৃষ্টি হয়। ফলে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
মাহবুবুল আলম : দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।