জাপানি অর্থায়নে সব প্রকল্প পিছিয়েছে ২ বছর পর্যন্ত

গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় থমকে গিয়েছিল জাপানি সহায়তানির্ভর সব প্রকল্পই। নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সহায়তানির্ভর প্রকল্পেও। পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারসহ সরকারের নানা প্রচেষ্টায় স্বাভাবিক হতে থাকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। তবে কর্মকাণ্ডে গতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আনতেই জাপানি অর্থায়নের ছোট-বড় সব প্রকল্পের বাস্তবায়নের সময় গড়ে দেড় থেকে দুই বছর পিছিয়ে যায়। এতে বেড়েছে প্রকল্প ব্যয়। এখন বাড়তি খরচ হচ্ছে নিরাপত্তা কার্যক্রমেও।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা, যার মধ্যে ৭ জন ছিলেন জাপানের। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডো অভিযানে হামলাকারী ৫ জঙ্গিসহ ৬ জন নিহত হন। উদ্ধার করা হয় দেশি-বিদেশি জিম্মিদের। দেশ-বিদেশে আলোচিত ওই হামলার মামলায় গত বুধবার রায় হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই হামলা একদিকে দেশের ইমেজ সংকট সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছে। এর ধকল এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সেটা নিশ্চিতে সব ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, হামলায় নিহত ৭ জাপানির মধ্যে ৬ জনই ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভুক্ত ১০টি মেগা প্রকল্পের অন্যতম মেট্রোরেল প্রকল্পের পরামর্শক। হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে জাপানের অন্যান্য প্রকল্পের কর্মকর্তারাও দেশ ছাড়েন। সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় অর্থ ছাড়। পরবর্তী সময়ে ওইসব কর্মকর্তা দেশে ফিরলেও কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হতে সময় লেগে যায়। এতে গড়ে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় পিছিয়ে যায় দেড় থেকে দুই বছর। সময় বাড়ায় ইতিমধ্যে কিছু প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়াতে হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারেও সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে বরাদ্দ দিতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে নাম প্রাশে অনিচ্ছুক ইআরডির জাপান ডেস্কের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, হলি আর্টিজানের ঘটনার পর পিছিয়ে যাওয়া প্রকল্পে বাড়তি কত টাকা লাগল, তার হিসাব আলাদাভাবে নিরূপণ করা হয়নি। কারণ, সবই ছিল চলমান প্রকল্প। একটি প্রকল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ হিসাব করা কঠিন। তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে গেছে। আর প্রকল্প বাস্তবায়নে বাড়তি সময় মানেই বাড়তি ব্যয়।    

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কেমন প্রভাব ফেলেছে সে বিষয়ে জানতে চাইলে ইআরডি সচিব মনোয়ার আহমেদ গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, হামলাটি বাংলাদেশের জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এতে জাপানসহ অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সহায়তানির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নে হোঁচট খেতে হয়েছে। তবে এই সমস্যা আমরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। তিনি বলেন, হামলার পর জাপানের পক্ষ থেকে দুটি শর্ত দেওয়া হয়েছিল। একটি হলো নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারকরণ, অন্যটি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দুটি কাজই আমরা সফলভাবে করতে পেরেছি। ভবিষ্যতে যেন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কর্মরত বিদেশিদের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ঘটতি যেন না থাকে, সে বিষয়ে আরও সতর্ক হয়েছি। এখন সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছে।

ইআরডি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপান। এর মধ্যে স্বপ্নের মেট্রোরেল অন্যতম। এই প্রকল্পের কাজ জঙ্গি হামলার কারণে পিছিয়ে যায়। ২০১২ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের জুলাই মাসের মধ্যে। কিন্তু হয়েছে মাত্র ৩৪.৫৮ শতাংশ। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রকল্পে কাজ ২০১৯ সালেই উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু হয়নি। ২০২১ সাল নাগাদ ওই অংশের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সম্পªতি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনার কারণে আমরা মেট্রোরেলের কাজে পিছিয়ে গেছি। তবে এখন দ্রুত কাজ শেষ করার সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

একই অবস্থা জাপানি অর্থায়নের অন্যান্য প্রকল্পেরও। এর মধ্যে সময়মতো সঠিক পূর্বাভাস পেতে ‘আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঢাকা ও রংপুরের কার্যালয়ের রাডারের উন্নয়ন প্রকল্প’ অন্যতম। হলি আর্টিজানে হামলার পর জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) অর্থ ছাড় না করায় এ প্রকল্পের কাজ থমকে গেছে। অবশ্য ইআরডির তৎপরতায় চার বছর পর অর্থ ছাড় করতে রাজি হয়েছে জাইকা।

ইআরডি সূত্র জানায়, আবহাওয়া অধিদপ্তরের রাডারের উন্নয়নে ২০১৬ সালে চার বছর মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এক পয়সাও দেয়নি জাইকা। এবার নতুন করে এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে রাজি হয়েছে সংস্থাটি। তবে নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়। বাস্তবায়নের  মেয়াদ ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুনের পরিবর্তে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন করা হয়েছে।

অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারেও করতে হচ্ছে আলাদা ব্যয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হলি আর্টিজানে হামলার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে আটকে যায় কাঁচপুর,  মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যমান সেতু পুনর্বাসন প্রকল্প। চার মাস কাজ বন্ধ থাকার পর বিদেশিদের বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজ শুরু হয়। এই বাড়তি নিরাপত্তার জন্য ওই প্রকল্পে মূল বরাদ্দের বাইরে ৫০২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান গত মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে জাইকার  অর্থায়নে ৪০টি প্রকল্প চলমান। সবগুলোরই কাজ চলছে ঠিকঠাকভাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাইকা যতগুলো প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে, সবগুলোই চলমান আছে। হলি আর্টিজানের ঘটনায় চলমান কাজের কিছুটা ক্ষতি করেছিল। কিছুদিন আগে জাইকার এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের কাছে আমি বারবার জিজ্ঞাসা করেছি, আর কোনো সমস্যা আছে কি-না। তারা বলেছিল, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। এটা আর আমাদের মনের মধ্যে নেই।’ মান্নান আরও বলেন, ‘বর্তমানে সার্বিকভাবে পরিস্থিতি খুব ভালো। তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকার যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, তাতে তারা সন্তুষ্ট।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা অফিসের পরামর্শক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই হামলায় ধকল এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। হামলায় মেট্রোরেল প্রকল্পের পরামর্শক মারা যায়, এতে অন্য পরামর্শকরাও দেশ ছাড়ে। এছাড়া বাংলাদেশকে ‘নো হোম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে বিদেশি কর্মকর্তাদের বউ-বাচ্চা দেশ ছেড়ে চলে যায়। একই সঙ্গে হলি আর্টিজানের ঘটনার আগে বিদেশিরা যেকোনো হোটেলে থাকতে পারত, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারত। এখন সেটা পারে না। এতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আশার কথা হলো বাংলাদেশ সরকার এরপর ওই ধরনের ঘটনার কোনো পুনরাবৃত্তি হতে দেয়নি। এটা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ যেন ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকে সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।