পেঁয়াজ সংকট

উৎপাদন বৃদ্ধি ও পচন রোধে সমাধান খুঁজছে সরকার

দেশে তিন মৌসুমে পেঁয়াজ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে জুলাই-আগস্ট ও জানুয়ারি-ফেব্রম্নয়ারি মৌসুমে উৎপাদন হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গ্রীষ্মকালীন একটি জাত আবাদের সুযোগ থাকলেও বেশি খরচ ও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার শঙ্কায় উৎপাদনে আগ্রহ নেই কৃষকদের। দুই মৌসুমে গত অর্থবছরে (২০১৮-১৯) যে পরিমাণ উৎপাদিত হয়, তার চেয়ে চলতি অর্থবছরে (২০১৯-২০) ৫৬-৬০ হাজার টন বেশি উৎপাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবু দেশের চাহিদা মিটবে না। এরই মধ্যে বাজারে স্বল্প পরিমাণ আগাম দেশি পেঁয়াজ আসছে, তবে ১৫০-১৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশ রূপান্তরের শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, পাবনা, রাজশাহী, শেরপুর, নাটোর, নওগাঁ প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহ থেকে কৃষকরা আগাম দেশি পেঁয়াজ পুরোপুরি তোলা শুরু করলে পণ্যটির দাম আরও কমবে। দেশি পেঁয়াজ প্রায় ২৪ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে অনেক পেঁয়াজ পচে নষ্ট হয়। তাই বাকি চাহিদা আমদানিনির্ভরতায় মেটাতে হবে। যদি আন্তর্জাতিক পরিসরে সংকট সৃষ্টি হয় তাহলে দেশেও তার প্রভাব পড়বে। এজন্য পেঁয়াজের উৎপাদন ও পচন রোধের মাধ্যমে এ সংকট সমাধানের পথ খুঁজছে সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে মাচা পদ্ধতির ব্যবস্থা করা গেলেও সমস্যা লাঘব হবে। শুধু পচন রোধ করা গেলেই হাজার কোটি টাকা বাঁচবে।

দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা কত তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই কারও কাছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ২৪-২৫ লাখ টন। চলতি অর্থবছর দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত মৌসুমে গত অর্থবছর দেশে ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৫০ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। এর আগের ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ ৩০ হাজার টন। তবে সংরক্ষণের অভাবে এর প্রায় ২৫ শতাংশ পচে যায়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারলে এই হার ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব। এতে বার্ষিক প্রায় আড়াই লাখ টন বা সেপ্টেম্বর-নভেম্বরের স্বাভাবিক মূল্য অনুযায়ী ১ হাজার কোটি টাকার পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে।

এ বিষয়ে কৃষি সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক চণ্ডি দাস কুণ্ডz দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে পেঁয়াজের বড় একটি অংশ পচে যায়। এই বিশাল পরিমাণ পেঁয়াজ কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করাও সম্ভব নয়। এজন্য কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণ বাড়ানোর বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি। ব্যাংক যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঋণ দিত তাহলে কৃষকরা আগ্রহী হতেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণ বাড়াতে হলে প্রয়োজন স্বল্প সুদে কৃষিঋণ। কিন্তু ব্যাংক কৃষকদের ঋণ দেওয়ার বিষয়ে বরাবরই অনীহা দেখায়। এ কারণে কৃষকরা চাষাবাদের শুরুতে ব্যাপারীদের থেকে দাদন (উচ্চ সুদে ঋণ) নিয়ে থাকে। এজন্য কম মূল্যে মৌসুমের শুরুতে তারা পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে পেঁয়াজের জন্য আলাদা হিমাগার নির্মাণ হয়নি। কৃষকরাও ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ না নিয়ে মহাজনের দাদন নেওয়ায় অভ্যস্ত। তাই ঋণ শোধ করতে মৌসুমের শুরুতেই সব পেঁয়াজ বিক্রি করে দেয়। কিন্তু তারা চাইলেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারে।’ ব্যাংক কৃষককে ঋণ দিতে অনীহা দেখায় কি না– জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সব ব্যবস্থাপককে বলে দিয়েছি ঋণ দেওয়ার জন্য। এখন অনেকেই আসেন ন্যূনতম কাগজপত্র ছাড়া। তাদের কীভাবে ঋণ দেব? কৃষকদের পাশাপাশি কেউ যদি কোল্ডস্টরেজ বা সংরক্ষণ করতে চায় তাহলে তাদের সহজেই ঋণ দেওয়া হবে।’ পেঁয়াজের সংকট সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রীষ্মকালীন জাতটি কৃষক চাষ করতে চায় না কম লাভের ভয়ে। এটির যারা আবিষ্কারক তাদের বিষয়টি আরও গবেষণা করে ত্রুটিগুলো দূর করে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কৃষক লাভ খোঁজে। প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে মাচা পদ্ধতিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলেও সমস্যা লাঘব হবে। শুধু পচন রোধ করা গেলেই হাজার কোটি টাকা বাঁচবে।’

