ডেমোক্র্যাট সিনেটর ফ্রাংক চার্চ ২২ জুন ১৯৭১ প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে লিখেন যে, সেদিনের নিউইয়র্ক টাইমস সংবাদদাতা ট্যাড শুলক একটি চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশ করছেন। তাতে বলা হযেছে, পাকিস্তানি পতাকাধারী একটি মালবাহী জাহাজ সামরিক সরঞ্জামবোঝাই অবস্থায় নিউ ইয়র্ক থেকে করাচির উদ্দেশে রওনা হতে যাচ্ছে। এ ধরনের সরঞ্জাম পাঠাতে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। প্রথম থেকেই বলা হচ্ছে, পাকিস্তান সরকার আমেরিকান অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যায় ব্যবহার করছে।
সেদিনই সিনেটর ফ্রাংক চার্চ মার্কিন সিনেটে বিষয়টি উত্থাপন করে জানালেন, তার কাছে প্রামাণিক দলিলপত্র রয়েছে যে, দুটি মালবাহী জাহাজ সুন্দরবন ও পদ্মা ৮ ও ১২ জুন নিউ ইয়র্ক বন্দর ছেড়ে যাওয়ার কথা। বিশেষ করে পদ্মা সেদিন বিকেলেই বন্দর ছেড়েছে। তিনি প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেছেন, যেন সেদিনের চালানটি বন্ধ করার উপযুক্ত নির্দেশ দেন। ২৩ তারিখে জাহাজটি মন্ট্রিয়েল ডকে পৌঁছার কথা। তিনি বলেন, কোস্টগার্ড যদি যুক্তরাষ্ট্রের জলসীমায় জাহাজটিকে আটকাতে সমর্থ না হয়, তাহলে কানাডা সরকারের সাহায্য নিয়ে নিষিদ্ধ সরঞ্জাম পাঠানোর উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে। সিনেটর এডমন্ড মাস্কিও বলেন, প্রেসিডেন্ট নিক্সন যখন বড় গলায় ‘চরম নিরপেক্ষতা’র কথা বলছেন তখন পশ্চিম পাকিস্তানের সওদাগরি জাহাজে বোঝাই করা হচ্ছে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ।
১৬ জুলাই ১৯৭১, বাল্টিমোর (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস) : পাকিস্তানি পণ্যবাহী জাহাজ পদ্মাকে ডকে পণ্য ওঠাতে বাধা দিতে আজও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হবে। অভিযোগ রয়েছে, এই পাকিস্তানি জাহাজ যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বদেশে অস্ত্র ও অন্যান্য মালামাল নিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ গত রাতে ছয়জন বিক্ষোভকারীকে জাহাজ ডকে আসতে বাধা দেওয়ার কারণে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের কাছে ছিল তিনটি ক্যানু ও একটি কায়াক। একজন কর্মকর্তা জানান, জাহাজের অবাধ চলাচলে বাধা দেওয়ার জন্য তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের নিজেদের নিরাপত্তা বিবেচনা করেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক লং শোরম্যান অ্যাসোসিয়েশন তাদের বাল্টিমোর শাখাকে নির্দেশ দিয়েছে, যেন জাহাজে মাল তোলা না হয়। কারণ প্রতিবাদকারীরা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও এই জাহাজে করে পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হচ্ছে।
এদিকে পাকিস্তানি জাহাজের যুক্তরাষ্ট্রীয় এজেন্ট জানিয়েছে, এই মালবাহী জাহাজে কোনো সামরিক সরঞ্জাম নেই। ১৩ বিক্ষোভকারীর একজন কেবল পাকিস্তানি। শহরের অফিসপাড়ায় জমায়েত হয়েছেÑজাহাজযোগে পাকিস্তানে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর প্রতিবাদ জানাতে। ১৫ জুলাই, ১৯৭১ বাল্টিমোর শহরে ক্যালভার্ট অ্যান্ড রেডউড স্ট্রিটে কেয়সার ভবনের সামনে এই বিক্ষোভÑইস্ট ওয়েস্ট শিপিং এজেন্সির বিরুদ্ধে হলেও মূলত বিক্ষোভ গোটা আমেরিকান সরকারের বিরুদ্ধে। এই এজেন্সি আসলে হ্যান্ডলিং এজেন্ট। ১৭ জুলাই বিকেলে পাকিস্তানি মালবাহী জাহাজ পদ্মা কভিংটন বন্দর টার্মিনালে আসছে, তারই ব্যবস্থাপনার ভার এই এজেন্সির।
বাল্টিমোর থেকে দ্য ইভনিং বুলেটিন ফিলাডেলফিয়ার প্রতিবেদন : পাকিস্তানের কার্গো জাহাজে অস্ত্র বোঝাই ঠেকাতে ১৪ জুলাই, ১৯৭১ নৌকায় (ক্যানু ও কায়াক) জাহাজ আটকাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন ছয়জন আমেরিকান, সবাই ফিলাডেলফিয়ার অধিবাসী।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আন্দোলনকারীদের দলনেতা চার্লস খান বলেছেন, তিনি এবং তার অনুসারীরা কার্গো জাহাজ পদ্মা ফিলাডেলফিয়ায় পৌঁছালে মালামাল ওঠাতে আবার বাধা দেবেন। চার্লস খানের সঙ্গে আর যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তারা হচ্ছেন সেজইউক স্ট্রিটের রিচার্ড টেইলর, পাইন স্ট্রিটের স্যালি উইলবি ও স্টেফানি হলিম্যান, উইলোজ এভিনিউর চার্লস গুডউইন এবং মেডিয়ার ওয়েইন লাউসার।
