পুরান ঢাকার মহানগর দায়রা জজ ভবনের পঞ্চম তলায় গতকাল বুধবার হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা মামলার রায় ঘোষণার পরপরই আট আসামির সবাই উদ্ধত ও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন। কড়া পুলিশ পাহারা থাকলেও তাদের কেউ কেউ সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের এজলাসের ভেতরে, এজলাস থেকে নিচে নামার পথে ও প্রিজন ভ্যানে ওঠার সময় সেস্নাগান দেওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ বিচার না মানার হুঙ্কার দেন; কট‚ক্তি করেন বিচারব্যবস্থা নিয়ে। আবার কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের পতাকার প্রতীক সংবলিত টুপি পরেছিলেন। গতকাল দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের মধ্যে আসামিদের এমন উচ্ছৃঙ্খল ও উদ্ধত আচরণ করতে দেখা যায়।
রায় ঘোষণার পর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গণমাধ্যমকর্মী, আইনজীবী ও উৎসুক মানুষের ভিড় ঠেলে পুলিশ সদস্যরা যখন একে একে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়ে প্রিজন ভ্যানে তোলার চেষ্টা করছিলেন তখন অনেক আসামিকে হাসতে দেখা যায়। দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটের দিকে রাকিবুল হাসান রিগ্যানকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় তার মাথায় কালো রঙের টুপিতে আরবি লেখা দেখতে পাওয়া যায়। তখন উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের অনেকেই বলতে থাকেন, এটি আইএসের প্রতীকের আদলে আরবি লেখা টুপি। এ সময় বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের তার ছবি সংগ্রহের চেষ্টা করতেও দেখা যায়। এরপরই আদালতপাড়ায় সাত আসামির ফাঁসি ও এক আসামির খালাসের রায়ের খবরের চেয়ে জঙ্গিদের মাথায় ‘আইএসের টুপি’ নিয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়।
আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, এজলাসের ভেতরে কারও মাথায় কোনো টুপি ছিল না। এজলাসে ঢোকার সময় কারও কারও মাথায় কালো রঙের টুপি ছিল, যা এজলাসে ঠোকার পর তারা খুলে ফেলেন। রায় ঘোষণার পর আসামিরা যখন এজলাস ছেড়ে নিচে নামছিলেন তখনই রিগ্যানের মাথায় ওই টুপি দেখতে পাওয়া যায়। এ সময় তার সঙ্গে অনেক পুলিশ সদস্য ছিলেন, তারাও বিষয়টি ঠিকমতো খেয়াল করেননি।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কারাগার ও কোর্ট হাজত– এই দুই জায়গার যেকোনো একটি জায়গা থেকে এই টুপি সংগ্রহ করেন আসামি রিগ্যান। কৌশলে টুপিটি নিজের কাছে সংরক্ষণ করেন। বিচারকাজ শেষ হওয়ার পর টুপি পরেন।
আসামিদের মাথায় কীভাবে ওই টুপি গেল– সে বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। কারা মহাপরিদর্শক (আইজি-প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা সাংবাদিকদের জানান, টুপি তারা কীভাবে পেল তা জানতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শককে (কারা) প্রধান করে গঠিত কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, যদি জেলের কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই কথা বলেছেন ডিসি (প্রসিকিউশন) জাফর হোসেন।
এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মামলার তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এ ধরনের পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা বিশেষ কৌশলে তাদের প্রচার চালিয়ে থাকেন। গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ হাসিল করেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েও তারা আরবি লেখা সংবলিত কালো কাপড়ের টুপির মাধ্যমে তাদের শেষ প্রচার সফলতার সঙ্গেই চালিয়ে গেছেন। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) জনসংযোগ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, আইএসের কোনো টুপি নেই। তারপরও আরবিতে লেখা এমন টুপি কোথা থেকে এলো, কার মাধ্যমে তার মাথায় গেল– এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে দেখছে।
সব কারাগারে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে : হলি আর্টিজানে হামলা মামলার রায়ের পর দেশের সব কারাগারে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক। গতকাল বিকেলে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।