উপমহাদেশের প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী আয়েত আলী খানের ছেলে এবং আলাউদ্দীন খাঁর ভাতিজা সংগীত ব্যক্তিত্ব মোবারক হোসেন খান মারা গেছেন। গতকাল রবিবার ভোরে ঘুমের মধ্যে কোনো একসময় তিনি মারা গেছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন সংগীত পরিচালক ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, ‘শনিবার রাতে ঘুমানোর পর গতকাল ভোরের দিকে তিনি আর ঘুম থেকে ওঠেননি। ঘুমের মধ্যেই কোনো একসময় তিনি মারা গেছেন।’
মোবারক হোসেন খানের মেয়ে রিনাত ফৌজিয়া খান গতকাল রাত ৮টায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ভাই বিদেশে থাকে, সে রওনা করছে। আশা করছি মঙ্গলবারের মধ্যেই দেশে ফিরে আসবে। মঙ্গলবারই আমরা দাফন করার ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে ভেবেছি। ঢাকার কোথায় দাফন করা হবে, সেটা এখনো ঠিক হয়নি। সোমবার আমরা এ ব্যাপারে চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেব। মঙ্গলবার দাফনের আগ পর্যন্ত মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে থাকবে।’
মোবারক হোসেন খানের সাবেক কর্মস্থল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে জানাজা হতে পারে উল্লেখ করে রিনাত ফৌজিয়া খান বলেন, ‘রামপুরায় আমাদের বাসার পাশের মসজিদে জানাজা হবে। আমার বাবা চার বছর শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। তাই আমাদের প্রত্যাশা বা চাওয়া বলতে পারেন শিল্পকলা একাডেমিতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া। আমার চাচা শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাকে ফোনে পাচ্ছেন না। ওনার সঙ্গে কথা বলে শিল্পকলায় হয়তো নিয়ে যাওয়া হবে। এটা এখনো চ‚ড়ান্ত হয়নি।’ এদিকে রবিবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে মোবারক হোসেন খানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন মোবারেক হোসেন খান। তিনি ১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রম্নয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের সংগীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী। মা উমার উননেসা। চাচা ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ। ছয় ভাইবোনের মধ্যে মোবারক হোসেন খান সবার ছোট।
পারিবারিকভাবে সংগীত শিক্ষার পাশাপাশি মাইনর স্কুলে প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ গ্রহণ করেন। পরে কুমিল্লা জেলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৫২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৬২ সালের ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে মোবারক হোসেন খানের কর্মজীবন শুরু হয়। পরে তিনি বাংলাদেশ বেতারের পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময় তিনি কয়েকটি বই লিখেছেন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রকাশ হয় সংগীতবিষয়ক বই ‘সংগীত প্রসঙ্গ’। বিভিন্ন পত্রিকায় তার সংগীতবিষয়ক লেখা নিয়ে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় বই ‘বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ’। এরপর তিনি রচনা করেন ‘সংগীত মালিকা’। এ বইটিও প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। তিনি সংগীত ও শিশুবিষয়ক ৫০টি গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মোবারক হোসেন খান জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনের বড় বোন সংগীতশিল্পী ফৌজিয়া ইয়াসমীনকে বিয়ে করেন। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে কন্যা রিনাত ফৌজিয়া, দুই ছেলে তারিফ হায়াত খান ও তানিম হায়াত খান। তিনি একুশে পদক পেয়েছেন ১৯৮৬ সালে। এ ছাড়া পেয়েছেন স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৪) ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০০২)।