কুষ্টিয়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কারসাজি

চালের গুজব ছড়িয়ে ধানের দাম ফেলার চেষ্টা

দেশের অন্যতম বৃহৎ চালের মোকাম কুষ্টিয়ায় চালের দাম কমছে প্রচার করে চালকল মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কারসাজি করে ধানের দামে ধস নামানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের ভাষ্য, কম দামে ধান কিনতে এটি চালকল মালিকদের নতুন ষড়যন্ত্র। গত মৌসুমেও তারা ভিন্ন কৌশলে কিছুদিনের জন্য ধান কেনা বন্ধ রেখে কৃষকদের কম দামে ধান বেচতে বাধ্য করেছিলেন। তবে চালকল মালিকদের দাবি, চাল সরবরাহে মন্দার কারণে মিল চালু রাখার স্বার্থে চালের দাম কেজিপ্রতি ২ টাকা কমানো হয়েছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়ার বাজারে হঠাৎ করেই তিন দিন আগে চাউর হয় যে প্রশাসনের চাপে মিলাররা চালের দাম কেজিপ্রতি ২ টাকা কমিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে খুচরা বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই বলে জানান ক্রেতারা। এছাড়া চালের দাম কেজিপ্রতি এক টাকাও কমেনি বলে দাবি পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের।

কুষ্টিয়া শহরের আমলাপাড়ার বাসিন্দা হাজি গোলাম মহসিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুদিন আগে পত্রিকায় দেখলাম চালের দাম মিলাররা কেজিতে ২ টাকা কমিয়েছে। কিন্তু বাজারে তো দেখি যা ছিল তাই আছে। এসবের মানে কী? এসব দেখার কি কেউ নাই?’

শহরের মিউনিসিপ্যাল মার্কেটের খুচরা চাল বিক্রেতা বাবুল আকতার বলেন, ‘চালের দাম কমেছে, আপনারা এসব সংবাদ কোথায় পান? আমরা মিলারদের কাছ থেকে যে দামে এনেছি, তাতে কেজিতে মাত্র ১ টাকা লাভ রেখে বিক্রি করছি। মিলাররা যদি দাম কমিয়ে থাকে, তাহলে সেখানে গিয়ে চাল কেনেন।’ এই ব্যবসায়ী জানান, কুষ্টিয়ার খুচরা বাজারে এক সপ্তাহ আগেও মিনিকেট চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৪৯-৫০ টাকা, এখনো তা অপরিবর্তিত আছে।

শহরের বড়বাজারের চালের পাইকারি আড়তদার আলী নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত মাসের (নভেম্বর) প্রথম সপ্তাহে মিলগেটে মিনিকেট চাল এক লাফে ৪০-৪২ টাকা থেকে বেড়ে ৪৬ টাকা হয়ে যায়। এ দামের কোনো হেরফের এখনো হয়নি। মিলাররা সাংবাদিকের কাছে চালের দাম কমানোর কথা বললে তো আর হবে না। আড়তে কম রেটে চাল এলেই আমরা বুঝব চালের দাম কমেছে।’

এদিকে চালের দাম কমার মিথ্যা তথ্য প্রচার করে চালকল মালিকরা কম দামে ধান কিনে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার চেষ্টা করছে বলে ভাষ্য স্থানীয় কৃষকদের। গতকাল দুপুরে সদর উপজেলার হররা গ্রামে মাঠ থেকে কাটা ধান মহিষের গাড়িতে বোঝাই করছিলেন কৃষক আলীম শেখ। এ সময় সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোলেন আবার কী মতলবে আপনেরা আইচেন? আপনেরা তো অটো মিল আলারে খবর ল্যাকেন, যারা ধানের দাম, চালির দাম ইচ্চামোতো বাঁধি দেয়। আপনেরা সরকারেক বোলেন, চাষির দিক ইকটু তাকাইক। না হলি আমরা মরি সাইরি যাচ্ছি। আর দুই-একদিনির ভিতরি চাষিরা পুরাদোমে ধান বেচপি, আবার শুনতিচি মিল আলারা চালির দাম কুমা দেচে। আমার মনে হচ্চে উরা এই কতা প্রচার করি ধানের দাম কুমা দিতি চাই। বাজারে চালির দাম তো একনও হাই। ধানের দাম যা ছিলো তাও কুমা ফ্যালার পাঁয়তারা করতেচে। এক মণ ধান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বেচতি হলি চাষিরা আর ধানই লাগানি বন্ধ করি অন্যকিছুত চইলি যাবি।’

