দেশের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কাজের অগগ্রতির জন্য এ বছরের জুলাই মাসে নীতিমালা জারি করেছে সরকার। বলা হয়েছে, ‘দেশজ প্রাকৃতিক তেল/গ্যাস অনুসন্ধান নীতিমালা, ২০১৯’-এর আওতায় এখন থেকে অনুসন্ধান চালানো হবে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম স্বাক্ষরিত এ নীতিমালা গত ১৯ নভেম্বর জারি করা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী পেট্রোবাংলা ও এর আওতাধীন সংশ্লিষ্ট কোম্পানি এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কাজ সম্পন্ন হবে। এ নীতিমালার কোনো অস্পষ্টতা থাকলে এবং কোনো অনুচ্ছেদ বা বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হলে জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের ব্যাখ্যা চ‚ড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
এদিকে নীতিমালা হওয়ার পর প্রায় ছয় মাস হতে চললেও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে খুব বেশি অগ্রগতি নেই। এদিকে সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যও নেই পেট্রোবাংলার কাছে। এখনো মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে শেষ করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র জয়ের আট বছর পূর্ণ হতে আর বেশি দেরি নেই। অথচ এখনো পর্যন্ত বহুমাত্রিক জরিপ-মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভেও ঝyলে আছে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তহীনতায়। তারা বলছেন, সমুদ্র থেকে জ¦ালানি অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হলে ব্যয়বহুল এলএনজি নির্ভরতার দিকে ঝুঁকতে হতো না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত ও মিয়ানমার গত কয়েক বছরে তাদের সমুদ্রসীমাতে যেভাবে গ্যাস অনুসন্ধান করছে বাংলাদেশ সেখানে পিছিয়ে পড়ছে।
এদিকে পেট্রোবাংলাও আশঙ্কা করছে, আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে গেলে ভয়ংকর বিপদে পড়তে হবে। আমদানি করা জ¦ালানির ব্যয় অত্যধিক হওয়াতে অর্থনীতি চাপে পড়বে। তাই দ্রুত সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা উচিত।
পেট্রোবাংলা থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বঙ্গোপসাগরে ২৬ ব্লকের মধ্যে মাত্র চারটিতে কাজ হচ্ছে। বাকি ২২টি সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কোনো তথ্য নেই। আর গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো অনেক বেশি গভীরে হওয়ায় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এসব জায়গায় কাজ করতে আগ্রহী হচ্ছে না।
জানা গেছে, সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে সম্পªতি মডেল উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) ২০১৯ অনুমোদন করেছে সরকার। অনুসন্ধান সফল হলে প্রতি হাজার ঘনঢফুট গ্যাসের দাম সাড়ে ৬ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭.২৫ ডলার করার ব্যাপারে পেট্রোবাংলার প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার।
এর আগে ২০০৮ ও ’১২ সালে দুবার মডেল পিএসসিতে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিকে আহ্বান জানানো হলেও খুব একটা সাড়া পাওয়া যায়নি। মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস ব্লক ইজারা নিয়ে মাঝপথে চলে গেছে।
জ¦ালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে টেন্ডার হলে আজকে গ্যাস খাত উন্নয়নের জন্য একটা মাইলফলক হতে পারত। তিনি বলেন, সম্ভাবনা থাকার পরও সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ধীরগতির কারণে জ¦ালানি সংকট কাটাতে ধীরে ধীরে প্রাধান্য পাচ্ছে আমদানিনির্ভরতা। আর আমদানি করা এলএনজির ব্যয় মেটাতে এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো নিতে হলো গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ। তিনি জাতীয় জ¦ালানি নিরাপত্তার স্বার্থেই আমদানির পরিবর্তে নিজস্ব উৎসে জোর দেওয়ার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, গ্যাস খাত উন্নয়নে সরকারের সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই। এ খাতে বহু স্বার্থবাদী গোষ্ঠী জড়িত। এতে বারবার আমরা ঠকেছি। মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভের তথ্য অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়বে। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে চ‚ড়ান্ত দরপত্র দিতে হবে। তাহলে স্বচ্ছতা থাকবে। অবশ্যই চেষ্টা থাকতে হবে যাতে কম খরচে গ্যাস তোলার চুক্তি করা যায়।
পেট্রোবাংলার জেনারেল ম্যানেজার (পিএসসি) শাহনেওয়াজ পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, নরওয়ে এবং মার্কিন জয়েন্টভেঞ্চার কোম্পানি টিজিএস সস্নামবার্জারের সঙ্গে চুক্তির একটি বিষয় চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চলতি ডিসেম্বরের মধ্যে এই চুক্তি হতে পারে। দুই বছরের জন্য এ চুক্তি হবে। দুটি ভাগে এ চুক্তি হবে। প্রথমে একটি ব্লকের কাজ শেষ হলে আমরা আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান কোম্পানিগুলোকে দরপত্রের জন্য ডাকব।
বিদ্যুৎ জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুক্তির বিষয়টি চ‚ড়ান্ত অবস্থায় আছে। আমরা অনুসন্ধানের নীতিমালা করেছি। এখন নিজেদের মধ্যে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। সেদিকেও আমরা জোর দিচ্ছি। ডিসেম্বরের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষর বলে আশা করছি। এটা হলে সমুদ্রভাগের সম্পদ সম্পর্কে ক্লিয়ার তথ্য পাওয়া যাবে। এতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো কাজ করতে আগ্রহী হবে।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দরপত্র আহ্বান করা হলে সেগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু অনুসন্ধানের তথ্য বহুজাতিক অনুসন্ধান কোম্পানিকে দিতে হয়। কিন্তু পেট্রোবাংলার কাছে পানির গভীরতা এবং ব্লকের আয়তন ছাড়া কোনো তথ্য নেই। সাধারণত বিনিয়োগকারীরা দ্বিতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপের ফলাফল চেয়ে থাকে। এজন্য সাগরে দরপত্র আহ্বানের আগে একটি মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে করা হয়। এতে উঠে আসে সেখানে সম্ভাব্য সম্পদ মজুদের তথ্য। এরপর বিনিয়োগকারী ওই তথ্যের ভিত্তিতে তৃতীয় মাত্রার জরিপ করে কূপ খনন করে থাকে। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে চেষ্টা করেও মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভের কোনো কাজ দিতে পারেনি। সম্পªতি ওই জরিপের কাজ একটি বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে। তাদের এ জরিপ শেষ করে ফলাফল বিশেস্নষণ করতে অন্তত তিন বছর সময় প্রয়োজন হবে।
