প্রেসিডেন্ট পার্কের মালিক আমি, ট্রাস্ট নয় : এরিক এরশাদ

জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রয়াত চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজধানীর বারিধারার বাড়ি ‘প্রেসিডেন্ট পার্ক’ ট্রাস্টের সম্পত্তি নয় বলে দাবি করেছেন এরশাদ-বিদিশার ছেলে এরিক এরশাদ। তিনি বলেছেন, এই বাড়ি-ফ্ল্যাটের মালিক আমি।

এরিক এ কথাও বলেছেন, তার চাচা ও জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও এরশাদ ট্রাস্টের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান

মেজর (অব.) খালেদ আখতার তার সামনে এসে বা পাবলিকলি সম্পত্তি চাইলে তিনি দিয়ে দেবেন। তবে কিছুতেই মাকে দিতে পারবেন না ‘সরি’ বলেছেন।

একইভাবে এরিকের মা বিদিশাও সম্পত্তির জন্য প্রেসিডেন্ট পার্কে ছেলের কাছে আসেননি বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এসেছি সন্তানের কাছে, তার জন্য।

গতকাল সোমবার রাজধানীর প্রেসিডেন্ট পার্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদিশা ও এরিক এসব কথা বলেন। জানানো হয়, ইতিমধ্যেই এরিক দুদকে একটি চিঠি দিয়েছেন। সেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না এবং এরিকের স্বাক্ষর নিয়ে কিছু কাগজ নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। চিঠিতে এরিক এসব ঘটনার তদন্ত আশা করেন।

বিদিশা জোর করে প্রেসিডেন্ট  পার্কে ঢুকেছেনÑ জি এম কাদের ও খালেদ আখতারের এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে এরিক বলেন, আমার মা জোর করে এলে কেউ তার সঙ্গে ভদ্র আচরণ করত? আমি আমার মাকে এখানে ডেকেছি। আমার খাওয়া-দাওয়ায় সমস্যা হচ্ছে। আমাকে ড্রাইভারে গালাগালি দিয়েছে। নির্যাতন করেছে। এগুলো আমি আমার মৃত আব্বার কসম খেয়ে বলছি। আমার চাচা ও চাচার লোকেরা বলছেন, আমার মা বিদিশা সিদ্দিক বলপ্রয়োগ করে এবং আর্মস নিয়ে ঢুকেছেন। যেটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ।

‘তোমার মা এখানে থাকলে তোমার নিরাপত্তার সমস্যা হবে’ জাপার লোকজনের এমন অভিযোগের উত্তরে এরিক বলেন, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। দেখেন আমার যদি সমস্যা হতো অবিয়াসলি (নিশ্চয়) আমি আমার মাকে ডাকতাম না। আমি নিজে থেকে আমার মাকে ডেকেছি। ফোন করে বলেছি আসার জন্য, আমাকে দেখাশোনা করার জন্য। উনি তো সম্পত্তির লোভে এখানে আসেননি। এসেছেন আমাকে দেখে রাখার জন্য।

প্রেসিডেন্ট পার্ক এরশাদ ট্রাস্টের সম্পত্তিÑ ট্রাস্ট কর্র্তৃপক্ষের এমন তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে এরিক বলেন, না না না, প্লিজ। এটা ট্রাস্টের ফ্ল্যাট নয়। এই ফ্ল্যাট বাড়ির মালিক আমি। ট্রাস্টের এই ফ্ল্যাটের কোনো অধিকার নেই। ট্রাস্ট তো আছে আমাকে দেখাশোনা করার জন্য, আমার খাওয়া-দাওয়া, কী কী দরকার, সেটার জন্য। ট্রাস্ট তো আমার ফ্ল্যাটের কোনো অধিকার রাখে না।

মা আসার পর বাসায় ভালো আছেনÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে এরিক বলেন, সেটা আপনারাই দেখেন যে আমি আগের তুলনায় কত ভালো আছি। আপনারাই তো বুঝতে পারবেন। মা আমাকে নিজে খাইয়ে দিয়েছেন। মা আসাতে আমার দেখাশোনায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে না। সব প্রতিবন্ধী বাচ্চা এবং দুনিয়াতে যত মানুষ আছেন, তারা চান তাদের মা-বাবা একসঙ্গে থাক। এটা শুধু আমার কথা না। আমার মা তো আমার লিগ্যাল গার্জিয়ান, চাচা তো না। সুতরাং আমার মা আমার সঙ্গেই থাকবে।

থানায় দায়ের করা জিডি প্রসঙ্গে এরিক বলেন, এই জিডি আমি করেছি আমার চাচার নামে। জিডিতে বলেছি, আমাদের ডিস্টার্ব করা হচ্ছে। আমরা বাইরে গেলে বাসায় ফিরতে পারব কি না। এখন তো ওরা সবাই চাচ্ছে আমি মাকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাই। আমার সম্পত্তির ওপর ওদের লোভ। সে জন্য ওরা এটা করছে।