একই দিন বিকেলে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় সদর উপজেলার টাকিমারা গ্রামের কৃষক মুন্নাফ শেখের। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখন ধান লাগবি না, এই বুলে গত বতরেও মিল মালিকরা ধানের দাম কমা ফেলিছিলো। এবার আবার আমারে ধান কাটা শেষির দিক, দুই-এক দিনের মধ্যে কৃষকদের ধান বেচতি হবি। এতা উরা ভালোই জানে। চালের দাম দুই টাকা কমিছি প্রচার করে ধানের দাম এখন কমাতি হবি। এসব ক্ষতি আমারে চাষির ঘাড়ে আসেই পড়ে। সরকার এদিক একটু খেয়াল দিলি আমরা বাঁচতি পারি।’

এদিকে কৃষক ও খুচরা বিক্রেতা এবং চালকল মালিকদের মধ্যকার পরস্পরবিরোধী এই ক্ষোভ নিরসনে ধান-চাল বিক্রিতে সরকারি নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করছে মেজর অটো ও হাস্কিং রাইস মিল মালিক সমিতি।

মিলগেটে চালের দাম কেজিতে ২ টাকা কমানো হয়েছে মিলারদের এ দাবির ব্যাপারে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার খাজানগরের দাদা রাইস মিলের মালিক এবং মেজর অটো ও হাস্কিং রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের মোকামে প্রতিদিনের উৎপাদিত ১২ হাজার মেট্রিক টন চালের সরবরাহ অর্ডার না পাওয়ায় মিল চালু রাখার স্বার্থে বাধ্য হয়ে দাম কেজিপ্রতি ২ টাকা কমিয়েছি। তবুও পাইকারদের কাছ থেকে তেমন সাড়া পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের মিলই বন্ধ হয়ে যাবে।’

তবে মিলগেটে চালের দাম কমালেও বাজারে খুচরা ও ভোক্তাপর্যায়ে এর কোনো প্রভাব না পড়ার কারণ জানতে চাইলে জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘গত মাসের প্রথম দিকে মিলগেটে সবরকম চিকন (মিনিকেট) চালের দাম কেজিপ্রতি ৫-৬ টাকা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখে অধিকাংশ পাইকার ও আড়তদাররা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চাল কিনে গুদাম ভরেছে। বেশি দামে কেনা ওইসব চাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা দাম কমালেও প্রকৃত অর্থে খুচরা বাজার বা ভোক্তাপর্যায়ের এর প্রভাব পড়েনি। এ কারণে আরও অন্তত ৭ থেকে ১০ দিন পর খুচরা বাজারে দাম কমবে। তবে এখানে বাজার মনিটরিংয়েও দুর্বলতা আছে।’

ধান ও চালের দামের নিয়ন্ত্রণ মিলারদের হাতেÑ চাষিদের এমন অভিযোগ নাকচ করে এই চালকল মালিক নেতা আরও বলেন, ‘এসব নিয়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ না দিয়ে বরং সরকার সব পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে একটা কঠোর নীতিমালা করুক। ধান উৎপাদনের খরচ, চাল উৎপাদনের খরচ ও পরিবহন খরচ আমলে নিয়ে সরকারের খাদ্য বিভাগই সঠিক দাম নির্ধারণ এবং তার বাস্তবায়ন করুক। আমরা কখনই চাই না কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হোক, কারণ ওরাই আমাদের কাঁচামালের মূল উৎস।’

চালের দাম কেজিতে ২ টাকা কমেছেÑ মিলারদের এমন দাবির কোনো প্রতিফলন খুচরা ও পাইকারি বাজারে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন কুষ্টিয়া জেলা বাজার কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম। আর বাজার মনিটরিংয়ে দুর্বলতার অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর ও প্রশাসনের সমন্বয়ে অভিযান চালাচ্ছি।’

চালের দাম কমানোর প্রচারণা চালিয়ে মিলারদের কম দামে ধান কেনার প্রচেষ্টার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন নতুন ধান উঠছে, স্বাভাবিকভাবেই চালের দাম কিছুটা কমে আসবে। চালের দাম মিলাররা কমানোর প্রচার চালিয়ে ধানের দামে ধস নামানোর চেষ্টা হচ্ছে, কৃষকদের এমন আশঙ্কা করার কোনো কারণ নেই। কৃষকরা যাতে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রয় করতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ জেলা প্রশাসন গ্রহণ করবে।’