ইসলামে নগর নিরাপত্তার গুরুত্ব

কোরআনে কারিমের সুরা ইবরাহিমের ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘যখন ইবরাহিম বললেন, হে পালনকর্তা! এ শহরকে শান্তিময় ও নিরাপদ করে দিন।’ আল্লাহতায়ালার কাছে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর এই দোয়ায় রয়েছে শিক্ষণীয় অনেক বিষয়। দোয়ায় তিনি মক্কাকে নিরাপদ করার আর্জি জানিয়েছেন। তিনি শুধু নিজ পরিবার কিংবা আত্মীয়-স্বজনের নিরাপত্তা কামনা করেননি। স্থান, কাল, পাত্র ও জাতিভেদে পুরো শহরের জন্য কল্যাণ প্রার্থনা করেছেন। এটা ইসলামের বিশ্বজনীন রূপের প্রকাশ। আমরা জানি, একটি শহরে বিভিন্ন ধর্মের লোক বাস করে, তা সত্ত্বেও তিনি পুরো শহরের জন্য দোয়া করেছেন। কারণ, যেকোনো শহরের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের প্রথম শর্ত হলোÑ নিরাপত্তা আর শান্তি। দোয়ায় সেটাই কামনা করা হয়েছে।

 

নগর, নগরায়ণ শব্দগুলোর সঙ্গে আমরা খুবই পরিচিত। কোরআনে কারিমে নগর অর্থে মিসর ৫ বার, মদিনা ১৭ বার এবং বালাদ ১৯ বার এসেছে। এছাড়া নগর অর্থবোধক আরও অনেক শব্দ উদ্ধৃত হয়েছে পরোক্ষভাবে। যেমন, দ্বার বা বাড়ি, মায়াদ তথা প্রত্যাবর্তন স্থল, মুদখাল তথা প্রবেশস্থল, মুখরাজ তথা বহির্গমন স্থান ও বাইত তথা ঘর প্রভৃতি। কোরআনে কারিমের সুরা বালাদ (নগর সুরা), রুম (রোম নগর-জাতি সুরা) ও হিজর (হিজর নগর সুরা) নামক তিনটি সুরা নগরের গুরুত্ব বোঝাতে উল্লেখের দাবিদার। আরবি ভাষায় কারইয়া শব্দ পল্লী ও নগর উভয় অর্থেই আসে। কোরআনে কারিমে এ শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে ৫৭ বার। সিংহভাগ ক্ষেত্রে তা নগর অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। নগরায়ণ, নগর সভ্যতা ও নগর পরিকল্পনার মূল চেতনা প্রকৃতিগতভাবে ইসলামে বিদ্যমান। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন ভূমি থেকে এবং তোমাদের বসবাস করিয়েছেন তাতে।’ Ñসুরা হুদ: ৬১। আয়াতে বর্ণিত আরবি ‘ইসতিমার’ শব্দের অর্থ ‘বসবাস করানো’। এ অর্থ প্রসঙ্গে আল্লামা কুরতুবি (রহ.) বলেছেন, ‘এর অর্থ মানুষের জন্য অট্টালিকা ও বাসগৃহের ব্যবস্থা করা।’ নাগরিকদের দিক-দিগন্তে সুষ্ঠুভাবে চলাচল, জীবনোপকরণ আহরণ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাসের উদ্দেশে আল্লাহতায়ালা জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিই তোমাদের জন্য জমিনকে সুগম করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা দিক-দিগন্তে বিচরণ করো এবং তার প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে আহার্য গ্রহণ করো, পুনরুত্থান তো তারই কাছে।’ -সুরা মূলক: ৯৫। আল্লাহতায়ালা প্রেরিত সব নবী-রাসুলদের সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন নিজ নিজ উম্মতের জন্য প্রয়োজনীয় আবাসন ও সুষ্ঠু, সুন্দর গৃহায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে। কোরআনে কারিমের ভাষায়, ‘আমি মুসা ও তার ভাইকে প্রত্যাদেশ করলাম, তোমরা মিসরে তোমাদের কওমের জন্য গৃহায়নের ব্যবস্থা করো এবং তোমরা তোমাদের ঘরগুলো কেবলামুখী করো, নামাজ কায়েম করো এবং মুমিনদের সুসংবাদ প্রদান করো।’ -সুরা ইউনুস: ৮৭

 

আধুনিক প্রযুক্তি আর আবিষ্কারের ফলে নগর জীবনে মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ এখন শহরমুখী। শহরে হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় অনেক সেবা। শহরের সব উপকরণ মানবসেবায় নিয়োজিত। তারপরও কোথায় যেন একটু ঘাটতি অনুভূত হয়। এ জন্য বিশেষভাবে দায়ী কিছু মানুষের হীন মনমানসিকতা। কারণ, তারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়। তাই তো দেখা যায়, বাসাবাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে অনেক ক্ষেত্রে অন্যের কোনো কষ্ট হচ্ছে কি না তা দেখার অবকাশ মেলে না। সাধারণ জনগণের ব্যবহারের জন্য নির্মিত রাস্তা বা ফুটপাতে অনায়াসে গাড়ি পার্ক করে রাখা হচ্ছে, নির্মাণসামগ্রী দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রাখার ফলে অনভিপ্রেত দুর্ঘটনা ও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। নিষেধ করা সত্ত্বেও পলিথিন ভরে বাড়ির সব ময়লা ড্রেনে ফেলে ড্রেন বন্ধ করে দিচ্ছি আমরাই। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলে পানি রাস্তায় উঠে আসছে। বাড়ি নির্মাণের সময় প্ল্যান যেভাবে পাস করা হয়েছে, সেভাবে সে রকম কাজ করছি না। চারদিকে যতটুকু ছাড় দেওয়ার কথা তা কোনোভাবেই মানা হচ্ছে না। ফলে একটি বিল্ডিং অন্য বিল্ডিংয়ের সঙ্গে এমনভাবে গড়ে উঠছে, স্বাভাবিক আলো-বাতাস তো দূরের কথা, নানাবিধ দুর্ঘটনায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছি আমরা। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি নগর জীবনের অন্যতম উপাদান। কিন্তু এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে সীমাহীন দায়িত্বহীনতা সবাইকে ভোগান্তিতে ফেলে দিচ্ছে। পানির অপচয় করছি, সারা দিন গ্যাসের অপচয় করছি, অপরিমিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করছি। অনেকে তো একটি দিয়াশলাইয়ের কাঠি সাশ্রয়ের জন্য ২৪ ঘণ্টা গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখছে। আমরা মনে করি, সামাজিক বন্ধন শিথিল ও নৈতিকতার মানদ- নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বিষময় হয়ে উঠছে নগর জীবন। এর পেছনে কিছু মানুষের খামখেয়ালিপনা, অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতা প্রবলভাবে দায়ী- যা আবশ্যিকভাবে পরিত্যাজ্য।

 

লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক