শুভবুদ্ধি গুজবাচ্ছন্ন, কে কাকে লাগাম পরাবে

পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে তাও কার্যকারণ ছিল। বাংলাদেশ পেঁয়াজের জন্য অনেকাংশেই ভারতের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন কম হওয়ার কারণে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। হঠাৎ করে ভারত থেকে পেঁয়াজের সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় দেশের বাজারে সংকট সৃষ্টি হয়। হ্যাঁ, এর সঙ্গে অসাধু ব্যবসায়ীরা গুজব ছড়িয়ে, মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে। পরে অনেক বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে লাল হয়ে যায়।

পেঁয়াজ সংকট কাটতে না কাটতেই আবার শুরু হয় লবণ সংকটের গুজব। ‘লবণের কেজি দুইশ টাকা হবে’Ñ এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। আর হু হু করে লবণের দাম বাড়তে থাকে। বেশির ভাগ মানুষ গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে বেশি দাম দিয়ে বেশি করে লবণ কিনে মজুদ করে। ফলে সত্যি সত্যি অনেক এলাকার বাজার থেকে লবণ উধাও হয়ে যায়। লবণের দাম বেড়ে যাওয়ার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। লবণ দেশেই উৎপন্ন হয়, উৎপাদন ও জোগানে কোথাও কোনো ঘাটতি নেই। তবু কেন বাড়ছে লবণের দাম? মানুষই-বা এ ধরনের ফালতু গুজবে কেন আস্থা রাখছে?

এভাবে গুজব ছড়িয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ঠিকই ফুলেফেঁপে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ এভাবে আর কত দিন? একটার পর একটা গুজব সৃষ্টি করে দেশকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? মানুষই-বা এমন গুজবে কেন কান দিচ্ছে? পেঁয়াজ, লবণের পর কি চাল-ডাল-তেল-সাবান নিয়েও গুজব ছড়ানো হবে? আর গুজব ছড়িয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে পুরো দেশকে একটা অরাজক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া হবে? কোথায় প্রশাসন? কোথায় সরকার? কোথায় গুজব ঠোকানোর মেকানিজম?

 

মাত্র কয়েক মাস আগে ‘পদ্মা সেতুতে শিশুর মাথা লাগছে’Ñ এমন একটা গুজব ছড়িয়ে সারা দেশে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল। বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এখন জিনিসপত্রের দাম নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আর সেই গুজবে কান দিয়ে দেশের মানুষও দিব্যি হুজুগে মাতছে! কেউ বাস্তবতা তলিয়ে দেখছে না। কোনো একটা কথা কানে আসা মাত্র তা ছড়িয়ে দিয়ে গুজবের পেছনেই ছুটছে! এটা একটা জাতির জন্য সর্বনাশা প্রবণতা!

