বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরার জীবন দিয়ে উন্মোচন করে গেছেন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠগুলো জ্ঞান, গবেষণা, সাহিত্য ও মানবিকতা চর্চার জায়গা নয়। এগুলোতে বরং আবিষ্কৃত হয়েছে শত শত ‘টর্চার সেল’। আবরার নিষ্ঠুর নির্যাতনে মৃত্যুবরণ করেন আর তখন থেকেই বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে কত ভয়াবহ ও নিষ্ঠুরতম খেলা চলছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
গত ১ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে খবর দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৮টি আবাসিক হলেই রয়েছে গণরুম, এই সংখ্যা ১৩০টির মতো হবে। এ ছাড়া হলের বারান্দা, ছাদ, গেমস রুম, এমনকি মসজিদেও এই সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পড়–য়া শিক্ষার্থীরা থাকছেন। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা চার হাজারের কম হবে না। একজন নবীন শিক্ষার্থী আবাসিক হলে ওঠামাত্র মুখোমুখি হন এমন ভয়ংকর পরিস্থিতির। কেউ কেউ এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে অন্য কোথাও চলে যান। কিন্তু বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই অর্থের অভাবে নিরুপায় হয়ে অবস্থান করেন সেখানে। গণরুমে ওঠার পর থেকে রোগ-ব্যাধির সঙ্গেও বসবাস শুরু হয় শিক্ষার্থীদের। ডেঙ্গু, চর্মরোগ, যেটাই হোকÑ রুমের একজনের হলেই তাতে আক্রান্ত হন অন্য সবাই। নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে অনিদ্রা আর উদ্বেগ।
গণরুমে পড়াশোনা হয় না, রাতে ঘুমানো যায় না। ছারপোকার কামড়, নোংরা পরিবেশ, বাথরুম সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই গণরুমগুলো। এ ছাড়া গণরুমের শিক্ষার্থীদের জোর করে রাজনৈতিক প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন পূর্বপরিকল্পনা যা-ই থাকুক না কেন, তখন পড়াশোনা আর পরীক্ষা কোনোটিই হয় না। বস্তির চেয়েও হলের গণরুমের অবস্থা খারাপ। অর্থনৈতিক কারণে, তা ছাড়া নিরাপত্তার কথা ভেবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকেন। রুমের মেঝেতে সারি সারি বিছানা আর উভয় পাশে সারিবদ্ধ ট্রাঙ্ক। রুমের ভেতর বিভিন্ন জিনিসপত্রে ঠাসা। একটু ফাঁকা জায়গাও চোখে পড়ে না গণরুমে। প্রায় দম বন্ধ করা পরিবেশ। সেখানেই থাকতে হয় ২০ থেকে ২২ জনকে। ঘুমন্ত অবস্থায় একজনের পায়ের সঙ্গে লেগে যায় আরেকজনের মাথা। অনেক সময় ঘুমাতে হয় পালা করে। এ যেন কারাগারে বন্দিদের জীবন!
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় নতুন শিক্ষার্থীরা কত রঙিন স্বপ্ন দেখেন আর ভর্তির পর লজ্জায় কোনো আত্মীয়-স্বজনকে তাদের থাকার জায়গায় আনতে পারেন না, তাদের এই উদ্বাস্তু ক্যাম্পের মতো অবস্থা দেখলে তারা বিস্মিত হবেন। অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রীয় কর্র্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এ অবস্থা দেখে লজ্জা পান না। তারা এটিও বলেন, ‘প্রচারণার অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক রেটিংয়ে আসে না।’
বিজয় একাত্তর হলের ক্রীড়াকক্ষ এখন ব্যবহার হচ্ছে গণরুম হিসেবে। রুমটিতে থাকেন দুই-তিনশোর মতো ছাত্র। এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রথম যখন হলে উঠলাম, তখন গণরুমের পরিবেশ দেখে মনে হয়েছিল, এখানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ঢাকায় তেমন আত্মীয়ও ছিল না। তা ছাড়া হলে থেকে অন্তত ক্লাস করতে সুবিধা হয়। তাই কষ্ট হলেও গণরুমেই উঠেছি।’ এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রথমে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়েছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের চিত্র আরও ভয়াবহ। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ঠাঁই হয়েছে বারান্দায়। ঘিঞ্জি এক বারান্দায় লম্বা করে বিছানো চৌকি। এমন চৌকিতেই ঘরবসতি তাদের। মাথার ওপর একটিও ফ্যান নেই। কারও কারও অবশ্য ব্যক্তিগত ফ্যান আছে। কিন্তু যাদের নেই, তাদের একমাত্র ভরসা প্রকৃতির হাওয়া। বারান্দা বলে রোদ আসে, কখনো কখনো তাপে টেকা যায় না। আবার বৃষ্টি হলেই ভিজে যায় সব। প্রায়ই ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে।
