রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণের মাত্রা বিশে^র অন্য সব শহরকে ছাড়িয়ে গেছে। এই দূষণ কমিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে নিয়ে বৈঠক করতে চেয়েছিল পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রী শাহাব উদ্দীনের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে গতকাল সোমবার ওই আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রত্যাশিত কেউই অংশ নেননি। বিকেল ৩টা থেকে আড়াই ঘণ্টার ওই সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে শাহাব উদ্দীন জানান, ঢাকার বায়ুদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। এই দূষণের পেছনে উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজ এবং বর্জ্য পোড়ানোসহ বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো প্রতিকারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, পরিবেশ সচিব আবদুল্লাহ মোহসীন চৌধুরী, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক রফিক আহমেদ।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গতকালের সভায় যোগ দিতে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। পাশাপাশি এই ছয়টি মন্ত্রণালয়ের সচিবদেরও ডাকা হয়। আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রকেও। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি), বিআরটিএ চেয়ারম্যান, রাজউক চেয়ারম্যানসহ
বায়ুদূষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদেরও সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে ওই ছয় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের কেউই ছিলেন না। ছিলেন না দুই মেয়রসহ আমন্ত্রিত অন্যরাও। সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা যোগ দেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার সোমবার রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রী, সচিবরা না আসলেও ওই সমস্ত মন্ত্রনালয়ের বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা এসেছিলেন। ওই কর্মকর্তারা মন্ত্রনালয়ে গিয়ে রিপোর্ট করবেন। তােেত মন্ত্রী, সচিব উপস্থিত থাকা জরুরী না।
‘বায়ূ দূষণ নিয়ে সভায় মন্ত্রী ও সচিবদের অংশ নেয়ার জন্য চিঠি দেয়া হয়েছিল, তারা কেন আসলেন না’- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তাদের দাওয়াত দেয়া হয়েছে কি? তাহলে তো আপনিই আমার চেয়ে ভাল জানেন। বলেই মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি।
এ বিষয়ে শিল্প সচিব মো. আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওই সভার চিঠি আসছিল কিনা না দেখে বলতে পারবো না। কাল সকালে (মঙ্গলবার) এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বলা যাবে।’
সভায় উপস্থিত থাকতে না পারার কারণ জানতে গতকাল রাত্রে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিমের মোবাইলে ফোন দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
সংবাদ সম্মেলনে শাহাব উদ্দীন বলেন, ঢাকা শহরে এখন ৪০টি স্থানে রাতের বেলায় বর্জ্য পোড়ানো হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বাতাস দূষিত হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ এই বর্জ্য পোড়ানো। সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এখন থেকে রাতের বেলায় আর বর্জ্য পোড়াতে পারবে না।
তিনি বলেন, প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের চারপাশে যেসব সড়ক আছে আগামী ১৭ ডিসেম্বর থেকে সেসব সড়ক শব্দদূষণমুক্ত ঘোষণা করা হবে। ওই দিন থেকে সচিবালয়ের চারপাশকে ‘নীরব জোন’ ঘোষণা করবে সরকার। তার আগে চালকদের মধ্যে সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মকা- পরিচালনা করা হবে। পরীক্ষামূলকভাবে সচিবালয়কে শব্দদূষণমুক্ত করা হবে। পরে এভাবে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা শব্দদূষণমুক্ত করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, আমরা বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ঢাকা অঞ্চলে অবৈধভাবে যেসব ইটভাটা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে, আমরা সেসব বন্ধ করে দেব। সে জন্য আমাদের অভিযান জোরালো করা হবে। বায়ুদূষণ রোধে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এখন পানি ছিটিয়ে দায়িত্ব শেষ করে। এটা তো পানি ছিটানো নয়; এটাকে বলা চলে ঢেলে দেয়। এতে করে বায়ূদূষণে তেমন প্রভাব পড়ে না। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ঝরনার মতো ওপর থেকে পানি ঢালার। এ জন্য তারা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কার্যক্রম গ্রহণ করবে। দুই সিটি করপোরেশন এখন থেকে আর রাতের বেলায় আগুন দিয়ে ময়লা-আবর্জনা পোড়াবে না। তিনি বলেন, মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকায় সকাল-বিকেল পানি ছিটাতে হবে। এ ছাড়া ঢাকায় যেসব অবকাঠামো নির্মাণকাজ চলছে, সেখানে নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখতে হবে। আমরা এক মাস পর আবার বৈঠকে বসব। এ সময়ে পুরো বিষয় পর্যবেক্ষণ করব। সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করা হচ্ছে কি না, তা দেখব। যদি না হয় আমরা পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ সচিব আবদুল্লাহ মোহসীন চৌধুরী বলেন, আমরা ২০২৫ সালের পর থেকে সরকারি কাজে আর পোড়ানো ইট ব্যবহার করব না। সরকারি নির্মাণকাজে ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদনের পর আজই (সোমবার) প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এ বছর সরকারি নির্মাণকাজে ১০ শতাংশ ব্লক ব্যবহার করতে হবে। পরের বছর ২০ শতাংশ, তার পরের বছর ৩০ শ এভাবে ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি নির্মাণকাজে ইট ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তখন শুধু ব্লক ব্যবহার করা হবে। এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় কেন মন্ত্রী-সচিব কেউ আসেনিলি. এমন প্রশ্নে পরিবেশ সচিব কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশমন্ত্রী আরও বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। বায়ুদূষণের পেছনে ৫৮ শতাংশই দায়ী ইটভাটা। উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণকাজ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও পোড়ানো আবর্জনা বাতাস দূষণের অন্যতম কারণ। পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৩ সালে দেশে ইটভাটা ছিল ৪ হাজার ৯৯৫টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯০২টি। ২০১৩ সালে ঢাকায় যানবাহন ছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৯ হাজার ৬৫৪। বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় ঢাকা এখন ১ নম্বরে। আমরা আসলে এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আছি। এখান থেকে আমরা উত্তরণ চাই। এখন থেকে যদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করি, ভবিষ্যতে সরকারের যেকোনো উন্নয়ন কর্মকা- ম্লান হবে এই বায়ুদূষণের কারণে। পরিবেশ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলেও মত দেন তিনি।