দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। রাজধানী ঢাকার বড় হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর কিংবা জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে অভিযোগের ধরন ভিন্ন হলেও সেবা নিয়ে অভিযোগ এন্তার। মফস্বল পর্যায়ে রোগী এবং রোগীর স্বজনদের প্রধান অভিযোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসাসেবায় যথাযথ সহায়তা না পাওয়ার। রাজধানী বা বড় শহরগুলোর সরকারি হাসপাতালে সরকারি ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণের বদলে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় কিংবা সেগুলো সরবরাহ না করে বাইরে থেকে কিনতে বলার অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে বেশিরভাগই অব্যবস্থাপনা এবং রোগী ও রোগীর স্বজনদের হয়রানির। এই চিত্র সবারই কমবেশি জানা। কিন্তু সম্প্রতি সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা ও ব্যবস্থাপনার সংকটের পাশাপাশি মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কেনাকাটায় দুর্নীতি ও অসাধু সিণ্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে দুর্নীতির যেসব খবর সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তা খুবই উদ্বেগজনক।
সরকারি হাসপাতালে ক্রয়-দুর্নীতি কতটা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে তা উঠে এসেছে সোমবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘সোহরাওয়ার্দীর পরিচালককে দুদকে তলব’ শিরোনামের প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে মেডিকেল যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়ম ও শত-কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অপারেশন থিয়েটারের জন্য একটি ওটি লাইট কেনা হয় ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা দরে। সরকারি ক্রয় নির্দেশিকায় এর সর্বোচ্চ দাম ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ দুটি ওটি লাইট কিনে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। একইভাবে মাত্রাতিরিক্ত দামে দুটি কোবলেশন মেশিন কিনে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। ভেন্টিলেটরসহ অ্যানেসথেসিয়া মেশিন কেনা হয়েছে ৫৮ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকায়। নির্দেশিকায় যার সর্বোচ্চ ক্রয়সীমা ৭ লাখ ৭৮ হাজার ৬০০ টাকা। একইভাবে, মাত্রাতিরিক্ত দামে কিডনি চিকিৎসার লিথোপ্রিপসি মেশিন কেনা, অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করা এবং লাশ রাখার অবকাঠামো নির্মাণ না করেই ডিপ ফ্রিজ কেনা, ২ কোটি টাকায় এন্ডোসকপি মেশিন অব্যবহৃত ফেলে রাখা, ৩ কোটি টাকায় ইএনটি লেজার মেশিন কিনে ফেলে রাখাসহ বিভিন্ন বিভাগের জন্য অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এসব অনিয়মের প্রায় সবই হয়েছে হাসপাতালটির পরিচালকের নেতৃত্বে। দুর্নীতির মাধ্যমে এসব কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি একটি সিন্ডিকেট এবং এমনকি একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, ১৪ ফেব্রুয়ারি ওই হাসপাতালে যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল তা আদতে দুর্ঘটনা নয়, বরং নানা আলামত নষ্টের জন্য পরিচালকের কারসাজি বলেও অভিযোগ করেছেন অগ্নিকাণ্ডে ঘটনা তদন্তকারী প্রকৌশলীরা। একইসঙ্গে হাসপাতালটির পরিচালকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অর্থে চট্টগ্রাম বৌদ্ধ মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় জমিসহ দুটি ভবন কেনা, ঢাকার ইন্দিরা রোডে দুই হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট কেনা, ধানমণ্ডিতে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট কেনা, শ্যামলী স্কয়ারে দোকান কেনাসহ নামে-বেনামে বিপুল অর্থসম্পদ গড়ার অভিযোগ উঠেছে। দেশের বাইরে মালয়েশিয়ায় ফ্ল্যাট কেনা এবং সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে ফ্ল্যাট কেনার জন্য অগ্রিম টাকা দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, কোনো চিকিৎসক নন, যেন একজন অসাধু ঠিকাদার বা সম্পদ ব্যবস্থাপক ওই হাসপাতালের পরিচালক পদে নিয়োজিত রয়েছেন। আশা করা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে ওই হাসপাতালে সংঘটিত দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র প্রকাশিত হবে এবং দুর্নীতিতে জড়িত সবার যথাযথ বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, একটি সরকারি হাসপাতালের পরিচালক এবং তার সহযোগীরা কয়েক বছরের মধ্যে এত বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি করতে পারলেন কীভাবে? সরকারি ক্রয় নীতিমালার নজরদারি এড়ালেন কীভাবে? হিসাব বিভাগের নিরীক্ষাতেই বা এসব ধরা পড়ল না কেন? একইসঙ্গে এই প্রশ্নও জরুরি যে, একটি হাসপাতালেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে দেশের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে কেনাকাটায় আসলে কতটা দুর্নীতি হয়েছে? স্বাস্থ্য খাতে যথাযথ সেবা না পাওয়ার অন্তহীন অভিযোগের মধ্যে হাসপাতালে এমন লুটের খবর যে কোনো সচেতন নাগরিককেই উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। তবে, আশার কথা হলো, সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্য খাতে এমন দুর্নীতির অনুসন্ধানে বিশেষ টিম গঠন করেছে এবং ইতিমধ্যেই তদন্তে নেমেছে। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও তিনজন সিভিল সার্জনের কাছে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের কেনাকাটার নথি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। পর্যায়ক্রমে জেলা এবং প্রয়োজনে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটাও খতিয়ে দেখবে তারা। এছাড়া, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করেছে দুদক। জনগণের অর্থে পরিচালিত সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুর্নীতি থামিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।