লাল বল হাতে ধেয়ে আসছে বোলার, সাদা ট্রাউজার, ধবধবে জামা আর ক্যাপ পরা ব্যাটসম্যান। বলটা পিচে পড়ে ত্বরিতগতিতে ধাবমান হওয়ার পর ততোধিক বেগে ব্যাটে লেগে সীমানা পার। নিখুঁত স্টান্সে দাঁড়ানো কেতাবি শটটা খেলার সময় ব্যাট আর বলের যে আওয়াজ, সেটি বিস্মিত দর্শকের কেবল চোখ আর মন নয় কানে লহরী বইয়ে দিল। এই আওয়াজের সঙ্গে, এই পরিবেশের সঙ্গে কেবল যেন ওস্তাদি গানেরই তুলনা চলে। এই পরিবেশ যেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের এক আসর, যেখানে ওস্তাদেরা নানা তাল-লয়ে খেলা করে যান। উইকেট পতন, চারের মার, এমনকি কায়দা করে ডিফেন্স করা দেখেও শিহরিত দর্শকের মনে হিল্লোল বয়ে যায়। টেস্ট ক্রিকেট আর যন্ত্রসংগীত এই দুই ধ্রুপদী শিল্পের আশ্চর্য মিল। এ যুগের খুল্লাম খুল্লা, কর্কশ, দেখনদারী সংগীতের সঙ্গে ততোধিক কুশ্রী, ওয়ানডে বা পাজামা ক্রিকেটের ছোট সংস্করণ, মানে টি-টোয়েন্টি, যাকে অন্তর্বাস ক্রিকেট বলাটাই শ্রেয়, সেটি পাল্লা দিয়ে রাজত্ব করলেও, বিদগ্ধ দর্শক জানেন যে, যন্ত্রসংগীতের মতো ক্রিকেটের আস্বাদন পেতে হলে দেখতে হবে টেস্ট ক্রিকেট। আবার ওস্তাদি আসর যেমন যেনতেন জায়গায় ঠিক জমে ওঠে না, টেস্টেরও আবহটা জরুরি।
আজ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ। আর এই আসর বসবে কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে। ভারতীয় ক্রিকেটের পুণ্যভূমি, ক্রিকেটের জন্মদাতা ইংল্যান্ডের ক্রিকেট তীর্থ লর্ডসের পরেই ওস্তাদি আসরের পীঠস্থানের দাবিদার। লর্ডস যদি হয় ইউরোপীয় ধ্রুপদী রঙ্গমঞ্চ, ইডেন তবে দিশি গানের রঙ্গশালা। আর এখানেই ১১ জন বাঙালির ছেলে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে প্রথমবারের মতো ধ্রুপদী এই আসরে নামবে। এহেন দিনে, কিংবা বলা চলে এই ওস্তাদি আসরের পুরোটা সময়ে টিভির সামনে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে যে বইটা সবচেয়ে আদর্শ সঙ্গী হতে পারে সেটি হচ্ছে কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘দিশি গান বিলিতি খেলা’।
কুমারপ্রসাদ ক্লাসিক যুগের সমঝদারদের মতো ক্রিকেট আর সংগীতের কেবল ভক্ত নন, তার ভাষাতেও সুরলহরী। একটু আদিকালের এই ভাষায়, মূর্ছনার সঙ্গে পরিমিত অথচ তীব্র রসবোধ। কোনো কোনো অধ্যায়ে লেখক ধীরে ধীরে ইনিংস গড়ে তুলেছেন, কখনো-বা আবার শুরুতেই মারমুখী হয়ে এরপর স্থিতধী হয়েছেন। কখনো তীব্র বেগে বাম্পার, কখনো সুচতুর সুইং বোলিং। ব্যাটসম্যানের হাতে যেমন আছে কভার ড্রাইভ, অফ ড্রাইভ, স্ট্রেট ড্রাইভ, অন ড্রাইভ, লেট কাট, ব্যাক কাট, স্কোয়ার কাট, পুল, হুক, সুইপ, গ্লান্স আর শিল্পীর বোলে যেমন বন্দেশের নায়কি ও গায়কি, বিস্তার, বহালওয়া, বোলবাট, বোলতান, লয়কারী, তান তেমনি কুমারপ্রসাদের কলম চলেছে নানা কায়দায়। নানা গল্পে, নানা স্মৃতিকথায়। কখনো হিসেবি, কখনো আবেগি, কখনো অভিমানী। ক্রিকেটপাগল আর একটু ক্লাসিক্যালমনস্ক যারা, তাদের জন্য যেন এক অনুভূতির নাগরদোলা।
