দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক

অস্থিরতা রুখতে সতর্ক থাকবে সরকার, এফবিসিসিআই

চাল, ডাল, পেঁয়াজ, তেল, চিনিসহ নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার ও ব্যবসায়ীরা। আগামীতে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা, জোগান ও দাম ঠিক রাখতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে কাজ করা হবে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, ভবিষ্যতে যাতে পেঁয়াজ সংকটের মতো কোনো পরিস্থিতিতে দেশকে পড়তে না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেবেন তারা। পেঁয়াজ মজুদ করে যারা সংকট সৃষ্টি করেছে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হবে। কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যবসায়িক সংগঠন অহেতুক কোনো পণ্যের দাম বাড়িয়ে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগামীতে ভোগ্যপণ্যের জোগান ও দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখতে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে একযোগে কাজ করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল রবিবার এফবিসিসিআইতে আয়োজিত সরকারের দুই মন্ত্রী ও সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এক বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন সরকারের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী নেতারা।

গত দুই মাসে পেঁয়াজের দর ৩০ থেকে বেড়ে ২৭০ টাকায় উঠে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে দুদিন বৃষ্টির অজুহাতে চালের দাম হঠাৎ ৫-৬ টাকা বৃদ্ধি, গুজব ছড়িয়ে লবণের দাম কয়েকগুণ বাড়ানো, ভোজ্যতেল ও ময়দাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর হঠাৎ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সঙ্গে গতকাল বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, শিল্প সচিব আবদুল হালিম, খাদ্য সচিব শাহাবুদ্দিন আহমেদ, প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন মো. মফিজুল ইসলামসহ বাণিজ্য, খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠকে পণ্যসামগ্রীর বছরব্যাপী চাহিদা, উৎপাদন, আমদানি-মজুদ ব্যবস্থা, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম সাংবাদিকদের বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বছরব্যাপী যে চাহিদা আছে, তার কী পরিমাণ উৎপাদন হয় এবং কী পরিমাণ আমদানি করা হয়, কেমন দামে আমদানি করা হয় এবং বাজারে এর যৌক্তিক দাম কেমন হওয়া উচিত– সেসব বিষয়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো নিত্যপণ্যের সংকট সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে আমরা সরকারি-বেসরকারিভাবে আরও সতর্ক থাকব। পণ্যের সঠিক মূল্যায়ন, উৎপাদন ও আমদানির মাধ্যমে সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক রেখে বাজারে মূল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হবে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো অবস্থাতেই বাজার পেঁয়াজের মতো কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি না দাঁড়ায়। তিনি বলেন, নিত্যপণ্য ভোক্তা পর্যায়ে সুলভ মূল্যে পৌঁছাতে সরকার ও ব্যবসায়ীরা সমন্বিতভাবে কাজ করবে। ইতিমধ্যে যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে, তার দ্রুত উত্তরণ ঘটানো হবে। কোনো ব্যবসায়ী বা সংগঠন অহেতুক কোনো পণ্যের দাম বাড়িয়ে সংকট সৃষ্টি করলে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এফবিসিসিআই।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এর সুযোগ নিয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বড় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বিমানে ও জাহাজে করে আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে এ সংকট কেটে উঠবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার বেশি চাপ দিলে বাজারে উল্টো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে।

চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, মানুষ মোটা চালের পরিবর্তে এখন সরু চাল বেশি খাচ্ছে। এ কারণে সরু চালে বেশি চাপ পড়ায় দাম কিছুটা বাড়লেও এখন চালের দাম নিয়ন্ত্রণে। তবে পাইকারি বাজারে যে দাম তার তুলনায় খুচরা বাজারে কেজিতে ৭-৮ টাকা দামের পার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে কঠোর তদারকির পরামর্শ দেন।

পেঁয়াজের মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই বাংলাদেশি। কেউ সরকার বা বিরোধী পক্ষ দেখছি না। আমরা তাদের সরকারের পক্ষ থেকে সোজাসাপ্টা বার্তা দিয়েছি। যদি কেউ পণ্যের মজুদ করে বাজারে অহেতুক চাপ সৃষ্টি করে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা নিত্যপণ্যের ব্যবসায়ীদের আরও একটা বার্তা দিয়েছি। বাজারে কোনো পণ্যের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। পেঁয়াজ নিয়ে সংকট হয়েছে। কিন্তু পেঁয়াজ বাজারে আছে। এজন্য কাদের কাছে পেঁয়াজের মজুদ ছিল, তারা কখন আমদানি করেছে, কখন ও কত টাকায় বিক্রি করেছে তা এনবিআর খতিয়ে দেখছে। এসব পণ্যে কোনো ট্যাক্স বা শুল্ক নেই। তাই সমস্যা হওয়ার কথা নয়। চালের ওপর শুল্ক আছে। কারণ উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। তার সুরক্ষাতেই সেটা করা হয়েছে। তাই ভোক্তাদের জানাতে চাই– লবণ, তেল, চিনি, ডাল এ জাতীয় নিত্যপণ্যে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না।

পেঁয়াজের চাহিদা, উৎপাদন ও মজুদ পরিস্থিতি সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিনিধি মো. নুর উর রহমান বলেন, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ টন। রমজানে তা আরও ২ লাখ টন বৃদ্ধি পায়। সে ড়্গেত্রে দেশে যে পরিমাণ উৎপাদন হয় তার ২২-২৮ শতাংশ পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়। ফলে প্রতি বছর ৯-১১ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়, যার ৯৮ শতাংশই আমদানি হয় ভারত থেকে। তবে পেঁয়াজ আমদানির ড়্গেত্রে কোনো প্রকার শুল্ক নেই।

বৈঠকে সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান, এসআলম গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপসহ বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।