চলতি বছর দাম বেশি থাকায় পেঁয়াজ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বেশি। তাদের আশা, মৌসুম শুরু হলে আমদানি বন্ধ করা গেলে দাম ভালো পাওয়া যায়। এতে কৃষকরা উৎসাহিত হয়ে আবাদ বাড়াবে। ফরিদপুরের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মন্টু মিয়া বলেন, আগের বছরগুলোতে পেঁয়াজের দাম পাইনি। কিন্তু এবার দাম বেশি থাকায় সবার মধ্যেই আগ্রহ বেশি। আশা করি এবার সবাই ন্যায্য দাম পাব। এছাড়া কীভাবে সংরক্ষণ বাড়ানো যায় সেই বিষয়টিও মাথায় আছে। তবে ভারতের পেঁয়াজ মৌসুমে বাজারে এলে পথে বসতে হবে।’

এদিকে নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসার দিকে তাকিয়ে আছে সরকার, বিক্রেতা ও ভোক্তা। এদের প্রত্যেকের আশা, নতুন পেঁয়াজ বাজারে এলে সংকট দূর হবে। গতকাল বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি গত ২২ নভেম্বর বলেন, বাজারে এখন পেঁয়াজের সরবরাহ না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। আগামী মাসের শুরু দিকে নতুন পেঁয়াজ এলে দাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

ভোক্তা ও সরকার নতুন পেঁয়াজের আগমনে দাম কমার বিষয়ে আশাবাদী থাকলেও বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, এবার কৃষকরা বাড়তি দামে পেঁয়াজ কিনে লাগিয়েছেন। তাই মুড়িকাটা পেঁয়াজের আগমনে দাম কিছুটা কমলেও আগের চেয়ে বাড়তি থাকবে। কারওয়ানবাজারের পেঁয়াজ বিক্রেতা জুয়েল বলেন, ‘আমরা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে চলছি। তারাও এবার বাড়তি লাভ করতে চায়। এছাড়া তাদের খরচও বেশি হয়েছে। তাই মার্চের আগে ৮০-৯০ টাকার নিচে দেশি পেঁয়াজ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।’

এদিকে গতকাল জাতীয় সংসদে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমাদের নিজস্ব উৎপাদন বাড়াতে হবে। পেঁয়াজের আমদানি শুরু হয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। পেঁয়াজের দাম বাড়াটা অনেকটা আকস্মিক। ভোক্তা অধিকার ট্যারিফ কমিশন, টিসিবিসহ সবাইকে নিয়ে আমরা আজ বৈঠক করেছি। বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে আগামী রমজানের আগেই দ্রব্যমূল্যের বাজার যেন স্বাভাবিক থাকে এ ব্যাপারেও আলোচনা হয়েছে। এজন্য আমরা বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নিয়ে আগামীতে একটি সভা করব। সভায় যারা পণ্য আমদানি করেন শুধু তারাই থাকবেন তা নয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ট্যারিফ কমিশন, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ সবাইকে নিয়ে সভাটি করব। সভায় পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা কত? কী পরিমাণ আমদানি হয় সেটি আলোচনা হবে এবং সে রকমভাবেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে করে আকস্মিকভাবে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধির যে ঘটনাটি ঘটেছে তা আর হবে না। চালের মতো পেঁয়াজেও আমাদের আমদানি ও উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং উৎপাদন বাড়িয়ে আমরা যাতে পেঁয়াজ রপ্তানি করতে পারি সে বিষয়েও আলোচনা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতি মাসে আমাদের এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়। সেখানে বর্তমানে ২৫ হাজার টন আমদানি হচ্ছে। ৭৫ হাজার টন পেঁয়াজ ঘাটতি রয়েছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি বা শেষ সপ্তাহের মধ্যে পেঁয়াজের দাম কমবে। মিসর থেকে পেঁয়াজের প্রথম চালান এসেছে। আরও বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আসছে, সেগুলো এলে পেঁয়াজের দাম কমে যাবে।

টিসিবির পেঁয়াজের চাহিদা বেশি : রাজধানীসহ সারা দেশে সরকারের বিপণন সংস্থা টিসিবি ৪৫ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। প্রতিটি ট্রাকে ১ টন পেঁয়াজ দেওয়া হলেও চাহিদা এর থেকেও বেশি। তাই রাজধানীর প্রায় সবকটি ট্রাকেই পেঁয়াজ বিক্রি শেষ হলেও লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে পেঁয়াজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই অবস্থা রাজধানীর বাইরের ট্রাকগুলোতেও। এতে ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে আপাতত টিসিবির ট্রাকের সংখ্যা ও পেঁয়াজের পরিমাণ বাড়ানোর সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

দেশি পেঁয়াজ এখনো ২৪০ : গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ২৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমার ২২০, মিসর ১৬০-১৭০ ও চীনের পেঁয়াজের কেজি ১২০-১৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া দেশি নতুন পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হয়েছে ১৪০-১৬০ টাকা পর্যন্ত।