পাকিস্তানি মালবাহী জাহাজ পদ্মা আজ বাল্টিমোর থেকে মোবাইল যাত্রা করার কথাÑঅস্ত্র নিয়ে জাহাজটি স্বদেশে যাত্রা করেছে। আজ এখানকার লং শোরম্যানরা এই জাহাজে মাল বোঝাই করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, পাকিস্তানের গণযুদ্ধে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের জন্যই তাদের এ সিদ্ধান্ত। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে, দুই লাখ পাকিস্তানি নিহত হয়েছে এবং ষাট লাখ শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে জাহাজের মালিক ন্যাশনাল শিপিং কোম্পানি অব করাচির এজেন্ট ইস্ট ওয়েস্ট শিপিং এজেন্সি ফেডারেল মেরিটাইম কমিশনকে টেলিগ্রাম করে জানিয়েছে, লং শোরম্যানদের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। টেলিগ্রামে কমিশন চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজে ৯ লাখ ২৪ হার ৩২৯ ডলার মূল্যের জাহাজের যন্ত্রাংশ; ১ লাখ ৮৪ হাজার ১৮৭ ডলার মূল্যের সামরিকযান যন্ত্রাংশ; ২৫ হাজার ৪১৭ ডলার মূল্যের ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ; ৪৫ হাজার ১১৭ ডলার মূল্যের যানবাহন যন্ত্রাংশ এবং ২ হাজার ৮৩০ ডলার মূল্যের গোলন্দাজ যন্ত্রাংশ রয়েছে। নিউ ইয়র্ক থেকে এতে ২ হাজার ২০০ রাউন্ড ২২ ক্যালিবার গোলাবারুদ বোঝাই করা হয়েছে। এই মালবাহী জাহাজটি মন্ট্রিয়েল থেকে পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ স্যাবর জেটের ৪৬ বাক্স খুচরা যন্ত্রাংশ ওঠাবে। তবে কানাডা সরকার এই মাল উত্তোলনে বাধা দিয়েছে।
ফ্রেন্ডস অব ইস্ট বেঙ্গল নামের ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক একটি সংস্থার ৩০ সদস্য তাদের বিক্ষোভ অব্যাহত রেখেছেন। জাহাজ আটকানোর অপরাধে অভিযুক্তরা ছাড়া পেয়েছেন। দ্য ইভনিং বুলেটিন ফিলাডেলফিয়া জানিয়েছে, ক্যানু ও কায়াকযোগে পানিতে নেমে জাহাজ আটকানোর চেষ্টা করার অপরাধে গ্রেপ্তারকৃত ছয়জন কারামুক্তি লাভ করেছেন। দলনেতা চার্লস খান বলেছেন, অস্ত্রবাহী জাহাজটিকে তারা পুনরায় ফিলাডেলফিয়ায় আটকাতে চেষ্টা করবেন।
নিউ ইয়র্ক বন্দর থেকে ছেড়ে আসা এই জাহাজের গন্তব্য পাকিস্তানের করাচি বন্দরÑকয়েক সপ্তাহ ধরে এই জাহাজ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিযোগ উঠেছে, এই জাহাজে পাকিস্তানে অস্ত্রশস্ত্র পাঠানো হচ্ছে, সিনেটে এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। একজন সিনেটর এই মালবাহী জাহাজের মালামাল প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অনুরোধ জানিয়েছেন।
১৬ জুলাই, ১৯৭১ বাল্টিমোর সান জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতিপূর্বে পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানো স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তবে পুরনো ক্রয়ের অংশবিশেষ পাঠানো না হয়ে থাকলে তা জাহাজে উত্তোলন করা যাবে। সিনেটে খোলামেলাভাবেই বলা হয়েছে, পাকিস্তান মার্কিনি অস্ত্রের প্রয়োগ করছে নিজ দেশের মানুষের ওপর, পূর্ব পাকিস্তানে। পাকিস্তানে সরকার বাহ্যত বিচ্ছিন্ন হওয়ার একটি বিদ্রোহ ধামাচাপা দিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা লড়াই চলছেই।
কদিনের মধ্যেই একটি আমেরিকান কোম্পানির কাছ থেকে ইজারা নেওয়া দুটি জেট উড়োজাহাজ পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের বহরে যোগ হয়ে বাংলায় আরও বেশিসংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য ও রসদ পাঠানোর কাজে ব্যবহার করছে।
পাকিস্তানের জন্য এই উড়োজাহাজ ইজারা স্পষ্টতই স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কমার্স ডিপার্টমেন্ট এবং সিভিল অ্যারোনোটিক্স বোর্ড জ্ঞাতসারে এবং তাদের প্র্রকাশ্য-অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পূর্ব পাকিস্তান থেকে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা ও সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের সূত্র থেকে জানা যায়, পিআইএ জেটলাইনারগুলো আহত সৈন্য পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং তাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে সৈন্য নিয়ে আসার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। নিক্সনের সমালোচকরা মনে করেন, মার্কিন অস্ত্রে পূর্ব বাংলা নিয়েন্ত্রণ সে দেশের জন্য লজ্জা ও গ্লানির ব্যাপার।