আমরা মিডিয়ায় দেখেছি আবরার হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমের শিক্ষার্থীরা সাহস করে গত ২৯ অক্টোবর উপাচার্যের বাসভবনের সামনে প্রতীকী গণরুম বানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছিলেন। পরে প্রথম বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়া হবে বলে উপাচার্যের এমন আশ্বাসে তারা অবস্থান কর্মসূচি স্থগিত করেন। উপাচার্য হচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অভিভাবক। অথচ তিনি শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের সমাধান করতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা মানবেতর জীবনযাপন করবে আর তিনি প্রাসাদসম বাংলোয় আয়েশে থাকবেন, এটি কোনোভাবেই অভিভাবকসুলভ কোনো কাজ বা আচরণ হতে পারে না। উপাচার্য বলেন, গণরুম ও আবাসন সংকট নিরসনে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণরুম সমস্যা এত দীর্ঘদিনের যে, দিনক্ষণ বেঁধে এর সমাধান করা সম্ভব নয়। আস্তে আস্তে পরিকল্পিতভাবে সমাধানের দিকে এগোনো হচ্ছে। বেশ কয়েকটি হল সম্প্রসারণ, নতুন হল নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে।
চারদিকেই শুধু দুঃসংবাদ তাই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের ঘুমিয়ে থাকা উচিত নয় কিংবা পদপদবি বাগানোর জন্য বাঁকাপথে হাঁটার সময় ও যুক্তি নেই। ৩০ নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি ও বিশ^বিদ্যালয়গুলোর আচার্য বলেন, ‘সম্প্রতি গণমাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যে খবর ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তা দেখে আচার্য হিসেবে আমি মর্মাহত হই। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা প্রশাসনের বিভিন্ন পদে পদবি পাওয়ার লোভে বিশ^বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে ঠিকমতো অংশ না নিয়ে বিভিন্ন লবিং নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। অনেকে আবার নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করতেও পিছপা হন না। এটা অত্যন্ত অসম্মানের ও অমর্যাদাকর।’ তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘মনে রাখবেন, আপনারা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সাধারণ মানুষ আপনাদের সম্মান ও মর্যাদার উচ্চাসনে দেখতে চান। তাই ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার জন্য নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস করবেন না। আপনাদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে আদর্শ যাতে ভূলুণ্ঠিত না হয়, সে দায়িত্ব আপনাদের নিতে হবে। রাজনৈতিক মতাদর্শ ও চিন্তা-চেতনায় একজন আরেকজনের মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু এর নেতিবাচক প্রভাব যেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।’ রাষ্ট্রপতি যথার্থই বলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের এই করুণ হালের কথা এড়াতে পারেন না। এটি তাদের পবিত্রতম দায়িত্ব, শিক্ষার্থীরা যাতে সত্যিকার অর্থে পড়াশোনায় মন দিতে পারেন, তা না হলে কারা এই দেশকে ভবিষ্যতে নেতৃত্ব দেবেন
রাষ্ট্রপতি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা গ্র্যাজুয়েটরা দেশের উচ্চতর মানবসম্পদ। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করছে তোমাদের ওপর। তোমাদের তারুণ্য, জ্ঞান, মেধা ও প্রজ্ঞা হবে দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে একজন গ্র্যাজুয়েট হিসেবে সব সময় সত্য ও ন্যায়কে সমুন্নত রাখবে। নৈতিকতা দিয়ে দুর্নীতি ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে। মনে রাখবে, এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষ তাদের শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে তোমাদের শিক্ষার ব্যয় বহন করছে। তাদের কাছে তোমরা ঋণী। এখন সময় এসেছে সেই ঋণ পরিশোধ করার। তোমরা তোমাদের মেধা, কর্ম ও সততা দিয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণ করতে পারলে এই ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে।’ আমরাও চাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা, কর্ম ও সততা দিয়ে দেশকে সেবা করবেন আর তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে তাদের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ দায় আমরা কেউ এড়াতে পারি না।স
লেখক : শিক্ষক এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি