গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে তা হলো, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কি জামিন পাচ্ছেন? বিষয়টি একেবারেই আদালতের এখতিয়ারভুক্ত। তবুও খালেদা জিয়া যেহেতু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং এই জামিন পাওয়া না পাওয়ার সঙ্গে রাজনীতি জড়িত থাকতে পারে বলে জনমনে ধারণা থাকায় এই প্রশ্নটি উঠেছে। এ নিয়ে মানুষের ব্যাপক আগ্রহ আছে।
আজ ৫ ডিসেম্বর দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে খালেদা জিয়ার জামিনের প্রশ্নে কোনো আদেশ আসে কিনা তার ওপর দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ
গতিপ্রকৃতি খানিকটা নির্ভর করছে বলেও কেউ কেউ মনে করেন। এক বছর দশ মাস ধরে জেলে আছেন খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তিনি গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাভোগ করছেন। ৭৪ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দেশের শুধু একজন সিনিয়র সিটিজেনই নন, তিনি তিন বারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির স্ত্রী এবং বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি অসুস্থ। জামিন আইনগত অধিকার। জামিন পেলে কি তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যেতে পারেন বা মামলাকে প্রভাবিত করতে পারেন? সে সম্ভাবনা যে নেই সেটা স্পষ্ট। তার পরেও তিনি কেন জামিন পাচ্ছেন না সে প্রশ্নটি অনেকেই করছেন। তাছাড়া দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত অনেকেরই এ দেশে জামিন পেয়ে মুক্ত জীবনযাপনের নজির আছে। তাছাড়া খালেদা জিয়ার তার পছন্দমতো জায়গায় চিকিৎসা নেওয়ার অনুমতি না পাওয়ার বিষয়টিও অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর আগে অনেকেই জেলজীবনে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, নাইকো মামলা, গ্যাটকো মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি মামলাগুলো ওয়ান-ইলেভেন খ্যাত বিশেষ সরকারের সময় করা হলেও তারপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও ৩১টি মামলা করা হয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায় (বিবিসি বাংলা, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)। এর মধ্যে ১১টি নাশকতার মামলা। যাতে বিএনপি চেয়ারপারসনকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। সেইসঙ্গে রয়েছে মানহানি এবং রাষ্ট্রদ্রোহের বেশ কিছু মামলা। ১৫ আগস্টে জন্মদিন পালন নিয়েও মামলা করা হয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে।
ওয়ান-ইলেভেন সরকার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দুই প্রধানের বিরুদ্ধেই মামলা করেছিল। সে সরকারের আমলে করা মামলা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সে কথা আওয়ামী লীগই বলেছে বহুবার। আর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলে অভিযোগ করছে বিএনপি।
বিএনপি বলছে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার রায় ও তাকে জামিন না দিয়ে জেলে রাখার উদ্দেশ্যই হচ্ছে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করা, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করার চেষ্টা করা এবং নির্বাচন থেকে তাকে দূরে রাখা। একাদশ জাতীয় নির্বাচনে খালেদা জিয়াকে অযোগ্য করে কীভাবে সে নির্বাচনটি সম্পন্ন করেছে সরকার সেটা সবারই জানা আছে। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেনÑ এই কথাটা যতটা জোশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও তাদেও সঙ্গীরা বলছেন, তাতেই বোঝা যায় খালেদা জিয়াকে হেয় করার জন্য এর চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর হয় না। আর জেলে রেখে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করার শেষ প্রান্তে যে পৌঁছে গেছে সরকার সে ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। যে মানুষ হেঁটে জেলে ঢুকলেন, তিনি এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া একা দাঁড়াতেও পারেন না। হাঁটাচলা তো দূরের কথা। এভাবে যথাযথ চিকিৎসা ছাড়া খালেদা জিয়ার কারাবাস আরও দীর্ঘ হলে তার পরিণতি যে কী দাঁড়াতে পারে, তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কতটা থমকে যেতে পারে সে হিসাব নিশ্চয়ই আছে সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে শুরু থেকে আইনগতভাবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাতে কোনো ফল হয়নি। শুরু থেকেই দলটির নীতিনির্ধারকরা বলে আসছেন, তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আইনগতভাবে কাজ করবেন, পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও এটাকে মোকাবিলা করবেন। কিন্তু কোনো পথেই যে তারা সুবিধা করতে পারেননি তা নিয়ে দলের কর্মী-সমর্থক এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ আছে। সে বিবেচনা মাথায় রেখেই হয়তো কিছুটা নড়েচড়ে বসছে দলটি। এখন বিএনপির কাছে মুখ্য বিষয় খালেদা জিয়ার মুক্তি।
অনেক দিন ধরে প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে আলোচনা, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশের মধ্যে আটকে থাকা বিএনপি যে সে বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে খালেদা জিয়ার মুক্তির ইস্যুকে একটু জোরেশোরে সামনে আনতে চাইছে তা বোঝা যায় রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের জাতীয় প্রেস ক্লাবে আলোচনা শেষে হাইকোর্টের সামনে বিনা অনুমতিতে অবস্থান নেওয়া এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো দেখে। সাম্প্রতিককালে প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে এভাবে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি কমই দেখা গেছে। জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম দলের নেতৃত্বে দুপুরের দিকে প্রেস ক্লাবে ছোট ছোট দল এসে সংগঠিত হয়ে হাইকোর্টের দিকে এগোতে থাকে। হাইকোর্টের প্রধান ফটক থেকে মাজার গেট পর্যন্ত তারা অবস্থান নিয়ে সেøাগান দিতে থাকেন। মিছিলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা আবদুল্লাহ আল নোমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, হাইকোর্টের ফটকগুলোয় অবস্থান নিতে গিয়ে অনেক নেতাকর্মী শুয়ে পড়েন। খালেদা জিয়ার মুক্তি, পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেøাগান দিতে থাকেন তারা। এ সময় হাইকোর্ট এলাকাসহ আশপাশের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে বিএনপি কর্মীদের।
এ ঘটনায় যথারীতি ওইদিনই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ অনেকের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ৫শ জনের নামে মামলা করে পুলিশ। এদের মধ্যে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, খায়রুল কবীর খোকনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ। কিন্তু অবাক করার বিষয়, ঢাকার একটি আদালত ওইদিনই তাদের জামিন দেয়। এছাড়া ওইদিন হাইকোর্টে হাজির হয়ে আগাম জামিন নেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। শুধু হাইকোর্টের সামনেই নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিক্ষাভ মিছিল হয়েছে গত কয়েক দিনে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকার এই মুহূর্তে অত্যন্ত ভারনারেবল বা ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যে আছে। দলীয় কোন্দল, অভিযানের শুরু ও হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া, লাগামহীন দুর্নীতি, নিয়ন্ত্রণহীন দ্রব্যমূল্যসহ বহু কারণে সরকারের মধ্যে একটা অস্থিরতা চলছে বলে অনেকেই মনে করেন। একদিকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগে দেশে-বিদেশে অস্বস্তি, অন্যদিকে বহুবিধ কারণে দেশের মানুষের অশান্তি সরকারের অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোনো সময় যে কোনো ইস্যুতে জনবিস্ফোরণ ঘটলে তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে মানুষকে ভুলিয়ে রেখে তাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এতকাল। বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে জাগিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যে সে উন্নয়নের গল্পের মোহ ভেঙে গেছে মানুষের। তারা দেখছে, কথিত উন্নয়নের সুফল সাধারণত মানুষ পাচ্ছে না। একদিকে ওই সব মেগা উন্নয়নের আড়ালে যে মেগা দুর্নীতি হচ্ছে তার কিছুটা হলেও বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, অন্যদিকে মানুষ পড়ছে আর্থিক দুর্গতিতে। দ্রব্যমূল্যসহ জীবনযাপনের ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়ায় দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ সরকারের ওপর মহাবিরক্ত।
সরকারের ওপর বিরক্ত এই জনগোষ্ঠীই হতে পারে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি। তারা একদিকে সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ, অন্যদিকে দীর্ঘ কারাবাসের শিকার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি সহানুভূতিশীল। এ কথা সত্য যে, এই দেশে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তারাই প্রতিপক্ষের প্রতি হয়ে ওঠে নিপীড়নমূলক। প্রতিহিংসার কবলে পড়েন সরকারবিরোধী ভিন্নমতের মানুষ।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার কবলে পড়েছে অতীতে। কিন্তু অতীতে হয়েছে বলেই তা চলতেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে সেটা তো হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ যেভাবেই হোক এগারো বছর ধরে ক্ষমতায় আছে। এখনো কি তাদের রাগ ক্ষোভ কষ্ট মেটেনি? আর কত! এ প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে দেশের রাজনীতি বেরিয়ে আসুক, শুরু হোক নতুন ধারার সহনশীল গণতান্ত্রিক রাজনীতি সেটা দেশবাসীর চাওয়া।
লেখক
চিকিৎসক ও কলামনিস্ট