গুজব নতুন কিছু নয়। নতুন কিছু হলো, এই অসভ্য বিষয়টির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ‘অতি সভ্য’ একটি বিষয়। সোশ্যাল মিডিয়া। পুলিশ প্রশাসন, মনোবিদ, চিকিৎসক, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদÑ সবাই কমবেশি বলছেন, এ মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়া হলো গুজব রটানোর মূল কাণ্ডারি। সেখানে দায়িত্বহীন মন্তব্য করে, মিথ্যা খবরে উসকানি দিয়ে অশান্তির আগুন ছড়ানো হচ্ছে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত কেউ বাদ যাচ্ছে না। কয়েকজন স্বাধীন মতপ্রকাশের নামে স্পর্শকাতর সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন কথা লিখছে, যাতে অশান্তির আগুন দাউ-দাউ করে জ্বলে ওঠে। আর একদল সোশ্যাল মিডিয়াতেই গুজব ছড়িয়ে সেই আগুনকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। দুদলই বদ। আবার বলছি, সবাই বলছে, সোশ্যাল মিডিয়া গুজবকে ভয়ংকর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। আগে মুখে মুখে ছড়াতে দুদিন লাগত, ফেইসবুক মুহূর্তে ছড়াচ্ছে। যে মাধ্যমে এই ভয়ংকর বদমাইশি করা হয়, প্রয়োজনে সেটার ব্যাপারেও আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রাচীনকাল থেকেই গুজব ব্যাপারটা চলে আসছে। ভয়, বিদ্বেষ, হিংসা ছড়াতে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে যুগযুগান্ত ধরে। মানুষের আদিম প্রবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করাটাই গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্য। কী সেই আদিম প্রবৃত্তি? যুক্তি-বুদ্ধি বাস্তবজ্ঞানকে গলা টিপে মারো। তোমার অন্ধবিশ্বাসই শেষ কথা। সে বিশ্বাস মিথ্যে হলেও কিছু এসে যায় না। তুমি মিথ্যে কথা ছড়িয়ে অন্য মানুষের ক্ষতি করো। চারপাশে অস্থিরতা তৈরি করো। প্রাণহানি হোক, লুটতরাজ চলুক, ধর্ষণ হোক। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে মানুষের পকেট কাটো। কেউ কেউ বলে, গুজব ছড়ানো নাকি একটা অসুখ। এই অসুখের ওষুধ নেই। কেউ কেউ অবশ্য মনে করে, আছে। ওষুধ আছে। কী সেই ওষুধ? তারা বলে, ওষুধের নাম হলো ‘থাবড়ে দাঁত ফেলে দেওয়া’। এক ডোজ ‘থাবড়ে দাঁত ফেলে দেওয়া’ ওষুধ প্রয়োগ করলেই কাজ দেবে। এই ওষুধে থাবড়া মেরে দাঁতের পাটি ফেলে দিতে হয়। এতেই গুজব ছড়ানো বন্ধ হয়ে যাবে। তারা আরও বলেন, ‘গুজবে কান দেবেন না’ বলে কিছু হয় না, বলতে হবে, গুজবে কান দিলে কান টেনে ছিঁড়ে দেব। এই ওষুধের যারা প্রবক্তা তারা মনে করে, গুজব যারা ছড়ায়, তারা চরিত্রে নিম্নমানের, মনের দিক থেকে অতি দুর্বল। গরিব, অসহায়, সংখ্যায় যারা কম, একা মানুষের ওপর আক্রমণ করতে এদের হাত নিশপিশ করে। একবার হাত ভেঙে দিতে পারলে নিশপিশ করার জন্য নাকি হাত পাওয়া যাবে না। কখনো ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে, কখনো মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করে খবর রটিয়ে অন্য মানুষের ওপর হামলা করছে, সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে, তাদের ওপর নাকি কোনো ধরনের দয়া দেখানো উচিত নয়।

