প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদিত আইনের খসড়া বিল আকারে সংসদে পাস হওয়ার আগেই আটকে যাচ্ছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে। আর নীতিগত অনুমোদিত আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ফের মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নিয়ম থাকলেও সেগুলোও ফেলে রাখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এসব আইনের খসড়া দ্রুত সংসদে বা পুনরায় মন্ত্রিসভায় পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা থাকলে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ সংশোধন ও পরিমার্জন করে নতুন আইন আকারে বাংলা ভাষায় প্রণয়নের যে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী এর আগে দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়নেরও নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি একই সঙ্গে মন্ত্রিসভায় কোনো আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রয়োজন না হলে সেগুলোও পুনরায় মন্ত্রিসভায় পাঠিয়ে বাতিলের নির্দেশ দিয়েছেন। গত ২৬ আগস্ট তিনি এ সংক্রান্ত নির্দেশনা সব সচিবকে পাঠিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা পাওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়াধীন আইন দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তৎপর হয়েছে।
একজন সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইন অনেক সময় সংসদে না পাঠিয়ে ফেলে রাখা হয়। নীতিগত অনুমোদিত আইনও অনেক সময় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় পাঠানো হয় না। এসব সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে। তারা অনেক সময় তাদের স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কায় এসব আইন ফেলে রাখতে ভূমিকা রাখেন। তখন মন্ত্রণালয় আইনগুলোকে প্রক্রিয়াধীন হিসেবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করে থাকে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে প্রতিদিনই কৃষিজমি কমছে। প্রতি বছর প্রায় এক শতাংশ হারে কৃষিজমি ব্যবহার হচ্ছে অপরিকল্পিত আবাসনে, শিল্প-কারখানা স্থাপনের কাজে এবং রাস্তাঘাট নির্মাণসহ নানা ধরনের উন্নয়ন কাজে। এতে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের খসড়া করা হয় ২০১৫ সালে। এ আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন করা হলেও আইনটি আর আলোর মুখ দেখেনি। শুধু ২০১৫ সালেরই নয়, তার আগে অনুমোদিত আইনের খসড়াও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হয়নি। অথচ নিয়ম হচ্ছে মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত কোনো কারণে বাস্তবায়ন করা না গেলেও তা মন্ত্রিসভাকে জানাতে হবে।
কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে অনেক কর্মকর্তারও দ্বিমত রয়েছে। তাদের মতে, জমির মালিক তার জমিতে ঘর তুলবেÑ এতে সরকারের বাধা দেওয়া ঠিক হবে না। একজন প্রবাসী শ্রমিকের যদি একখ- কৃষিজমি থাকে তাহলে সে ঘর তোলাকেই অগ্রাধিকার দেবে। এসব কর্মকর্তার মতে, সরকার এ আইন করলে দেশের শিল্পায়ন বন্ধ হয়ে যাবে। তবে বেশিরভাগ কর্মকর্তাই কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের
পক্ষে। তাদের মতে, কৃষিজমি সুরক্ষা না করলে দেশ ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মুখে পড়বে।
কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আইনটি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। যে হারে জমি নষ্ট হচ্ছে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে কৃষিজমি রক্ষা করতেই হবে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূমি উন্নয়ন কর আইনের খসড়া করা হয় ২০১৫ সালে। ভূমি উন্নয়ন কর ধার্য ও আদায়ের জন্য বিদ্যমান আইনকানুন ও বিধিবিধান সমন্বয় করে এ আইনের খসড়া করে ভূমি মন্ত্রণালয়। করের হার পরিবর্তন করে ও নতুন ধারা সংযোজন করে আইনের খসড়া করা হয়। জমির মালিক ও বর্গাদারদের মধ্যে উন্নততর সম্পর্ক নিশ্চিত করার জন্য ভূমি সংস্কার আইনের খসড়া করা হয় ২০১৪ সালে। ভূমির মধ্যস্বত্ব, জোতস্বত্ব ও ভূমি হস্তান্তর সম্পর্কিত বিষয় খসড়া আইনে স্থান পেয়েছিল। বর্গা জমির উৎপাদিত ফসলের এক-তৃতীয়াংশ জমির মালিক, এক-তৃতীয়াংশ বর্গাদার ও বাকি এক-তৃতীয়াংশ শ্রম চাষের ব্যয়ের অনুপাতে বণ্টন করার বিধান রাখা হয়। আইনের খসড়াটি করা হয়েছিল ১৯৮৪ সালের ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশের পরিপূরক হিসেবে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দ্রুত প্রক্রিয়াধীন আইন চূড়ান্ত করার জন্য কাজ শুরু করেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মেদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশগুলোর রেফারেন্স দিয়ে তার মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন, এপিডি, সিপিটি, সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা ও তদন্ত, আইন, বিধি এবং সংস্কার ও গবেষণা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে প্রক্রিয়াধীন কোনো আইন থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বর্তমানে ২০০৭ সালের একটি অর্ডিন্যান্সে চলছে। সেই অর্ডিন্যান্স নতুন করে প্রণয়ন করা নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে দোটানার মধ্যে রয়েছে। তারা আইন প্রণয়নের বিষয়ে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ নিয়েছে। লেজিসলেটিভ বিভাগের মতে, আইনটি নতুন করে করার দরকার নেই। অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আইনটির ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলছে। এ অবস্থায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন দোটানায় থাকার পর শেষ পর্যন্ত অধ্যাদেশটি নতুন করে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কতগুলো আইন এই মুহূর্তে প্রক্রিয়াধীনÑ জানতে চাইলে এর সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানাতে আপত্তি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তারা বলেছে, মন্ত্রিসভার তথ্য অতি গোপনীয়, এসব তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়। তবে আইনের খসড়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভাষাগত উৎকর্ষ সাধন, বিষয়গত যথার্থতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য ও সংগতি বিধানের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি রয়েছে। ওই কমিটি বর্তমানে ৩০টি আইনের খসড়ার ওপর কাজ করছে। আরও ১১টি আইনের খসড়া কমিটির কাছে জমা হয়েছে। এসব আইনের মধ্যে রয়েছেÑ শিক্ষা আইন ২০১৭, বন্দর আইন ২০১৬, রেকর্ড বিনষ্টকরণ আইন ২০১৮, আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন ২০১৯, হাটবাজার স্থাপন আইন ২০১৯, বাংলাদেশ উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ প্রতিষ্ঠান আইন ২০১৮, স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন ২০১৬ ইত্যাদি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্ত ফেলে রাখার কোনো সুযোগ নেই। মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কিত প্রতিবেদন সিদ্ধান্তটি অবহিত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে একবার এবং সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৪ তারিখের মধ্যে একবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ অধিশাখায় পাঠাতে হয়।
২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা সামরিক শাসনামলে জারি করা অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সংশোধন আকারে বাংলা ভাষায় প্রণয়নের নির্দেশ দেয়। এর আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত এবং ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ থেকে ১৯৮৬ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল করে উচ্চ আদালত। এরপর ওই সময়ের কোনো অধ্যাদেশ কার্যকর রাখার প্রয়োজনে অধ্যাদেশ কার্যকরণ (বিশেষ) বিধান আইন প্রণয়ন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর যে নির্দেশনা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে তা ২০১৯ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্ত্রিসভাকে অবহিতকরণ বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তই কার্যকর করার জন্য পরে লিখিত আকারে সচিবদের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার নির্দেশনায় বলেছেন, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা মন্ত্রণালয়ের মাসিক সমন্বয় সভায় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করবেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরাও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য দিকনির্দেশনা দেবেন।
গত ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সচিব সভায় দীর্ঘদিন মন্ত্রিসভার অনিষ্পন্ন সিদ্ধান্তসমূহ বাস্তবায়নে সচিবদের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম। মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত বিদ্যমান আইন ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও পুনরায় তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘মন্ত্রিসভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হলে তা অবশ্যই মন্ত্রিসভাকেই করতে হবে। কোনো মন্ত্রণালয় মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত আটকে রাখতে পারে না।’