নীতিমালায় যা আছে : নীতিমালার বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জ¦ালানির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পªতি লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে গ্যাসের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। আমদানি করা এলএনজি অত্যধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় দেশে সরবরাহ করা জ¦ালানির মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সুপরিকল্পিতভাবে দেশের অনশোর (ভূ-ভাগে) ও অফশোরে (সমুদ্রসীমায়) গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা দরকার। তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য দেশের অনশোর অঞ্চলকে ২২টি ব্লকে এবং অফশোর অঞ্চলকে ২৬টি ব্লকে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক জ¦ালানির আমদানি নির্ভরশীলতা কমাতে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান পদ্ধতি ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সরকারি অনুসন্ধান/উত্তোলন কোম্পানির গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে পূর্বনির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) বা স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্লোরেশন প্রসিডিউর অনুসরণ করা হবে। এজন্য পরিবেশ, নিরাপত্তা তথা সার্বিক দিক বিবেচনা করে বাপেক্স পূর্ণাঙ্গ ম্যানুয়েল প্রণয়ন করে তা অনুসরণ নিশ্চিত করবে। এছাড়া বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (এসজিএফএল) তাদের ম্যান্ডেট অনুযায়ী তেল-গ্যাস উত্তোলনের স্বতন্ত্র এসওপি প্রণয়নের পর তা অনুসরণ করবে।
অনশোরের সম্ভাবনাময় যেসব এলাকায় এখনো ভূতাত্ত্বিক ও ভূপদার্থিক জরিপ করা হয়নি সেসব এলাকায় ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভূতাত্ত্বিক ও ভূপদার্থিক জরিপ সম্পাদন করা হবে। ক্ষেত্রবিশেষে অনুসন্ধান কাজে প্রয়োজন হলে বাপেক্সের সঙ্গে জিএসবিকে অন্তভু©ক্ত করা হবে। ভূতাত্ত্বিক জরিপের ভিত্তিতে অনশোরের যেসব সম্ভাবনাময় এলাকায় এখনো টু-ডি সিসমিক সার্ভে সম্পাদন করা হয়নি, সেসব এলাকায় নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে উপযুক্ত টু-ডি সিসমিক সার্ভে সম্পাদন করতে হবে। টু-ডি সিসমিক সার্ভে থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বাপেক্স বিশেস্নষণ করবে। এ ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার অংশগ্রহণসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ ও সহায়তা গ্রহণ এবং আধুনিক কার্যকর প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। টু-ডি সিসমিক সার্ভে থেকে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে চিহ্নিত ও সম্ভাবনাময় প্রসপেক্টাসে কূপ খননের আগে প্রয়োজনে থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে পরিচালনার মাধ্যমে প্রসপেক্টাসের বিস্তৃতি সঠিকভাবে নির্ণয় করে অনুসন্ধান কূপ খননের সঠিক স্থান নির্ধারণ করা হবে। অফশোরের যেসব এলাকায় এখনো ব্লক বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, সেসব এলাকায় প্রয়োজনে মাল্টি ক্লায়েন্ট সার্ভে সম্পাদন করা হবে। অফশোরের বরাদ্দ করা ব্লকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়োজিত ইজারাদারের মাধ্যমে উপযুক্ত ভূতাত্ত্বিক ও ভূপদার্থিক জরিপ সম্পাদন করা হবে।
উল্লিখিত পদ্ধতিতে অনশোরে চিহ্নিত সম্ভাবনাময় প্রসপেক্টে অনুসন্ধানযোগ্য কূপের সংখ্যা, স্থান ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে একটি লিড বা প্রসপেক্ট ম্যাপ প্রণয়ন করা হবে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান কূপ খনন করার পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অ্যাপ্রাইজাল, উন্নয়ন ও ওয়ার্কওভার কূপ চিহ্নিতের ক্ষেত্রে এসওপি অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সরকারি ও বেসরকারি বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ গ্রহণ করা হবে। যেসব কূপ ড্রাই, স্থগিত বা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে তা এসওপি অনুসরণ করে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। অপ্রচলিত রিজার্ভার থেকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহার করে দেশজ তেল ও গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অফশোরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন কার্যক্রম জোরদার করা হবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির (আইওসি) কাছে অফশোরের ব্লক আকর্ষণীয় করার জন্য প্রয়োজনবোধে সময় সময় প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) যুগোপযোগী করা হবে। অফশোরে উত্তোলিত তেল ও গ্যাস সাব-সি পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ বা অফশোরে স্থাপিত প্ল্যাটফরমে এলএনজিতে রূপান্তর করে সরবরাহ করা হবে।
তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন কার্যক্রম ত্বরান্বিত এবং গতিশীল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ও কারিগরি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে আধুনিক ও যুগোপযোগী হার্ডওয়্যার/সফটওয়্যারের সুবিধাসংবলিত স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং শক্তিশালী ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ ইউনিট গঠন করা হবে। এর পাশাপাশি দেশের সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে।