কর্ম সক্রিয়তার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় তারুণ্য। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পাবলিক সার্ভিস কমিশন পিএসসির সময় ড়্গেপণের জন্য লাখো তরুণের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টা ক্ষয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ হারাচ্ছে বয়স।
প্রতি বছর একটি বিসিএস আয়োজন করার কথা থাকলেও সাংবিধানিক এ সংস্থাটি তিন বছরেও একটি বিসিএস শেষ করতে পারছে না। সরকার ক্যাডার কর্মকর্তাদের শূন্য পদের চাহিদা জানানোর পর সেই চাহিদাপত্র নিয়ে সংস্থাটি ৭ মাস বসে থেকে গতকাল বুধবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রার্থীর বয়স ১ নভেম্বর থেকে গণনা করা হবে। এক মাস আগের তারিখ থেকে প্রার্থীর বয়স গণনা করা হলে সেটা সরকার যে তারিখে ক্যাডারের শূন্য পদের চাহিদা জানিয়েছে সেই তারিখ থেকেই ঘোষণা করা যুক্তিযুক্ত হতো বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তাতে করে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থীর চাকরির বয়স পার হয়ে যেত না।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় গত ৯ মে পিএসসির হাতে বিভিন্ন ক্যাডারের শূন্য পদের তালিকা তুলে দিয়ে জরুরিভিত্তিতে ৪১তম বিসিএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করার অনুরোধ জানায়। এর প্রায় সাত মাস পর গতকাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাহিদা জানার এত দীর্ঘ সময় পর আর কখনোই কোনো বিসিএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি পিএসসি।
ক্যাডার না পাওয়া বিসিএস উত্তীর্ণদের নন-ক্যাডার পদে চাকরি দেওয়ার সুপারিশ করার দায়িত্ব নেওয়ার পর পিএসসি যখন কোনো কিছুই সময়মতো শেষ করতে পারছে না– তখনই সংস্থাটির কাঁধে নতুন দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও সরকার পিএসসির মাধ্যমে করতে চাচ্ছে। এটি করা হলে যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটুকুও নষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৩৪তম বিসিএসের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিসিএসের আবেদন করার সময় আমার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল দুজন। আমি ও আমার স্ত্রী। কিন্তু যেদিন ফল বের হলো সেদিন আমরা চার জনের সংসারে পরিণত হয়েছি। ওই বিসিএসের নিয়োগ পেতে ৪০ মাস সময় লেগেছিল।
৪১তম বিসিএসের চাহিদাপত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পিএসসিতে পাঠানোর পর দেশ রূপান্তরে এ সংক্রান্ত সংবাদ ছাপা হয়। তখন থেকে বেশ কিছু চাকরিপ্রার্থী ধারাবাহিকভাবে কবে নাগাদ ৪১তম বিসিএসের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হবে তা জানার জন্য যোগাযোগ করেন। তারা আকুল হয়ে জানান তাদের বয়স পার হয়ে যাওয়ার কথা।
বর্তমানে একটি বিসিএস শেষ করতে কমপক্ষে তিন বছর লেগে যায়। ২৪ বা ২৫ বছর বয়সে লেখাপড়া শেষ করা একজন তরুণের একটি দীর্ঘ সময় চলে যাচ্ছে বিসিএস পরীক্ষায়। ৪০তম বিসিএসে সাড়ে চার লাখ প্রার্থী আবেদন করেছেন। ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত তারা এ পরীক্ষা দিয়ে যান।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার এখনো একক বৃহত্তম চাকরিদাতা। একদিকে সরকারের সাড়ে তিন লাখের মতো শূন্য পদ। অন্যদিকে লাখ লাখ বেকার। এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য পিএসসিকে সময়াবদ্ধ পরিকল্পনা করতে হবে।
পিএসসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ৪১তম বিসিএসে ২ হাজার ১৬৬ জনকে নেওয়া হবে। ৫ ডিসেম্বর থেকে এই বিসিএসের জন্য আবেদন করা যাবে। জানুয়ারির ৪ তারিখের মধ্যে প্রার্থীকে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা হলেও এই বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধাদের পুত্র-কন্যা প্রার্থীদের জন্য বয়স সর্বোচ্চ ৩২ বছর রাখা হয়েছে।
এই বিসিএসে সবচেয়ে বেশি নেওয়া হবে শিক্ষা ক্যাডারে। এই ক্যাডারে ৯০৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে বিসিএস শিক্ষায় ৮৯২ জন প্রভাষক, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের জন্য ১৩ জন প্রভাষক নেওয়া হবে। শিক্ষার পর বেশি নিয়োগ হবে প্রশাসন ক্যাডারে। প্রশাসনে ৩২৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। পুলিশে ১০০ জন, বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে সহকারী সার্জন পদে ১১০ জন ও সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে ৩০ জনকে নেওয়া হবে। পররাষ্ট্রে ২৫ জন, আনসারে ২৩ জন, সহকারী মহা-হিসাবরক্ষক (নিরীক্ষা ও হিসাব) ২৫ জন, সহকারী কর কমিশনার (কর) ৬০ জন, সহকারী কমিশনার (শুল্ক ও আবগারি) ২৩ জন ও সহকারী নিবন্ধক ৮ জন নেওয়া হবে। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগে পরিসংখ্যান কর্মকর্তা ১২ জন, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সহকারী যন্ত্র প্রকৌশলী ৪ জন, সহকারী ট্রাফিক সুপারিনটেনডেন্ট ১ জন, সহকারী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক ১ জন, সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ২০ জন, সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) ৩ জন নেওয়া হবে। তথ্য কর্মকর্তা বা গবেষণা কর্মকর্তা পদে ২২ জন, সহকারী পরিচালক (অনুষ্ঠান) পদে ১১ জন, সহকারী বার্তা নিয়ন্ত্রক পদে ৫ জন, সহকারী বেতার প্রকৌশলী পদে ৯ জন, স্থানীয় সরকার বিভাগে বিসিএস জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলে সহকারী প্রকৌশলী পদে ৩৬ জন, সহকারী বন সংরক্ষক পদে ২০ জন। সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল পদে ২ জন, বিসিএস মৎস্যে ১৫ জন, পশুসম্পদে ৭৬ জন, কৃষি স¤প্রসারণ কর্মকর্তা ১৮৩ জন ও মৃত্তিকা সম্পদের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ৬ জন, কৃষি বিপণন কর্মকর্তা ৪১, বিসিএস বাণিজ্যে সহকারী নিয়ন্ত্রক ৪ জন। পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ৪ জন, বিসিএস খাদ্যে সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক ৬ জন ও সহকারী রক্ষণ প্রকৌশলী ২ জন, বিসিএস গণপূর্তে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) ৩৬ জন ও সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) ১৫ জনসহ মোট ২ হাজার ১৬৬ জন কর্মকর্তাকে এই বিসিএসে নিয়োগ করা হবে।