প্রথম পরিচ্ছেদ বিনু মানকড়। বাঙালির ছেলে পংকজ রায়ের সঙ্গে যার উদ্বোধনী জুটির বিশ্বরেকর্ড টিকে ছিল ৫২ বছর। যদিও সাহেবসুবোরা উনার এক দুর্বল ‘আনস্পোর্টিং’ মুহূর্তকেই বেশি মনে রেখে ‘মানকাডিং’ নামটা ক্রিকেট বইয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তবে লেখক মনে করেন মানকড় ছিলেন কপিল দেবের চেয়ে বড় অলরাউন্ডার। শুধু ব্যাটিং না, উনার বাঁহাতি স্পিন সর্বকালের সেরা কিনা এই নিয়ে বিস্তর তর্ক হয় এখনো। স্বয়ং নেভিল কার্ডাস লর্ডস টেস্টে যার খেলা দেখে বলেছিলেন, স্কোরবোর্ড তো একটা গর্দভ। এই খেলার আসল জয়ী, আসল আত্মা যদি কেউ থাকে, সেটি হচ্ছেন মানকড়। এর পরের অধ্যায়ে লেখক বয়ান দেন সৈয়দ মুশতাক আলীর। চলনে, মননে আভিজাত্যের এক মূর্ত প্রতীক, ছ’ ফুটের ওপর লম্বা, প্রশস্ত কাঁধ, ছিপছিপে গড়ন নিয়ে তিনি ছিলেন ক্রিকেট মাঠের বড়ে গুলাম আলী খাঁ, যিনি গলা খেলাতেন না, গলাই যাকে খেলাত। তিনি যখন ব্যাট চালাতেন, তখন নাকি ইডেনের দর্শক সম্মোহিতের মতো স্থির হয়ে যেতেন, ওস্তাদি গানের আসরের মতোই। এরপরের অধ্যায় সি কে নাইড়–। ভারতের ক্রিকেটের সবচেয়ে রাশভারী, সবচেয়ে ‘টাফ’ গাই। মার্কিন পিয়ানোবাদক জর্জ গেরশউইনকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, আমেরিকান সংগীতে আরভিং বার্লিনের স্থান কী? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমেরিকান মিউজিকে আর্ভিং বার্লিনের কোনো স্থান নেই।’ এরপর ক্ষণকাল চুপ থেকে বলেন, ‘হি হ্যাজ নো প্লেস ইন আমেরিকান মিউজিক, হি ইজ আমেরিকান মিউজিক।’ সিকেও ভারতীয় ক্রিকেটে তাই। আদতে, কেবল সিকে নাইড়–র গল্পগুলোর জন্যই এই বইটা পড়া যায়। এর পরের অধ্যায়ে আছে লালা অমরনাথ আর অমর সিং-এর গল্প। একজন দুর্ভাগা ব্যাটসম্যান ও অধিনায়ক আর আরেকজন দুর্ভাগা বোলার। প্রচণ্ড রকম ক্ষমতা আর মেধা থাকলেও টেস্ট ক্রিকেট তাদের প্রতি ছিল রুষ্ট। যেন, আসরে উঠে আওয়াজ বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরাণের সেই শিল্পীর মতো।
এদের সঙ্গে লেখক পঞ্চম পরিচ্ছেদে বলেন, বাঙালি পেস বোলার শুটে ব্যানার্জির কথা। যিনি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, এমসিসি আর অস্ট্রেলিয়ার সফরকারি দলগুলোর পাশাপাশি ঘরোয়া লিগে দারুণ বল করলেও খেলতে পেরেছেন সাকুল্যে একটি টেস্ট। এখানেও, আরও অন্য অধ্যায়ের মতো আছে উপমহাদেশের ক্রিকেটে আঞ্চলিকতাবাদের বিষাক্ত কাহিনী। এরপরে লেখক বলেন ‘সেরা বাঙালি’ পংকজ রায়ের কথা, ভীমসেন যোশীর যেমন প্রকৃতিদত্ত গলা ভালো না হলেও কঠোর অধ্যবসায়ে সেটিকে গড়ে তোলা, তেমনি এক খেলোয়াড় বিজয় হাজারের গল্প, একজন বিজয় মার্চেন্টের আখ্যান। শেষের জনের স্পিন বল খেলার দক্ষতা নিয়ে গল্পগুলো দারুণ। আবেগি লেখক এই স্থলে ব্র্যাডম্যান, বিলায়েত খাঁর সংগীত আর আমীর খসরুর সংগীত ও সুফিবাদ হাজির করেছেন। এরপরের অধ্যায়টা এ অঞ্চলের ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে যারা চর্চা করেন, তাদের জন্য আনন্দের। এই অধ্যায়টা ভারতীয় ক্রিকেটের গোড়াপত্তনে যাদের সবচেয়ে বেশি অবদান, সেই পারসীদের জন্য বরাদ্দ। এম ই পাভরি, নরি কন্ট্রাক্টর, পলি উমড়িগড়, ফারুক ইঞ্জিনিয়ার, রুশি মোদীদের গল্প ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য স্বর্ণখণ্ড। এতো কেবল ক্রিকেট না, উপনিবেশিকতা, সামাজিক অবস্থারও গল্প। আগ্রহীরা রমাচন্দ্র গুহের ‘অ্যা কর্নার অফ দ্য ফরেন ফিল্ড’ বইটা পড়তে পারেন। সেখানে আরও বিশদ আছে। আমাদের আলোচ্য বইয়ে লেখক ক্রিকেটের পাশে উল্লেখ করেন জুবিন মেহতার নাম। এ যুগের সবচেয়ে নামকরা কম্পোজারদের একজন, তিনিও জাতে পারসিক।
পারসিকদের মতো নবাবদের ভূমিকাও কম না। এদের মধ্যে অনেকেই অবশ্য পৃষ্ঠপোষকতার বিনিময়ে এমনকি টেস্ট দলেও বোঝা হয়েছিলেন। ওদের নিয়ে পুরো বইতেই কটাক্ষ করলেও পাতৌদিদের ব্যাপারটা আলাদা। ইফতেখার আলী খান আর মনসুর আলী খানের জন্য তাই পুরো একটা অধ্যায়। এরপরে আসে ভারতের মায়াবী ঘূর্ণিজালের স্পিনারদের গল্প। প্রসন্ন, চন্দ্রশেখর, ভেংকট আর বেদির মতো চতুষ্টয় টেস্ট ক্রিকেট কখনোই দেখেনি। ভারতীয় মিস্টিক সংগীতেরই এক ধারা যেন এই ইন্দ্রজাল।
এরপরের অধ্যায়গুলো একেবারেই অধুনা ক্রিকেটারদের। এরমধ্যে আজহারউদ্দিনকে নিয়ে লেখা অধ্যায়টা সম্ভবত এই বইয়ের সেরা। লেখকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আজহারের উত্থান, আজহারের শিল্প আর শেষতক পতন। এমনকি সাম্প্রদায়িক কূটচালও। তবে, শেষতক লেখক, সব ছাপিয়ে মানুষ আজহার, ব্যাটকে সেতারের মতো করে বাজানো আজহারকেই ওপরে তুলে ধরেন। ক্রিকেটের শিল্প আর নোংরামি এই দুই অধ্যায় বুঝতেই আজহারউদ্দিন জরুরি এক নাম। আজহারপ্রেমী বা বিদ্বেষী কিংবা নিছক ক্রিকেটপ্রিয় সবার জন্যই তাই এই অধ্যায়, এই বই অবশ্যপাঠ্য।
আর, কেবল পাঠ্য না, চমৎকার কিছু ছবির জন্য, ক্রিকেট আর সংগীতের এক দারুণ সফরের অভিজ্ঞতা দেওয়া বইটার কাগুজে সংস্করণ একই সঙ্গে অবশ্য সংগ্রহযোগ্য।
বই : দিশি গান বিলিতি খেলা, লেখক : কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
প্রকাশক : আনন্দ (পশ্চিমবঙ্গ, ভারত) প্রচ্ছদ : সমীর সরকার দাম : ৫৪০ টাকা (রকমারি ডটকম)
বই সমালোচক
ক্রীড়া সাংবাদিক ও অনুবাদক