বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ রুটে সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি বন্ধসহ ১১ দফা দাবিতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে অবিরাম কর্মবিরতি পালন করবে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন। সংগঠনটির নেতারা জানান, চার বছর ধরেই এসব দাবি জানিয়ে আসছে শ্রমিকরা। কিন্তু মালিকপক্ষ বিভিন্ন সময় আশ^াস দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। এবার দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।
কয়েক শ্রমিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, পরিশ্রম অনুযায়ী শ্রমিকদের যে পরিমাণ মজুরি দেওয়া হয়, তা একেবারে ন্যূনতম। তারা জানান, লস্কর পদে তিন ক্যাটাগরিতে ৭ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লে শ্রমিকরা খোরাকি ভাতার দাবি জানালে সেই সময় ১০০-২০০ টাকা বাড়ানো হয়। কিন্তু শ্রমিকরা খোরাকি ভাতার দাবি অব্যাহত রাখে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের সঙ্গে হওয়া চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানালে মালিকপক্ষ ভয়ভীতি দেখিয়ে চাকরিচ্যুত করে। মাঝেমধ্যে মারধরের শিকার হতে হয়। এছাড়া নৌপথে বিভিন্ন রুটে বিআইডবিস্নউটিএর সরকারি ইজারা নীতিমালার তোয়াক্কা না করে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করছে একটি চক্র। প্রশাসনের সামনে এসব ঘটলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিক আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৫ সালে অমীমাংসিত ১৫ দফা দাবি ছিল। এই দাবির প্রেক্ষিতে ২০১৬-১৭ সালে অনেক তাগিদ দিয়েও সমাধান হয়নি। ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট আগের দাবিসহ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এরপর এ বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর নৌপরিবহন অধিদপ্তরে ফেডারেশনের সঙ্গে বৈঠক হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৪ অক্টোবর মালিক, শ্রমিক, অধিদপ্তরের এক আলোচনায় ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। তবে এসব চুক্তি বাস্তবায়ন করেনি মালিক পক্ষ। এ পর্যায়ে চলতি বছর ১৫ এপ্রিল কর্মবিরতি শুরু করলে ১৬ এপ্রিল ত্রিপক্ষীয় আলোচনা করে দাবি মেনে নেওয়ার চুক্তি হয়। সে সময় মালিকপক্ষ বলেছিল, পরবর্তী ৪৫ দিনের মধ্যেই আমাদের দাবি পূরণ করা হবে। কিন্তু এর মধ্যে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ৯৮ দিন পার হলেও কোনো দাবি পূরণ করেনি। এই পর্যায়ে ২৪ জুলাই কর্মবিরতি শুরু হলে এ বছরের ৩০ আগস্টের মধ্যে সব দাবি মেনে নেওয়া হবে এমন আশ্বাসে আমরা ধর্মঘট স্থগিত করেছিলাম।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, দুবার মন্ত্রিসভা আহ্বান করলেও মালিকরা বৈঠকে বসেননি। উল্টো গেজেটের বাস্তবায়ন চাওয়ায় গাজী সালাউদ্দিন লঞ্চের ছয় শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়। মালিকদের ইন্ধনে সদরঘাটে সন্ত্রাসীরা শ্রমিকদের ওপর হামলা করে। সর্বশেষ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় অফিসেও হামলা করা হয়। এসব বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। আমরা ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছি এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ২৮ নভেম্বর থেকে সব ধরনের নৌযান বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করা হবে।
শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কোস্টাল ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া) সিনিয়র সহ-সভাপতি লক্ষণ চন্দ্র বলেন, ফেডারেশনের যে ১১ দফা রয়েছে তার মধ্যে শুধু বেতন এবং ভাতার দাবি আমাদের কাছে। বাকি ৯ দফা প্রশাসনের কাছে। শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি হয়। আজকে তারা যে দাবি করছে সেসব বিষয়ে ২০১৭ সালে আমাদের চুক্তি হয়েছিল যার মেয়াদ ২০২১ সালে শেষ হবে। এরপর আবার নতুন করে চুক্তি হবে। আমরা প্রতিবছর ভেতন ভাতা বৃদ্ধি করে থাকি। বিদেশে যেসব জাহাজ যাতায়াত করে তাদের ভাতা দেওয়া হয়। এখন তারা যে দাবি জানিয়ে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে তা অযৌক্তিক। এছাড়া তাদের আল্টিমেটাম অনুযায়ী আজ বুধবার মালিক, শ্রমিক, প্রশাসনের বৈঠক রয়েছে, সেখানে এই বিষয়ে আলোচনা হবে।
ট্রাফিক বিভাগের পরিচালক মো. আবু জাফর হাওলাদার বলেন, শ্রমিকদের দাবিদাওয়ার বেশিরভাগ বিষয় মালিক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। চাঁদাবাজি নিয়ে তাদের যে অভিযোগ রয়েছে, সেসব অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। ঘাটগুলোতে নির্ধারিত ফি থাকে, এর বাইরে কোনো টাকা নেওয়া হয় না। এসব কথা বলার জন্য বলা হয়ে থাকে। এমন কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। জনবল সংকটের কারণে রিমোট এরিয়াগুলোতে এসব ঘটনা ঘটলে আমাদের কিছু করার থাকে না। তাছাড়া মার্ক, বয়া, বাতি এসব নিয়মিত লাগানো হয়। নৌপথে নাব্যতা সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, নাব্যতা সংকট সমাধানে আমরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছি। এখানে দায়িত্বের কোনো অবহেলা করা হচ্ছে না। আশা করি দ্রুত নৌপথের নাব্যতা ফিরে আসবে।
শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে শ্রম অধিদপ্তরের পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের দাবির বিষয়ে সরকার খুবই আন্তরিক। বুধবার (আজ) দুপুর ১২টায় ও বিকেল ৫টায় মন্ত্রণালয়ে বৈঠক রয়েছে। সেখানে মালিক, শ্রমিক উভয়ে থাকবেন। আশা করি এসব দাবির সমাধান হবে।