বিমানে শুরু হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান

গ্রেপ্তার আতঙ্কে কর্মকর্তারা অফিস করছেন ঢিলেঢালা

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসকে লাভজনক, দুর্নীতিমুক্ত ও শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে শিগগির শুরু হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান। যেকোনো মুহূর্তে বিমানের প্রধান কার্যালয় বলাকা ভবনসহ সব অফিসেই এ অভিযান চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিমানের সাবেক দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হওয়ায় দুর্নীতিতে জড়িত অনেকে আছেন আতঙ্কে। এ কারণে তারা অফিস করছেন ঢিলেঢালাভাবে। কেউ কেউ অফিসেই আসছেন না। সব মিলে বিমানের কাজে অনেকটা স্থবিরতা নেমে এসেছে। গতকাল বুধবার বলাকা ভবন ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে জানান, বিমানের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী বিমান ও পর্যটন খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতিবাজদের কোনো দল বা আদর্শ নেই। তাদের পরিচয় শুধু তারা দুর্নীতিবাজই। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছি। সামনে আরও বড় ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা আছে। বিমানকে আরও লাভজনক করতে যা যা করা দরকার তাই করা হবে।’ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রি

 ব্যবস্থাপনার নানা অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে গত ২৪ মার্চ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণীতে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে দুর্নীতির ১০টি ধাপ উল্লেখ করে বিমান সচিব বলেছিলেন, বিমানের টিকিট বিক্রি কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বাস্তবে সামান্য কিছু টিকিট অনলাইনে সচল রেখে বাকি টিকিট ব্লক করে রাখা হয়। অথচ নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা দিলে টিকিট পাওয়া যায়। এভাবে টিকিট বিক্রি প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ। প্রায়ই অনেক সিট খালি রেখে বিমান যাত্রা করে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বিমান ও বেবিচকের ১৯টি খাতে দুর্নীতি হচ্ছে বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। ইতিমধ্যে দুদক বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেছে। বিশেষ করে বিমানের অতিরিক্ত যন্ত্রাংশ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং ইক্যুইপমেন্টস, বড় অঙ্কের ক্রয় ও লিজ, কম্পিউটার-ইন্টারনেটসর্বস্ব কিছু মধ্যস্বত্বভোগী ফার্ম, ইঞ্জিনের মেজর চেক সাইকেল, মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়।

বিমান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই বিমানে নানা অনিয়ম চলে আসছে। নিয়োগ ও টিকিট বাণিজ্যসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকা- চলছে। সরকার নানা চেষ্টা করেও এসব নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। সর্বশেষ প্রধানন্ত্রীর নির্দেশে শুরু হয়েছে বিমানকে কীভাবে লাভজনক ও শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা যায় সে প্রক্রিয়া। এতে বিমানের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা একটি চক্র বাধা দিচ্ছে। তবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব কঠোর মনোভাব দেখানোর ফলে চক্রটি সুবিধা করতে পারছে না। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তৎপর হয়েছে। দুদকের হাতে অবসরে যাওয়া বিমানের দুই প্রভাবশালী কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারা গ্রেপ্তার হওয়ায় বিমানে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছেই। যাত্রী সেবার মান বাড়াতে একের পর এক চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছে না। বিমানকে আরও লাভজনক, সুশৃঙ্খল ও দুর্নীতিমুক্ত করতে কড়া ভাষায় কথা বলছেন মন্ত্রী, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারপর থেকেই বিমানকে আরও শক্তিশালী করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিমান পরিচালনা পর্ষদের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের নজরদারি ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইতিমধ্যে একগুচ্ছ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছেÑ প্রতিদিন ফ্লাইট বিলম্ব হচ্ছে কি না তা মনিটরিং করতে হবে। বিমানের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা বের করতে হবে। শুধু অফিসে আসা-যাওয়ার মানসিকতা পরিহার করে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী, সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে সমন্বয় এবং লাভজনক এয়ারলাইনস হিসেবে দাঁড় করানোর অন্তরায়গুলো চিহ্নিত করতে হবে। কার্গো শাখায় আরও কীভাবে লাভের মুখ দেখা যাবে তা নিয়ে কাজ করতে হবে। দুর্র্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। এসব নির্দেশনা পেয়ে বিমান কাজও শুরু করেছে।

বিমানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ নিজস্ব কার্গো বিমান ক্রয় করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এজন্য জেনারেল ম্যানেজারকে (রাজস্ব) প্রধান করে একটি সম্ভাব্য যাচাই কমিটি গঠনও করেছে। ইতিমধ্যে কমিটি কাজ শুরু করে দিয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যাত্রীদের সঙ্গে গার্মেন্টস পণ্যসহ নানা সামগ্রী বিমানে পাঠানো হয়। বিদেশি এয়ারগুলো শতকরা ৯০ ভাগই কার্গো মালামাল বহন করছে। আমরা মাত্র ১০ ভাগ মালামাল বহন করছি। এতে বছরে ২৫০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে। নিজস্ব বিমান ক্রয় করার পর আমাদের বছরে আয় হবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। কার্গো বিমান ক্রয় করার চেষ্টা চলছে। কোনো কারণে যদি একা বিমান ক্রয় করা না যায় তাহলে কোনো একটি দেশের সঙ্গে যৌথভাবে বিমান ক্রয় করা হবে। এতে দুই দেশই লাভবান হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘গত মঙ্গলবার বিমানের সাবেক দুই কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হওয়ার পর অনেকের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আজ (গতকাল) অনেককে অফিস করতেও দেখা যায়নি। যারা অফিস করছেন তারাও অফিস করছেন ঢিলেঢালাভাবে। যেকোনো সময় বড় ধরনের অভিযান শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রী বিমানকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখছেন। তার স্বপ্নপূরণ করতে আমরা নানাভাবে চেষ্টা করছি।’

বিমানের এক কর্মকর্তা জানান, বিমানের কার্গো শাখার ১১৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত মঙ্গলবার সকালে ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদকের উপপরিচালক নাসিরউদ্দিন। মামলায় মঙ্গলবারই বিমানের সাবেক পরিচালক আলী আহসান বাবু ও ডিজিএম ইফতেখার হোসেন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক। এ দুজনই বিমানের ক্ষমতাধর কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেনÑ বিমানের ভারপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপক (কার্গো) মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, সৌদি আরবের কান্ট্রি ম্যানেজার শহিদুল ইসলাম, সৌদি আরবের রিয়াদের রিজিওনাল ম্যানেজার আমিনুল হক ভূঁইয়া, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) লুৎফর জামাল, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মোশাররফ হোসেন তালুকদার, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) রাজীব হাসান, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) নাসিরউদ্দিন তালুকদার, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) অনুপ কুমার বড়–য়া, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব/বাণিজ্যিক) কেএন আলম, সহকারী ব্যবস্থাপক (আমদানি শাখা) ফজলুল হক, সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) সৈয়দ আহমেদ পাটওয়ারী, মনির আহমেদ মজুমদার, এ কে এম মঞ্জুরুল হক ও মো. শাহজাহান।

গতকাল বিমানের প্রধান কার্যালয় বলাকা ভবন ঘুরে আরও দেখা গেছে, এসব আসামির মধ্যে কেউ কেউ অফিসে আসেননি। যারা এসেছেন তারা সতর্কভাবে অফিস করছেন। বিমানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যাতে দেশত্যাগ করতে না পারে সেজন্য ইমিগ্রেশন ও সীমান্ত এলাকায় বার্তা পাঠানো হয়েছে।