জাপার নেতারা বলছেন এরিক যা বলছে, সেটা শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছেÑ প্রসঙ্গে এরিক বলেন, না, এটা কোনোভাবেই শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। কারণ আমি অ্যাডাল্ট। আমি নিজেই বুঝে বলছি। আমাকে কেউ চাপ সৃষ্টি করেনি। আমি জানি সমস্যা কী।

এ ছাড়া এরিক বিভিন্ন সময় তার থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে জানিয়ে দুদককে বার্তা পাঠিয়েছেন বলেও জানান। তিনি বলেন, আমি দুদকে মেসেজ পাঠিয়েছি, আমার স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে না জানিয়ে কাগজ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেগুলো তদন্ত করার জন্য।

পরে বিদিশা বলেন, ট্রাস্টে লেখা আছে, এরিকের দেখাশোনা করবে ট্রাস্ট। এরিক কার সঙ্গে থাকবে, সে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে না। সিদ্ধান্ত নেবে ‘এরিক অ্যান্ড হিজ ফ্যামিলি’।

বিদিশা বলেন, ওর আব্বা (এরশাদ) একটা অছিয়ত করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছে, এরিকের দায়িত্ব তার (এরশাদের) ভাইয়ের কাছে দেওয়া হবে, তিনি দেখাশোনা করবেন। পরে কিন্তু এরশাদ ওই অছিয়ত ক্যান্সেল করলেন। কারণ তিনি তার ভাইকে (জি এম কাদের) বিশ্বাস করতে পারেন না। এরপর ওর (এরিক) আব্বা একটা ট্রাস্ট করলেন। ট্রাস্টের এক পাতায় স্পষ্ট করে দেওয়া আছে, সম্পত্তির মালিক মরহুম এরশাদ ও এরিক। বাকিরা যারা আজ কথা বলছেন খালেদ আখতার বা অন্যারা, তারা তো কেয়ারটেকার। সম্পত্তির মালিক এরিক। এরিক ক্লিয়ার করেছে তারা যদি সম্পত্তি চায় দিয়ে দেবে।

বিদিশা বলেন, এরিককে নিয়ে পারিবারিক আদালতে একটা কেস হয়েছিল। সেখানে তো কোথাও বলা নেই আমি এরিকের দেখাশোনা করতে পারব না। কিংবা ট্রাস্ট দেখাশোনা করবে। এমন কোনো আদেশ তো কোর্ট থেকে আসেনি। পরে হাইকোর্ট থেকে একটা আদেশ নিই এরিককে দেখাশোনার। এটা নিয়ে পরে কোনো সমস্যা হয়নি।

এরশাদের করে যাওয়া ট্রাস্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিদিশা। তিনি বলেন, খালেদ আখতার সাহেব ট্রাস্টের কেয়ারটেকার। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগই নেই। এখন ওখানে কী সংযোজন বিয়োজন হয়েছে, সেটা আমরা জানি না। লেখা আছে বিদিশা এরশাদ ভোগ করতে পারবে না। বিক্রি করতে পারবে না। আমি তো বিক্রি করতে আসিনি। বা খেতেও আসিনি। এ সময় ট্রাস্টের কাগজপত্র জি এম কাদের সাহেব নিয়ে গেছেন বলে জানান এরিক।

বিদিশা বলেন, এরিক দুদকের কাছে চিঠি দিয়েছে। ওর অনেক মূল্যবান কাগজপত্র, ওর পাসপোর্টও নেই। সবকিছু এখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কে কোথায় টাকা পাচার করছে, কার কত সম্পত্তি, তদন্ত করলে সব জানা যাবে।

সম্পত্তির লোভে এখানে আসিনি উল্লেখ করে বিদিশা বলেন, সম্পত্তি দিয়ে আমি কী করব। আমি এসেছি আমার ছেলের কাছে। আমি আমার ছেলের অভিভাবক। এখানে চাচা কী? আর ট্রাস্ট যদি দেখশোনাই করে তাহলে আমার ছেলেকে যখন মারধর করা হলো, তখন ট্রাস্ট কোথায় ছিল?

তিনি বলেন, জি এম কাদের মনে করছেন আমি রাজনীতিতে আসতে পারি সে জন্যই তিনি এমন করছেন। তিনি চান না আমি কখনো জাতীয় পার্টিতে আসি। আমিও রাজনীতিতে আসতে চাই না।

এর আগে গত শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মেজর (অব.) খালেদ আখতার  সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছেলে ‘এরিক এরশাদকে নিয়ে বিদিশা নাটক করছেন’ বলে অভিযোগ করেন। তিনি বিদিশাকে প্রেসিডেন্ট পার্কে অনুপ্রবেশকারী উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। সেদিন তিনি এ কথাও বলেন, এরিকের দেখভালের দায়িত্ব ট্রাস্টের। ট্রাস্ট ডিসিশন নেবে, এখানে কে থাকবে। এরিক যদি মাকে নিয়ে থাকতে চায়, তবে অন্য খানে থাকতে পারবে, কিন্তু এখানে থাকতে পারবে না।