যদিও এই মত সমর্থনযোগ্য নয়। হিংসার উত্তর হিংসা দিয়ে হয় না। আইন দিয়ে করতে হবে। গুজব ছড়ানো একটা জঘন্য অপরাধ। সেই অপরাধ করলে আইনি পথে সাজা দিতে হবে। কদিন ধরে দেখছি, বিভিন্ন স্থানে জিনিসপত্রের দাম নিয়ে গুজব ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। প্রশাসন নানাভাবে গুজব বন্ধ করতে চাইছে। আবেদন, নিবেদন করছে। মাইকে প্রচার চালাচ্ছে। ভালো কথা। এটা প্রয়োজন। সভ্যসমাজে তো আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না। কিন্তু আর একটা ছোট কাজও আছে। পুলিশ প্রশাসনের উচিত নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর ঘোষণা করে জানানো, গুজব ছড়ানোর মতো নিকৃষ্ট অপরাধটি করায় কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কতজনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে, কতজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শুধু আবেদনে গু-ারা শান্ত হয়ে যাবে? গুজব থেকে কত বড় অশান্তি ছড়াতে পারে আমরা জানি। ইতিহাসে অজস্র উদাহরণ আছে। সুতরাং যারা এই অপরাধ করছে তাদের কড়া শাস্তি দিতে হবে।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফেক বা ভুয়া আইডি থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আর যেকোনো একটি ঘটনা বা রটনা কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই এক শ্রেণির মানুষ বিশ্বাস করছে এবং তাদের এই বিশ্বাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া কিছু কিছু ঘটনা দেখলে সত্যিই হাসি পায়। অথচ এ ধরনের ভিত্তিহীন আজগুবি বিষয়গুলোই বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করছে। এগুলো ‘ভাইরাল’ও হচ্ছে। গুজব ছড়িয়ে নিরীহ মানুষের ওপর হামলা করার ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়া গুরুতরভাবে অভিযুক্ত। ফেইসবুক জীবন, ফেইসবুক সত্য, ফেইসবুক অন্যায়ের প্রতিবাদ, ফেইসবুক মত তৈরির হাতিয়ার, ফেইসবুক আধুনিক, ফেইসবুক প্রযুক্তি, ফেইসবুক পারে দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করতেÑ বলে এত দিন যারা লাফিয়েছেন তারা নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেনে গেছেন, গুজব ছড়িয়ে অশান্ত পরিবেশ তৈরির ব্যাপারে সব থেকে বেশি যার ওপর নজর রাখা হচ্ছে তার নাম ‘ফেইসবুক’। ফেইসবুকের ব্যবহার নিয়েও আমাদের ভাবনা-চিন্তা করা দরকার।

গুজব মানুষের আদিম প্রবৃত্তি। বলতে পারলে, ছড়াতে পারলে, শুনতে পারলে এক ধরনের মানসিক এবং শারীরিক তৃপ্তি হয়। মানুষের মনের মধ্যে একটা অসভ্য, বর্বর মানুষ বাস করে। এই বর্বর মানুষটি মোটামুটি সব মানুষের মধ্যেই রয়েছে। আমার মধ্যে তো রয়েছেই। কেউ তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, কেউ পারে না। কেউ আবার হাফ নিয়ন্ত্রণে রাখে, কেউ কোয়ার্টার। তখন অসভ্যতা, বর্বরতা নানা চেহারায় প্রকাশ পায়। গুজব সেই প্রকাশেরই একটা ধরন। গুজব যতটা না নিজে থেকে ছড়িয়ে পড়ে, তার থেকে বেশি ছড়ানো হয় পরিকল্পনা করে। উদ্দেশ্য থাকে। এটা মনে রাখতে হবে।

এ দেশের পাড়ায় পাড়ায় বহু সচেতন যুবক থাকেন। তারা এগিয়ে আসুন। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষরা এগিয়ে আসুন। আপনার পাড়ায় একজনও গুজবের শিকার হলে মনে রাখবেন তা হবে আপনার পাড়ার লজ্জা। এটা হতে দেবেন না এবং আরও কঠোরভাবে এগিয়ে আসুক পুলিশ প্রশাসন। গুজবকারীরা ভয় পেতে শিখুক। গুজবে লাগাম পড়–ক।

যা নয়, তাকে ‘হয়’ বলে চালানোর নোংরা রাজনীতিই হচ্ছে গুজব। ঘটনাচক্রে সোশ্যাল মিডিয়া সেই চক্রান্তের বাহক। সবচেয়ে হতাশার ব্যাপার হলো, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষগুলোও আজ বড় বেশি নিস্পৃহ, উদ্যোগহীন। অনেক ক্ষেত্রে বৃহত্তর সমাজের কাছে আস্থাহীনও বটে। চারদিকে গুজবাচ্ছন্ন, গুপ্ত কুমন্ত্রণাদাতাদের বাড়বাড়ন্ত। এ পরিস্থিতে কে কাকে লাগাম পরাবে?

লেখক

লেখক ও কলামনিস্ট